গল্প: সুখম দি রিসোর্ট বয়!
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিনঃ
সুখম ভট্টাচার্য ব্যাক ইউনিভার্সিটি ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশুনায় খুব ভালো, কিন্তু শহরের ব্যস্ত জীবনের বাইরে সে তার প্রিয় বান্ধবী তমালিকা চৌধুরীর সঙ্গে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। ঢাকা শহরের প্রায় সব রেস্টুরেন্টে তারা পরিচিত এমনকি ৫ তারকা রেস্টুরেন্টও বাদ যায় না। কর্মচারীরা তাদের মুখ ভুলতে পারে না।
এক দুপুরে বারান্দায় বসে তমালিকা বলল, “উফফ! এত রেস্টুরেন্টে ঘুরেছি, আর কিছুতেই মজা লাগছে না। চলো, কোনো রিসোর্ট যাই।”
সুখম একটু চিন্তিত হয়ে বলল, “ঢাকার রিসোর্টগুলোতে অনেক ঝামেলা হয়, তুমি জানোই।”
তমালিকা উল্টো দিকে তাকিয়ে হাসল, “আমি সত্যিই যেতে চাই। শুধু একটু নরম জায়গা, ভালো সময় কাটাতে।”
সুখম চোখে হাসি নিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তবে আমাকে সময় দাও খুঁজে দেখার জন্য।”
তমালিকা খুশি হয়ে বলল, “তুমি খুঁজে দেখো, আমার কিউট সোনা!”
রাতে সুখম তার স্মার্টফোনে সার্চ শুরু করল। বিভিন্ন রিসোর্টের ছবি আর রিভিউ দেখার পর একটি রিসোর্ট চোখে পড়ল—“লিমন রিসোর্ট এন্ড ইন।” রিসোর্টটি সুন্দর, সুইমিং পুল, রেস্টুরেন্ট, আর হালকা পরিবেশে সাজানো। সুখম নিশ্চিত মনে করল, তমালিকা এটি পছন্দ করবে।
পরের দিন দুপুরে ইউনিভার্সিটিতে সুখম তমালিকাকে বারান্দায় নিয়ে গেল।
“আমি একটি রিসোর্ট পেয়েছি। দেখতে সুন্দর, দামও ঠিক আছে।”
তমালিকা খুশি হয়ে বলল, “যাক, অবশেষে আমরা রিসোর্ট যাই।”
“সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হলে সোমবার সকালে যাই। সারাদিন থাকবে, মঙ্গলবার ফিরে আসব।” সুখম জানাল।
“ঠিক আছে,” তমালিকা সম্মতি জানাল, চোখে উজ্জ্বলতা।
সোমবার সকালে সুখম ও তমালিকা সব প্রস্তুতি নিয়ে রিসোর্টে পৌঁছাল। প্রবেশ মুখে বড় নিয়ন লাইটে লেখা নাম—“লিমন রিসোর্ট এন্ড ইন।” সাজসজ্জা ও ল্যান্ডস্কেপ দেখে তাদের চোখে আনন্দের ঝিলিক। ফ্রন্ট ডেস্কে প্রথমে কেউ ছিল না। হঠাৎ লামিয়া ইসলাম নামে একটি সুন্দরী কন্যা ফ্রন্ট ডেস্ক নিচ থেকে উপরের দিকে উঠলো। দেখে তারা ভয় পাইলো। পরে কোনোরকম তারা নিজেরা সামাল দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কোনো রুম আছে কিনা?” রুমটি ডাবল বেডের—শোনামাত্রই সুখম ও তমালিকা লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
এসময় রিসোর্টের লবিতে ঢুকল কয়েকজন তরুণ—একজনের গলায় ক্যামেরা, অন্যজনের হাতে ট্রাইপড। তারা জানতে চাইল, “সেলিব্রেটিরা আসেন কি?”
লামিয়া উত্তর দিল, “অনেকেই আসে, গত সপ্তাহে বাপ্পি চৌধুরী এসেছিলেন শুটিংয়ে।”
তমালিকা চোখ বড় করে বলল, “সত্যি! ওকে তো আমি খুব পছন্দ করি।”
হঠাৎ সৌরভ চৌধুরী, চোষা রুস্তম এবং বৈশাখী উপস্থিত হলো। শাওন মজা করে বলল, “বাহ! সুখম ভট্টাচার্য! তুমি রিসোর্টে!”
বৈশাখী হেসে বলল, “এ ছেলে তো ইউনিভার্সিটিতে বই নিয়েই ঘুরত, এখন দেখছি তমালিকা নিয়ে রিসোর্টে?”
সুখম বিব্রত হয়ে হালকা হাসল, তমালিকাও লজ্জায় হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল।
লামিয়া চাবি দিল রুম নম্বর ২০৩। রুমটি সুইমিং পুলের পাশে, বড় বেড, আর কাচের জানালায় নরম আলো ঢুকছে। তমালিকা চোখে ঝিলিক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সুখম সেই হাসি দেখে মনে মনে ভাবছে “এই মুহূর্তটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়।” পরে তমালিকা বললো, “চলো সুইমিংপুলে যাই।” সুখম বললো,” আমি তো সাঁতার পারি নাই। আমি কীভাবে পারবো?” পরে তমালিকা জেদে বাধ্য হয়ে সুইমিংপুলে নামলো। পরে তমালিকা একটি সুন্দর সেলফি তুললো এবং পরে ওটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আপলোড করলো,
স্ট্যাটাস লেখা ছিলো,
“আমার সোনা সুখমের প্রথম রিসোর্ট ভ্রমণ।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুবান্ধব ফেসবুক দেখে সবাই আজেবাজে কমেন্ট দেওয়া শুরু করলো।
তার বন্ধু মোস্তফা কমেন্ট করছে, “আরে সুখম! তুই কবে সাঁতার শিখেছিস। ও মেয়ে পালায় পড়লে সবই সম্ভব।”
ইয়াসিন কমেন্ট লিখেছে, “সুখম তো ছক্কা মেরে দিলো রে।” এগুলো সুখম একটু লজ্জা পড়ে গেলো।
রাবেদ কমেন্ট করে বলছে, “তুই আসলে একটি খেলোয়াড়।”
ইউনিভার্সিটি গেলে তার কপাল যে খারাপ এটা বুঝা হয়ে গেছে।
বিকেলে পুলসাইডে সবাই কফি খেল। সৌরভ ও চোষা রুস্তম গিটার ধরল, বৈশাখী ভিডিও করল। হালকা বাতাসে পাতা দুলছে, পানি ঝকঝকে ঝলমল করছে, এবং তমালিকার হেসে ওঠা আনন্দে পুরো জায়গা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
রাতের দিকে বৈশাখী রিসোর্টের ফেসবুক লাইভে গেল, সবাইকে ট্যাগ দিয়ে বলল, “আজকের স্পেশাল গেস্ট আমাদের ইউনিভার্সিটির ‘রিসোর্ট বয়’ সুখম ভট্টাচার্য!”
সুখম লজ্জায় তো মাথা নিচু করে চা খেতে গেলো।
পরদিন সকালে তারা বিদায় নিল। রিসোর্টের সবাই হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাল। লামিয়া বলল, “স্যার, আবার আসবেন। এখন আপনারা আমাদের রিসোর্টের সেলিব্রিটি।”
ঢাকা ফিরে এসেছে কোনো মতে। সেমিস্টারে ব্রেক থাকার কারণে সবাই সোশ্যাল মিডিয়াতে সুখমকে ইচ্ছামতো কমেন্ট করতে থাকছে। সেমিস্টারে ব্রেক পর যেই দিন কলেজ খুলছে সেইদিন সুখম দেখে সবাই হাসি ঠ্যাটা করা শুরু করলো। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মন্তব্য শুরু করলো। পরে কোনো রকম নিজেকে সহ্য করলো। ওইদিকে তমালিকা উপর তেমন কোনো খারাপ মন্তব্য করে নাই। যা মন্তব্য ঝড় সুখমের উপর দিয়ে গেছে। সবাই তাকে এখন “সুখম দি রিসোর্ট বয়” হিসেবে ডাকে। এতে তার জীবনে বড় রকম আপদ নিয়ে এসেছে।
লেখক: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
ইউএমসি ০৭
সেশন: ২০২০-২১
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ।