শীর্ষ সংবাদব্রিটেনের সংবাদশীর্ষ

অভিবাসন সংস্কারে নমনীয় হচ্ছেন শাবানা মাহমুদ

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্ট: লেবার পার্টির অভ্যন্তরে তীব্র বিরোধিতার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ তাঁর প্রস্তাবিত অভিবাসন সংস্কারের কঠোরতা কিছুটা শিথিল করতে সম্মত হয়েছেন।
লিভারপুলে অনুষ্ঠিত লেবার পার্টির সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি এমন একটি সমঝোতা ঘোষণা করবেন যা যুক্তরাজ্যে বর্তমানে বসবাসরত হাজার হাজার অভিবাসীর প্রতি ‘ন্যায্য’ হবে। তাঁর আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে অভিবাসীদের আরও এক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।
মিস মাহমুদ বর্তমানে উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার এবং প্রায় ১০০ জন লেবার দলীয় এমপির চাপের মুখে রয়েছেন। তাঁরা দাবি জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত পরিকল্পনা থেকে যেন প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ‘কেয়ার ওয়ার্কার’ বা পরিচর্যাকারীকে বাদ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ওই পরিকল্পনায় ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (ILR) বা অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাসের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষার সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করার কথা বলা হয়েছিল।
সপ্তাহান্তে কমিউনিটি বিষয়ক মন্ত্রী মিস রেইনার এই পরিকল্পনাকে ‘অন্যায্য’ বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, এটি অতীতের সিদ্ধান্তের ওপরও কার্যকর হবে এবং নিয়মের মাঝপথে শর্তাবলী বদলে দেবে। এর আগেও তিনি মিস মাহমুদের অভিবাসন-কড়াকড়ি পদক্ষেপকে ‘অ-ব্রিটিশ’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। গত শুক্রবার তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিকল্পনা এমন সব বিদেশি কেয়ার ওয়ার্কারদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে, যাঁরা “আমাদের প্রিয়জনদের দেখাশোনা করার জন্য নিজেদের জীবন গুছিয়ে এখানে এসেছেন”।
গত সোমবারের বক্তৃতায় মিস মাহমুদ বলেন, “আমরা যেমন আমাদের আশ্রয়প্রার্থনা বা অ্যাসাইলাম ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যতা ফিরিয়ে আনছি, তেমনি বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও আমাদের তা করতে হবে। এটি তাদের জন্যও ন্যায্য হতে হবে, যারা আমার বাবা-মায়ের মতো এখানে নতুন ও উন্নত জীবনের সন্ধানে এসেছেন। আবার যারা ইতিমধ্যে এখানে আছেন—যার মধ্যে ব্রিটিশ কর্মী এবং বিশেষ করে তরুণরা অন্তর্ভুক্ত—তাদের প্রতিও সুবিচার করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাসের অধিকার সংক্রান্ত আমার সংস্কারের মূল ভিত্তিও সেই একই নীতি। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে, যারা এই দেশের প্রতি ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি ও নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, কেবল তারাই যেন ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’ বা স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা অর্জন করেন। আমি জানি, আমাদের পরামর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়ার সময় কেউ কেউ বলেছেন এই সংস্কারের কিছু অংশ ন্যায্য নয়। তাদের উদ্দেশ্যে আমি শুধু এটুকু বলতে চাই: আমরা এমন একটি অবস্থানে পৌঁছাব, যা একদিকে বৈধভাবে আগতদের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে সারা দেশের ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকারও বজায় রাখবে।”
ধারণা করা হচ্ছে, প্রবীণদের জন্য ‘ব্যবহারের সময় বিনামূল্যে সেবা’ (free at the point of use) ভিত্তিক একটি সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কেয়ার ওয়ার্কারদের জন্য বিশেষ ছাড় বা আলাদা ব্যবস্থার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের (Home Office) প্রাক্কলন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ সরকারের আমলে ব্রিটেনে আসা ১ লাখ ৮৫ হাজার বিদেশি কেয়ার কর্মীকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার ফলে নিট আর্থিক ব্যয় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।
মিস মাহমুদের ‘অর্জিত স্থায়ী বসবাসের’ (earned settlement) পরিকল্পনা অনুযায়ী, অভিবাসীদের ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ বা আইএলআর (ILR) পাওয়ার ক্ষেত্রে ৫ বছরের পরিবর্তে প্রাথমিকভাবে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তবে কাজের দক্ষতা, আয় এবং ব্রিটিশ সমাজে অবদানের ওপর ভিত্তি করে এই ১০ বছরের অপেক্ষার সময়সীমা বাড়ানো বা কমানো যেতে পারে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে আইএলআর পাওয়ার অধিকার বিলম্বিত বা বাতিল হতে পারে।
সম্মেলনে মিস মাহমুদ বলেন, ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতাই তাঁর অভিবাসন সংস্কারের মূল ভিত্তি; কারণ মানুষ যখন মনে করে যে অভিবাসীরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে, তখন তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যায় বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “যে ব্রিটেন ন্যায়পরায়ণ নয়, তা আমার মতো দেখতে মানুষদের জন্য অনেক বেশি সংকীর্ণ ও প্রতিকূল। তাই আমার কাজ হলো আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থায় এবং আমাদের রাস্তায় সেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আর এমন এক সময়ে এই কাজ করতে হচ্ছে, যখন অন্যরা আমাদের বিভক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্মেলনে উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আমাদের সীমান্তে নিয়ন্ত্রণহীনতার মধ্যে কোনো ন্যায়বিচার থাকতে পারে না। অপরাধী চক্র নির্ধারণ করবে কারা এই দেশে আসবে—তা কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে না। মানুষের জীবনের প্রতি কোনো তোয়াক্কা না করে বিপজ্জনক নৌকায় তাদের তুলে দেওয়াটা মোটেও ন্যায্য নয়—যা আজ আবারও প্রমাণিত হলো ইংলিশ চ্যানেলে আরও তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।”
ডোভের ও পোর্টসমাউথে অভিবাসন-বিরোধী বিক্ষোভকারী ‘প্যাট্রিয়টিক প্ল্যাটফর্ম’ (Patriotic Platform) গোষ্ঠীর—যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড্যানিয়েল “টোমো” থমাস—“কালো পোশাকে সজ্জিত ও মুখোশধারী বর্ণবাদীদের” দেখে তিনি তীব্র ঘৃণা ও শিউরে ওঠার মতো অনুভূতি অনুভব করেছেন বলে জানান মিস মাহমুদ। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্যই হলো “আমার মতো জনগোষ্ঠী বা কমিউনিটিকে ভয় দেখানো”।
তিনি উল্লেখ করেন, লেবার পার্টি ছোট নৌকায় করে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার ঘটনা কমিয়েছে এবং ৪৮ হাজার মানুষকে আটকে দিয়েছে। ফলে ২০২১ সালের পর থেকে এই গ্রীষ্মে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সবশেষে মিস মাহমুদ নিশ্চিত করেন যে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য ব্রিটেনে আসার নতুন “নিরাপদ ও বৈধ” পথ চালু করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা শরণার্থীরা, যাদের ৫ বছরের মধ্যে দ্রুত স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করা হবে; ইউক্রেন-ধাঁচের কমিউনিটি স্কিমের আওতায় স্পনসর বা সহায়তাকারীর সাথে বসবাসকারী শরণার্থী এবং শিক্ষার্থীরা।

Spread the love

Leave a Reply