এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দিচ্ছে, ৪০ ভাগ দলীয় ৬০ ভাগ বাইরের প্রার্থী

Spread the love

জোটগত নাকি এককভাবে নির্বাচন করবে-এমন প্রশ্নে এখনও কৌশলি অবস্থান নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা আলোচনার মধ্যেও দলটি এখনও একক নির্বাচনের পথে হাঁটছে। এনসিপি নেতারা বলছেন, সংসদ নির্বাচন করতে হলে জোট গঠন করতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। এমন কথা এনসিপি বলেওনি। তবে গণমাধ্যমকর্মীরা ইচ্ছামতো ‘শব্দ’ ব্যবহার করে নিউজ করেই যাচ্ছে। সংস্কার, বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট হতে পারে। তাদের মতে, জোটই সব নয়, জোটের গঠনের দরজা খোলা রয়েছে। তবে জোট হলে হবে; না হলে হবে না।

তারা জানান, এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দিচ্ছে। ৪০ শতাংশ দল এবং দলের বাহির থেকে ৬০ শতাংশ প্রার্থী চূড়ান্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক মাঠে আলোচনা রয়েছে, বিএনপিসহ সমমনা যে কোনো দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যেতে পারে এনসিপি। দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন করছেন, এমন আলোচনাও আছে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি আসনসহ শীর্ষ নেতাদের স্থানীয় এলাকার আসনগুলোতে বিএনপি প্রার্থী দেবে না-এমন আলোচনা ঘুরপাক খেয়েছে বেশ কিছুদিন ধরেই। ইতোমধ্যে ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষিত হয়েছে। সারা দেশে ২৭২টি আসনে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে এনসিপিও ঢাকাসহ সারা দেশে ১০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই বাকি ২০০ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে চায় দলটি।

এদিকে বিএনপির সঙ্গে জোট না হলে দুই ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এনসিপিতে যোগ দেবে না বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এই দুই ছাত্র উপদেষ্টা সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করবে, এমন আলোচনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের অন্যতম এই দুই নেতার সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতারা বারবার বৈঠকে বসছেন। দুই ছাত্র উপদেষ্টা এনসিপিতে যোগ দেবেন-এমন প্রত্যাশা করছেন দলটির নেতা-কর্মীরাও। আবার অন্যদিকে, দুই ছাত্র উপদেষ্টার সঙ্গে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে শুক্রবার বিকালে এনসিপির যুগ্ম-সদস্য সচিব ও দলটির মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন যুগান্তরকে বলেন, ‘এনসিপির জন্য কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আসন ছেড়ে দেবে এমন কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার আলোচনা হয়নি। পুরো বিষয়টাই এক ধরনের প্রোপাগান্ডা ছিল-এমন দাবি করে তিনি বলেন, পুরো বিষয়গুলোই নির্বাচনী ক্ষেত্রে এনসিপিকে কিছুটা খাটো করে দেখানোর প্রচেষ্টা হচ্ছে। আমরা এরকম নিউজ বারবার দেখতে পাচ্ছি, যা নেতিবাচকভাবে ছড়ানো হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, আমরা এককভাবে নির্বাচন করার সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের সক্ষমতা যাচাই করছি। তবে পরবর্তীতে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের চিন্তা ও সংস্কারকেন্দ্রিক যে ভিশন, ভাবনা এবং আমরা বাংলাদেশকে যেভাবে দেখতে চাই, সেটার সঙ্গে যদি কোনো দলের মিল পাওয়া যায়, তাহলে নিশ্চয়ই সমঝোতা বা জোটের পথ খোলা থাকবে।’

আমরা শুধু জোটের জন্য তাকিয়ে আছি, এমনটা একেবারেই সত্য নয় জানিয়ে মুশফিক উস সালেহীন আরও বলেন, আমরা এককভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রার্থী দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রথম ধাপে আমরা ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করব। এ মাসের মধ্যেই ধারাবাহিকভাবে বাকি ২০০ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। আমাদের দল, প্রার্থীদের সক্ষমতা দেখছি। মনোনয়নপত্র শুধু আমাদের দলের নেতারাই নেননি, দলের বাহির থেকেও অনেকে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। আমরা সব যাচাই-বাছাই করে প্রার্থী ঘোষণা করব।

তবে এনসিপির একাধিক নেতা জানান, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে শীর্ষ নেতাদের অনেকে আশ্বাস পেয়েছেন। এক্ষেত্রে বিএনপি ৫ থেকে ৮টি আসন ছাড়তে পারে। এনসিপির অধিকাংশ শীর্ষ নেতা মাঠপর্যায়ের প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। জোট হলে দেশের অন্যতম একটি বড় দলের সঙ্গেই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

শুক্রবার সন্ধ্যায় এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার দিকে এগোচ্ছি। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। এ কারণে আমরা প্রত্যেক আসনে নির্বাচন করব, যাতে করে উচ্চকক্ষে আমাদের সরব উপস্থিতি থাকে। আমরা বিভিন্ন আসনে শক্তিশালী প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে। এতে করে স্থানীয়ভাবে শাপলা কলির প্রভাব থাকবে। যারা তরুণ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, তাদের সমন্বয়ে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হচ্ছে। আমাদের নির্বাচনে নানা পেশাজীবীদের একটি প্রতিফল ঘটবে।’

এনসিপির হয়ে যারা নির্বাচন করবে তারা সবাই এনসিপির নয় জানিয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘প্রার্থীদের মধ্যে সবাই কিন্তু এনসিপি করছে না। এনসিপির বাইরে অনেক প্রার্থী আছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রার্থী এনসিপির বাহির থেকে দেওয়া হবে। তারা সবাই জুলাই অভ্যুত্থানে ছিলেন। আমরা চাচ্ছি পার্টি এবং পার্টির বাইরে যারা নির্বাচন করবে, এদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। অর্থাৎ আমরা সামনে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, সেটার ওপর ভিত্তি করে তালিকা চূড়ান্ত করছি।’

জোটের বিষয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘আমরা এটাও বিবেচনা করি, আসলে অনেক দল তো সংস্কারের সপক্ষে সামনে রেখে লড়াই করেছে। সেই দলগুলোর সঙ্গে আমাদের যেন একটা উত্তম সম্পর্ক থাকে এবং ভবিষ্যতে যেন এ সম্পর্কের ভিত্তিতে আরও কাজ করা যায়। জোটের বিষয়ে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। আমরা চাই সংস্কারের সপক্ষে সব শক্তি ঐক্যবদ্ধ হতে। একই সঙ্গে নিজেদের দলের যে সক্ষমতা, সেটাও প্রদর্শন করা জরুরি। এ জন্যই আমরা একক নির্বাচনের দিকে হাঁটছি’।

দুই ছাত্র উপদেষ্টার রাজনীতি এবং নির্বাচন করার বিষয়ে সামান্তা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, ‘তারা (দুই ছাত্র উপদেষ্টা) এখন সরকারে আছেন। অবশ্যই সরকার থেকে নেমে এসে তারা রাজনীতির বিষয়গুলো পরিষ্কার করবেন। ক্ষমতা থেকে নেমেই তাদের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষকে জানানো উচিত। সরকারে থেকে কোনো রাজনৈতিক দলে প্রভাব বিস্তার করা বা কোনো রাজনৈতিক দলকে সহযোগিতা করা, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া কোনো ক্রমেই উচিত নয়। একইসঙ্গে বলতে চাই, সরকারে বিএনপি ও জামায়াতেরও উপদেষ্টা আছে। দেখা যাচ্ছে ওইসব রাজনৈতিক দলগুলোকে তারা পুরিপুষ্ট করছে।’

সামান্তা শারমিন বলেন, আমরা মনে করি যে, যেসব উপদেষ্টা ওইসব রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচন করতে চান, তারা সরকারে থেকে প্রচার-প্রচারণা না করে সাধারণ মানুষের কাতারে আসুন। তারপর দেখেন সাধারণ মানুষ আপনাদের কেমন করে মূল্যায়ন করে। তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে দুই ছাত্র উপদেষ্টা যে এনসিপিতে আসবে কিংবা অন্য উপদেষ্টারা এনসিপি বা অন্য দলে যাবে, তা বলা যাচ্ছে না। তবে ছাত্র উপদেষ্টাসহ অন্য কোনো উপদেষ্টা আমাদের দলে এলে শুভ কামনা জানাব না এমনটা নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এনসিপি উন্মুক্ত। তবে এ ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা, কেলেঙ্কারি থাকা যাবে না।


Spread the love

Leave a Reply