এডিএইচডি-র কারণে পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া কেমব্রিজের শিক্ষার্থীদের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি
ডেস্ক রিপোর্টঃ গত চার বছরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার)-এর কারণে অতিরিক্ত সময় ও পরীক্ষার অন্যান্য বিশেষ সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের ‘ইস্টার টার্ম’-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮৬৫ জন শিক্ষার্থী এডিএইচডি-তে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানানোর পর তাদের পরীক্ষার সময় “যৌক্তিক বা প্রয়োজনীয় কিছু বিশেষ ব্যবস্থা” (reasonable adjustments) গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
এই বিশেষ ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে পারে অতিরিক্ত সময় পাওয়া, বিরতি নেওয়া কিংবা কম্পিউটার ব্যবহারের অনুমতি।
২০২২ সালের একই টার্মে এই সংখ্যাটি ছিল ৩২০; অর্থাৎ সংখ্যাটি ১৭০ শতাংশ বেড়েছে। কেমব্রিজের একজন শিক্ষাবিদ এই ঘটনাকে “অযৌক্তিক অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি” (absurd mollycoddle culture)-র লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ক্লেয়ার কলেজের ‘ফিলোসফি অফ রিলিজিয়ন’ বা ধর্ম-দর্শন বিষয়ের অধ্যাপক ডগলাস হেডলি ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে বলেন: “পরীক্ষা মানেই কিছুটা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা—কেউই তা উপভোগ করে না। কিন্তু জ্ঞান ও চরিত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে টিকে থাকার সক্ষমতা শেখানোর ক্ষেত্রে পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।”
“‘নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরার সংস্কৃতি’ (victim culture) এবং সমাজকে অতিরিক্ত মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা—এই দুয়ের সংমিশ্রণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে উদ্বেগজনক প্রভাব ফেলছে।” ক্যামব্রিজ জানিয়েছে, বিশেষ ব্যবস্থার (adjustments) জন্য আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের অবশ্যই “অক্ষমতার প্রমাণ” দাখিল করতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও দাবি করেছে যে, ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা ‘নিউরোডাইভারসিটি স্ক্রিনিং’ বা স্নায়বিক বৈচিত্র্য শনাক্তকরণ পরিষেবাটি এই সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রায় প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ‘এক্সামিনেশন অ্যাক্সেস অ্যারেঞ্জমেন্টস’ (EAA) বা পরীক্ষার বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা ছিল ২,০৭৫, যা বেড়ে ৩,৫০৭-এ দাঁড়িয়েছে।
EAA-এর আওতাভুক্ত ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে পরীক্ষার জন্য ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ, বিরতি নেওয়ার সুযোগ এবং হাতে লেখা পরীক্ষার সময় ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহারের অনুমতি।
এডিএইচডি (ADHD) এবং উদ্বেগ
এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পেছনে রয়েছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর এডিএইচডি (ADHD), উদ্বেগ এবং অন্যান্য শারীরিক বা মানসিক অবস্থার কারণে EAA সুবিধা গ্রহণ। এসব কারণে EAA সুবিধা প্রদানের সংখ্যা ২০২২ সালের ‘ইস্টার টার্ম’-এ ৪৭৩টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের একই সময়ে ৬১৬টিতে উন্নীত হয়েছে।
২০২৫ সালের ওই একই সময়ে অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD)-এর জন্য ১১২ জন শিক্ষার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৫২ জন।
ক্যামব্রিজে ‘ইস্টার টার্ম’ হলো পরীক্ষার প্রধান সময়কাল।
ইউনিভার্সিটি অফ কেন্টের সমাজবিজ্ঞানের এমেরিটাস অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক ফুরেদি—যিনি সমাজে “থেরাপি সংস্কৃতি”র বিস্তার নিয়ে এর আগে একটি বই লিখেছেন—বলেন: “মানুষের অতিরিক্ত সময়ের জন্য আবেদন করাটা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে; অথচ ১০ বছর আগেও এটি ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা এবং পরীক্ষার প্রক্রিয়ার ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় ও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন হতো।”
“মানুষ যে এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই এবং আমার মনে হয় না যে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রবণতা থামবে।”
“দীর্ঘমেয়াদে, যারা এ ধরনের বিশেষ সুবিধার ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তারা সময়ের চাপের মধ্যে কাজ করতে সক্ষম শিক্ষার্থীদের তুলনায় নিজেদের একাডেমিক দক্ষতা সেভাবে গড়ে তুলতে পারে না।” ‘ফ্রিডম অফ ইনফরমেশন’ বা তথ্য জানার অধিকার আইনের আওতায় ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই বিশেষ পরীক্ষার সুবিধা বা ‘ইএএ’ (EAA) পাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আইন বিভাগের প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনেরও বেশি শিক্ষার্থী এই বিশেষ সুবিধা বা ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ পেয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ঘণ্টার স্নাতক পর্যায়ের আইন পরীক্ষাগুলোর সময়সীমা অত্যন্ত কঠোর হওয়ায় সেগুলো বিশেষ কঠিন হয়ে পড়ে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে বলেন: “আইন পরীক্ষাগুলো কঠিন হওয়ার কারণ হলো, একটি প্রশ্নের উত্তর শেষ করে তাড়াহুড়ো করে পরের প্রশ্নে চলে যেতে হয়; ফলে নিজের উত্তরের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার বা তা যাচাই করার মতো সময় পাওয়া যায় না।”
‘অন্যায় সুবিধা’
কেমব্রিজের আইন শিক্ষার্থীদের একটি ফোরামে এমন কিছু বার্তা দেখা গেছে (যা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর নজরে এসেছে), যেখানে দাবি করা হয়েছে যে শিক্ষার্থীরা “অন্যায় সুবিধা পাওয়ার” উদ্দেশ্যে এই বিশেষ ব্যবস্থার অপব্যবহার করছে।
ফোরামে মন্তব্যকারী একজন শিক্ষার্থী বলেন: “আমি এমন অনেককে চিনি যারা বাড়তি সময় পাওয়ার জন্য মিথ্যা তথ্য দিয়েছে বা পরিস্থিতি বাড়িয়ে বলেছে—এবং এ নিয়ে তারা গর্ব ও হাসি-ঠাট্টা করেছে।
“এরপর তারা অন্যদেরও বাড়তি সময় পাওয়ার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করে এবং বলে যে এটা পাওয়া খুব সহজ।”
অনলাইনে আরেকজন মন্তব্য করেন: “স্পষ্টতই মানুষ বাড়তি সময় এবং পরীক্ষার অন্যান্য বিশেষ ব্যবস্থার অপব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
কনজারভেটিভ পার্টির ‘লাইফ পিয়ার’ (আজীবন উচ্চকক্ষ সদস্য) এবং কেমব্রিজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী লর্ড ইয়াং অফ অ্যাক্টন বলেন: “কোনো ল ফার্ম বা আইনি প্রতিষ্ঠান এখন কেমব্রিজ থেকে পাস করা আইন স্নাতকদের নিয়োগ দেবে? কারণ তারা তো জানবে যে, এদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরই পরীক্ষা শেষ করার জন্য বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হয়।”
‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এই সপ্তাহের শুরুর দিকেই জানিয়েছিল যে, আইন স্নাতকদের জন্য চাকরি পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এর কারণ হিসেবে আইন নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং উপলব্ধ প্রশিক্ষণ চুক্তি (ট্রেনিং কন্ট্রাক্ট) ও শিক্ষানবিশ পদের (পিউপিলজ) সংখ্যার মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
কেমব্রিজে ইংরেজি সাহিত্য এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিশেষ পরীক্ষার সুবিধা পাওয়ার হার বেশ বেশি।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্তকরণের হার বৃদ্ধি
ব্রিটেনে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে; এমনকি মাত্র ছয় বছর বয়সী শিশুদেরও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে (A&E) চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
গত বছরের শেষের দিকে, তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্তকরণের হার—বিশেষ করে এডিএইচডি (ADHD)-র মতো সমস্যা শনাক্তকরণের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি—নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে একটি পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।