শনিবার , ৮ আগস্ট ২০২০
Menu
Home » মতামত » করোনাভাইরাস আতঙ্কের মাঝে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার

করোনাভাইরাস আতঙ্কের মাঝে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার

এম, এ, আজিজ:

প্রতিটি মানুষের জীবনে রয়েছে নানাবিধ সামাজিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা । সে স্মৃতির আলোকেই আজকের এই প্রবন্ধ । অনেকপাঠকের হয়তো বা গ্রামবাংলায় বহুল কথিত ঘোলা পানিতে মাছ শিকার প্রবাদটির বিষয়ে কম বেশী জানা আছে । আবারঅনেকের হয়তো বা ঘোলা পানিতে মাছ ধরার বাস্তব অভিজ্ঞতাও রয়েছে । বাংলাদেশে সাধারণতঃ চৈত্র মাস ও কার্তিক মাসেখাল, বিল, হাজা, মজায় পানি শুকিয়ে যায় । তখন গ্রামবাংলার মানুষ দল বেঁধে পলো, ঠেটা দিয়ে হাজা-মজায় মাছ ধরতেনামে । মানুষের পদচারনায় অল্প সময়েই সেখানে পানি ঘোলা হয়ে যায় । শুধু ঘোলাই হয়না পানি কাদায়ও রুপান্তরিত হয় ।সে কাদা-পানিতে অনেকে আবার অন্ধের মত হাত দিয়েও মাছ ধরে । শৈশবে সে অভিজ্ঞতা আমার নিজেরও রয়েছে ।সন্ধ্যায়হাটে বাজারে চায়ের আড্ডায় ঘোলা পানিতে মাছ ধরার রসিকতাপূর্ণ কল্প-কাহিনী শুনা যায় । আসলে ঘোলা পানিতে মাছশিকার বা ধরার প্রবাদটি কখন যে শুরু হয়েছিল তা আমার অজানা । তবে আমাদের দেশে প্রায়শই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেরাজনীতিবীদ, ব্যাবসায়ী বা সমাজপতিগণ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অভিযোগ করে থাকেন । শুধূ তাই নয় গ্রামে, গন্জে, শহরে বন্দরে কিছু স্বীর্থান্বেষী মহল রয়েছে যারা যেকোন পরিস্হিতি ঘোলাটে করে ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টিতে ইন্দন যোগায় । তাদেরউদ্দেশ্য থাকে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা । মূলতঃ সত্যিকার ভাবে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার না করে পরিস্হিতি ঘোলাটে করেতাতে সুযোগ/সুবিধা নেওয়ার চেষ্টাকেই নাকি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে । যারা মানুষের দূঃসময়েবা জাতীয় বিপর্য্যয়ে সহানুভূতিশীল না হয়ে পরিস্হিতির সুযোগ গ্রহন করে তাদেরকে সুযোগসন্ধ্যানী বলা হয় ।

বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করেনাভাইরাসের চলমান মহামারীতে আপাময় জনগণকে লকডাউনে রাখা হয়েছে । কর্মহীন বেকার ওআতঙ্কগ্রস্থ মানুষ তাদের ভবিষ্যত নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় । মানুষের জীবনে অপ্রত্যাশিত এই চরম দূঃসময়ে দেশ-বিদেশের কিছুঅসাধু ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সমাজ সেবক ও সমাজপতিগণ পরিস্হিতি ঘোলাটে করে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতেউদ্যোত । অদৃশ্য ঘাতক করোনাভাইরাসের তান্ডব থেকে জনজীবন রক্ষার্থে প্রতিটি দেশে সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। আতঙ্কিত জনগণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আগে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করে বড় বড় ইংলিশ ষ্টোর্স গুলোউজার করে ফেলেন । কোথাও কোন ইংলিশ ষ্টোরের মালিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করেনি । অমানবিক কান্ড ঘটেছে শুধূ এশিয়ান হালালগ্রোসারী ও গোস্তের দোকান সমূহে । আতঙ্কগ্রস্ত সাধারন মানুষের খাদ্যসামগ্রী ক্রয় কালে বিলাতের এশিয়ান অসাধূ হালালগ্রোসারী দোকান মালিকগণ ঘোলাটে পরিস্হিতিতে মাছ শিকার করতে দেখা যায় । বিপদগ্রস্ত ভোক্তাগণের কাছ থেকে নিয়মবর্হিভূত ভাবে উচ্চ মূল্য আদায় করতে তাদের বিবেকে বাঁধেনি । এমনি পরিস্হিতিতে ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে প্রচারের ফলেবেশকিছু দোকান মালিককে সরকারী ভাবে জরিমানা করা হয় । বাংলাদেশে যা কল্পনাও করা যায়না । আমাদের দেশে বরংলাগামহীন ভাবে দোকান মালিকগণ ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ।সেখানে আইনের কোন প্রয়োগ নেই বরং অতি মোনাফার লোভে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয়জিনিষপত্র মওজুদ করে রাখে । বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারেব্যবসায়ীদের অমানবিক ঘটনায় অসহায় মানুষের আহাজারীর খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে । জনগণকে প্রতিনিধিত্বকরার দাবীদার এম,পি/ মন্ত্রী ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিগণ ২/১ ভাগ ছাড়া অধিকাংশরা ভয়ে নিরাপত্তা বজায় রেখে যেনএতেকাফে সময় কাটাচ্ছেন । লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো যারা ব্যাংক, বীমা, শেয়ার মার্কেট লুন্ঠন করেছেন এবং হাজার হাজার কোটিটাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন, বিলাসবহুল বাড়ী, গাড়ী করেছেন সে সকল নব্য ধনী লুটেরার দল গণমানুষের এইচরম দূঃসময়ে চোখে পরেছে কালো চশমা আর কানে দিয়েছে তুলা । যারা সরব রয়েছেন তাদের অনেকের ছত্রছায়ায় থেকেই নাকিদলীয় ক্যাডার, চেয়ারম্যান মেম্বারগণ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন । হাজার হাজার টন ত্রাণের চালচোরদেরকে ধরার খবর গণমাধ্যমে এসেছে । কিন্তু পর্য্যবেক্ষকদের মতামত হল অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের মত বিচারের বাণীনীরবে নির্বৃতে কাদার সম্ভাবনা রয়েছে ।

করোনাভাইরাসের সংক্রামন থেকে জনগণকে বাচানোর জন্য আর্ন্তজাতিক দাতা গোষ্ঠি উন্নয়নশীল দেশ সমূহে ত্রাণ সাহায্যপ্রেরন করেছে । আমাদের দেশেও পর্য্যাপ্ত পরিমান ত্রাণ সাহায্য পাঠানো হয়েছে । অভূতপূর্ণ এই পরিস্হিতিতে আমাদের দেশেরঅসৎ সুযোগ সন্ধ্যানীগণ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মেতে উঠেছেন । লকডাউনে দেশের সর্বত্র এই সকল সুযোগসন্ধ্যানীরাকর্মহীন গরীব, অসহায়, দুঃস্হ মানুষের জন্য প্রেরীত হাজার হাজার টন রিলিফের চাল, নগদ টাকা আত্মসাত করে আঙ্গুল ফূলেকলাগাছে পরিনত হওয়ার খবর প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে ।

জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশী নাগরীক গরিবী হটানোর জন্য কর্মের সন্ধানে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরেছেন । এইসকল প্রবাসীরাই প্রচন্ড শীত ও গরমে অমানুষিক পরিশ্রম করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের চাকা সচল রাখেন। দেশে প্রাকৃতিক কোন বিপর্য্যয় ঘটলে বা কোন মহামারী দেখা দিলে দেশ ও দেশের গরীব, অসহায় দুঃস্হ মানুষের জন্যপ্রবাসীদের কোমল মন কেদে উঠে । প্রবাসে কর্মরত প্রবাসীরা ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এলাকাবাসীর মাঝে ত্রাণ বিতরন করেন ।এছাড়াও বিদেশে কর্মরত স্ব স্ব এলাকা বা দেশের অন্যান্য প্রবাসীদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে দেশে বিপদগ্রস্ত অসহায়মানুষের সাহায্যে প্রেরন করেন । যদিও বর্তমান বিশ্বমারী করোনাভাইরাসের চলমান পরিস্হিতিতে “ সোনার ডিম “ দেওয়াপ্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়েন । অনেক প্রবাসী বাধ্য হয়ে নিজ দেশে নিজের নীড়ে ফিরে যান । দেশে ফেরা প্রবাসীদেরকে প্রশাসনথেকে শুরু করে সাধারন নাগরীক দ্বারা নিগৃহীত ও হয়রানীর শিকারে পরিনত হতে দেখা যায় । যা অত্যান্ত দূঃখজনক ওপ্রবাসীদেরকে ব্যাথিত করেছে । যে প্রবাসীরা বছরে পনের বিলিয়ন ডলারেরও বেশী বাংলাদেশের বৈদেশিক মূদ্রা তহবিলে প্রেরনকরে তাদেরকে অন্যান্য নাগরীকের মত জান-মালের নিরাপত্তা প্রদানের দায়ীত্ব সরকারের । করোনাভাইরাসকালে যে সমস্তপ্রবাসীকে দেশে ফিরে যাওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় অযথা হয়রানী করা হয়েছে বা অন্যায় ভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জরিমানাকরা হয়েছে সেই সকল সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোর দাবীজানানো যাচ্ছে । অন্যায় ভাবে প্রবাসীদেরকে হয়রানী করার পরেও কোমল মনের অধিকারী প্রবাসীরা পবিত্র রমাদান মাসেকর্মহীন, অসহায়, দূঃস্হ গরীবের সাহায্যে বাংলাদেশের সর্বত্র ত্রাণ বিতরন অব্যাহত রেখেছে । যদিও প্রবাসীদের পাঠানো তহবিলযাদের মাধ্যমে গরীব ও অসহায় মানুষের মাঝে বন্টন করা হয় সে তহবিল থেকেও ঘোলা পানিতে মাছ শিকারীরা যথাযথ ভাবেবন্টন না করার বহু অভিযোগ রয়েছে । একজন সমাজকর্মী হিসাবে এবিষয়ে ও ভবিষ্যতে সুষ্ট ভাবে ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনানিয়ে প্রবাসী সংগঠণ সমূহকে এখনই ভাবার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি ।

প্রবাদে আছে “ কয়লা ধূইলে ময়লা যায় না “ মুক্তি যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও আড়াই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়েঅর্জিত স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশে সুযোগসন্ধ্যীনীরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করেছেন । তাদের অনেকেই ক্ষমতা অপব্যাবহারকরে দেশ পূর্ণগঠনের জন্য প্রাপ্ত বৈদেশীক সাহায্য ও রিলিফ চুরি করে বিত্তশালী হয়েছিলেন । গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানাযায় যে এবারও ত্রাণের পৌনে তিন লাখ টন চাল চুরি হয়েছে যার কোন হদিশ পাওয়া যাচ্ছেনা । এতে আবারো প্রমানীত হলোকয়লা ধূইলে ময়লা যায় না । গম চোর, রিলিফ চোর ও কম্বল চোরদেরকে বঙ্গবন্ধু তিরস্কার করেছিলেন । যারা ঘোলা পানিতেমাছ শিকারে সিদ্দ হস্ত তাদের অনেকেই ৭৫ ও ৮১ সালে নির্মম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে পটপরিবর্তনের সুবিধা ভোগী । ১/১১ এর পটপরিবর্তনের পিছনেও এই সুবিধা ভোগীরাই ছিল মূল হোতা । ওরা শিয়ালের মত ক্ষমতাসীন দল সহ বিভিন্ন দলে ঘাপটি মেরেসুযোগের অপেক্ষায় গর্তে বসে আছে । যদিও ঘোলা পানিতে মাছ শিকারী ঐসকল ষড়যন্ত্রকারী ও সুযোগসন্ধ্যানী অনেকের পতনহয়েছে ফাঁসীর রস্মীতে বা ক্রসফায়ারে । অনেকের স্হান হয়েছে ইতিহাসের নির্মম আস্তাকুড়ে । এখনো এদের ব্বংশবদের হাতেইবাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রন হয় । দেশের তথাকতিথ মালিক জনগণ জেগে না উঠলে ঘোলা পানিতে মাছশিকারীদেরকে প্রতিরোধ করা যাবেনা এবং এদের হাত থেকে দেশ ও জাতি মুক্তি পাবে না । –
এম, এ, আজিজ
সমাজ সেবক ও ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট
লন্ডনঃ ২ জুন ২০২০ ইং

আরও দেখুন

Border force intercept 13 boats carrying 130 migrants across English Channel

Bangla sanglap desk: The Home Office says Border force has intercepted 13 vessels carrying over …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *