কতজন আশ্রয়প্রার্থী ব্রিটেনে আসছেন এবং তাঁরা কারা?
ডেস্ক রিপোর্টঃ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ একটি “গুরুতর ঘটনা” সামাল দিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় পারিবারিক সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন। তার আগের আট সপ্তাহে, প্রায় ২২০ জন অভিবাসী আশ্রয়ের আবেদনের উদ্দেশ্যে ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। সেই সময় যা ছিল সংকটের লক্ষণ, তা আজ হয়তো অগ্রগতির নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতো: কারণ গত প্রান্তিকে প্রায় ৭,৫০০ মানুষ একই রকম ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা সম্পন্ন করেছে।
গত পাঁচ বছরে ব্রিটেন নজিরবিহীন মাত্রায় গণ-অভিবাসন প্রত্যক্ষ করেছে—যার বেশিরভাগই ঘটেছে কর্মসংস্থান, পড়াশোনা এবং নির্ভরশীলদের (dependants) ভিসার মাধ্যমে; পাশাপাশি হংকং ও ইউক্রেনের নাগরিকদের জন্য মানবিক কারণে বিশেষ অভিবাসন পথও উন্মুক্ত ছিল। তবে জনমানসে ব্রিটেনের আশ্রয়প্রার্থী-সংক্রান্ত ব্যবস্থাই (asylum system) সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২০ সালে বছরে প্রায় ৩৮,০০০ মানুষ আশ্রয়ের আবেদন করেছিল। ২০২৫ সাল নাগাদ অপরাধী চক্রগুলো চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পথটিকে একটি সংগঠিত ও ব্যাপক কার্যক্রমের (industrialised) পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং আবেদনের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ২০২১ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ ব্রিটেনে আশ্রয়ের আবেদন করেছে।
নতুন আসা এই মানুষ কারা? সংগঠিত অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং নিজ দেশে দারিদ্র্যের কারণে ২০২২ সালে আলবেনিয়া (যাকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি “নিরাপদ দেশ” হিসেবে গণ্য করে) থেকে আগতদের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছিল। তবে সাম্প্রতিক অভিবাসীদের বিশাল অংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ২০২১ সাল থেকে প্রায় ৪৪,০০০ আবেদন নিয়ে ইরান তালিকার শীর্ষে রয়েছে; এরপরই রয়েছে আফগানিস্তান (৪০,০০০) ও পাকিস্তান (৩৪,০০০)। কৌতূহলজাগানিয়া বিষয় হলো, কাজের ভিসায় আসা বিপুল সংখ্যক ভারতীয়র বাইরেও প্রায় ২৩,০০০ ভারতীয় ব্রিটেনে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পুরুষ; এক দশক আগে এই অনুপাত ছিল দুই-তৃতীয়াংশ। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়স ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।
যুক্তরাজ্য অতীতেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ২০০২ সালে ইরাক, সোমালিয়া ও জিম্বাবুয়েতে অস্থিরতার কারণে আশ্রয়ের আবেদনের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে সেই সময়ের তুলনায় বর্তমানে যা পরিবর্তিত হয়েছে, তা হলো ব্রিটেনের উদারতার মাত্রা। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র ১২ শতাংশ আশ্রয় আবেদনের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছিল।
বর্তমানে, সব আবেদনের প্রায় ৪০ শতাংশই প্রাথমিক পর্যায়ে গৃহীত হয়। ২০২২ সালে এই হার আরও বেশি ছিল—৭৬ শতাংশ। আর যেসব দেশের নাগরিকরা সাধারণত ব্রিটেনে আশ্রয়ের আবেদন করেন, তাদের ক্ষেত্রে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশ ভালো। যেমন, ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইরানিদের করা আশ্রয় আবেদনের ৪১ শতাংশ মঞ্জুর করেছিল, যেখানে ব্রিটেন মঞ্জুর করেছিল ৬৭ শতাংশ। একইভাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাকিস্তানি আবেদনকারীদের ২২ শতাংশের আবেদন গ্রহণ করেছিল, আর ব্রিটেন গ্রহণ করেছিল ৫১ শতাংশ।
আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা যখন দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Home Office) সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে ধীরগতি দেখিয়েছিল। এর ফলে অনিষ্পন্ন আবেদনের (ব্যাকলগ) সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়—২০২০ সালে যা ছিল প্রায় ৬০,০০০, তা ২০২৩ সালে ১,৭৫,০০০-এ পৌঁছায়। সে সময় এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক—অর্থাৎ ৯১,০০০ জন—সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় এক বছরেরও বেশি সময় পার করছিলেন; এর অর্থ হলো, কর্মী-সংকট রয়েছে এমন পেশায় তাদের অর্থের বিনিময়ে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবাদে আশ্রয়ের অনিষ্পন্ন আবেদনের সেই সংখ্যা এখন দ্রুত কমছে।
সাপ্তাহিক ৪৯.১৮ পাউন্ড ভাতার পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়। আবাসন-সংক্রান্ত এই বিষয়টি বিশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ৯০,০০০ আশ্রয়প্রার্থী কোনো না কোনো ধরনের আবাসনে অবস্থান করছিলেন। ২০২৩ সালে যখন অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল, তখন ৫৬,০০০ আশ্রয়প্রার্থীকে হোটেলে রাখা হয়েছিল—যা সাম্প্রতিক গ্রীষ্মকালগুলোতে ব্যাপক প্রতিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, হোটেলে অবস্থানকারী আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমে ১৬,০০০-এ নেমে এসেছে। তবে সরকার এখন ‘ডিসপার্সাল অ্যাকোমোডেশন’ বা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আবাসন প্রদানের পদ্ধতির দিকে বেশি ঝুঁকছে; সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৯,০০০ আশ্রয়প্রার্থীকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে আবাসন দেওয়া হয়েছে, যাদের অনেকেই ‘এইচএমও’ (HMO—একাধিক ভাড়াটিয়া বা পরিবারের যৌথ বসবাসের উপযোগী বাড়ি)-তে থাকছেন।
আশ্রয়প্রার্থীদের ভৌগোলিক বিন্যাস বা অবস্থানের বিষয়টিও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। জুন মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় (North East) ‘ডিসপার্সাল’ বা হোটেল আবাসনে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর হার ছিল সবচেয়ে বেশি—প্রতি ১,০০০ বাসিন্দার বিপরীতে ২.৫ জন। এর পরেই রয়েছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (North West)—২.৩ জন এবং পশ্চিম মিডল্যান্ডস (West Midlands)—১.৮ জন। ঐতিহাসিকভাবেই এই এলাকাগুলোকে আশ্রয়প্রার্থীদের ছড়িয়ে রাখার (dispersal) জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, কারণ এখানে আবাসন খরচ কম এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সামাজিক আবাসনের (কাউন্সিল হাউজিং) জন্য অপেক্ষমান তালিকার দৈর্ঘ্যও সাধারণত কম থাকে। তবে ‘জার্নাল অফ আরবান ইকোনমিক্স’-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় আশ্রয়প্রার্থীদের পুনর্বাসনের ফলে সেখানকার বাড়ির দামে সামান্য হলেও লক্ষণীয় হ্রাস ঘটেছে। যেসব এলাকা আগে থেকেই পিছিয়ে পড়া বা অবহেলিত—অর্থাৎ যেখানে বঞ্চনা বেশি এবং গড় আয়ু কম—সেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে বিশেষ করে হোটেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে লন্ডনের হার অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি; পশ্চিম লন্ডনের হিলিংডন (৯৬৫ জন আশ্রয়প্রার্থী) এবং হাউন্সলো (৯২৪ জন)—এই দুটি এলাকায় অন্য যেকোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এলাকার তুলনায় হোটেলেই বেশি সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থী অবস্থান করছেন।
আশ্রয়প্রার্থীদের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও আবাসনের ব্যবস্থা করা—বিশেষ করে হোটেলে রাখা (যার খরচ প্রতি রাতে প্রায় ১৬০ পাউন্ড, যেখানে সাধারণ পুনর্বাসন আবাসনের খরচ রাতে মাত্র ২০ পাউন্ড)—করদাতাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অক্সফোর্ড মাইগ্রেশন অবজারভেটরির বিশ্লেষণ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্রিটেনের আশ্রয় প্রদান ব্যবস্থার পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ ৭৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে বেড়ে ৫.৪ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছেছে। এই বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে আবাসন খাতে; ২০২৪ সালে ব্যয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার জন্য ৩ বিলিয়ন পাউন্ড—বা প্রতিদিন ৮.৩ মিলিয়ন পাউন্ড—খরচ করছিল। এই অর্থের একটি বড় অংশ আসছে ব্রিটেনের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট থেকে।