গার্ডিয়ানে টিউলিপের দেয়া সাক্ষাৎকারের কঠোর সমালোচনা করলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান
ডেস্ক রিপোর্টঃ দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ লেবার এমপি এবং সাবেক ট্রেজারি মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে দায়ের করা দুর্নীতি মামলার বিষয়ে প্রথমবার মুখ খুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, শেখ হাসিনার ভাইঝি হিসেবে তার প্রভাব ব্যবহার করে ঢাকায় জমি অর্জনের অভিযোগ ‘হাস্যকর’। তিনি এখনো অভিযোগের বিস্তারিত বা আনুষ্ঠানিক সমন পাননি, যা তাকে একটি ‘কাফকায়েস্ক দুঃস্বপ্নে’ আটকে রেখেছে।
বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বৃটেনের সাবেক ট্রেজারি মন্ত্রী ও হ্যাম্পস্টেড-হাইগেট আসনের লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। টিউলিপ বলেন, বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আমি তাদের কেউ নই। তার দাবি তিনি রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার এবং বাংলাদেশে চলমান দুর্নীতির মামলার সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ১১ আগস্ট ঢাকার একটি বিশেষ আদালতে টিউলিপসহ আরও ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।বাংলাদেশের পোশাক
টিউলিপের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার পূর্বাচলে মা, ভাই ও বোনের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। যা ‘পুরোপুরি অবাস্তব’ বলে দাবি করেছেন তিনি। টিউলিপ বলেন, আমি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সমন পাইনি। আমাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিদেশে এক প্রহসনের বিচারে বসানো হচ্ছে, অথচ অভিযোগ আসলে কী, তা আমি জানিই না। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনে টিউলিপের অনুপস্থিতিতেই এই মামলার বিচার হবে। যদিও বৃটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, দোষী সাব্যস্ত হলে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় আসতে পারে।
গত বছর জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার টিউলিপকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। অর্থনৈতিক সংস্কার ও সিটি অব লন্ডনের আর্থিক খাত পুনর্মূল্যায়নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন। কিন্তু একই সময়ে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে বাংলাদেশে ১৫ বছর শাসনের পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। শত শত মানুষের মৃত্যু ও স্বৈরাচারী শাসনের অভিযোগে তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে ভারত পালিয়ে যান। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে টিউলিপের নাম ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়।বাংলাদেশের পোশাক
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ‘বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি’ তার জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। অজ্ঞাত কিছু ওয়েবসাইটে খবর প্রকাশ হতে শুরু করে যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের রুশ চুক্তি থেকে তিনি ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন। ২০১৩ সালের একটি ছবিতে হাসিনা, পুতিন ও টিউলিপকে একসঙ্গে দেখা যায়। যা ওই অভিযোগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্দিক বলেন, তিনি তখন মস্কোতে বেড়াতে গিয়েছিলেন, কোনো রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ নেননি।
পৃথক আরেক অভিযোগে বলা হয়, ২০০৪ সালে লন্ডনের কিংস ক্রসে টিউলিপ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একজনের কাছ থেকে একটি ফ্ল্যাট উপহার পেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ফ্ল্যাটটি তার গডফাদারের ছিল, যিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। অতীতে বাবা-মায়ের ভুল স্মৃতির কারণে তিনি সংবাদমাধ্যমকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন যে, তার বাবা-মা ফ্ল্যাটটি কিনে দিয়েছেন। এছাড়া, ক্রিকলউডে নিজস্ব বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন একজন বাংলাদেশি ডেভেলপারের বাসায় থাকছেন- এ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সিদ্দিক জানান, নিরাপত্তাজনিত হুমকির কারণে হঠাৎ স্থানান্তরিত হতে হয় এবং তিনি বাজারদরে ভাড়া দিয়েছেন।
বিতর্ক থামাতে তিনি নিজেই মন্ত্রীসভার আচরণবিধি উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাসের কাছে যান। দুই সপ্তাহের তদন্ত শেষে ম্যাগনাস জানান, সিদ্দিক আচরণবিধি ভঙ্গ করেননি, তবে পারিবারিক সম্পর্ক থেকে আসা ‘সম্ভাব্য ভাবমূর্তির ঝুঁকি’ সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত ছিল। স্টার্মারের সমর্থন সত্ত্বেও টিউলিপ সিদ্দিক মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন, যাতে সরকারের কাজে বিভ্রান্তি না আসে। স্টার্মার তাকে ভবিষ্যতে ফেরার আশ্বাস দেন।নির্বাচিত কলামবাংলাদেশের পোশাক
বাংলাদেশে প্রতিশ্রুত নির্বাচন এখনো হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জন্য আইনজীবীরা সহিংসতা, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। টিউলিপ বৃটেনে সফররত ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে, বৃটেনের অপরাধ দমন সংস্থা শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তির প্রায় ৯ কোটি পাউন্ড মূল্যের লন্ডনের সম্পদ জব্দ করেছে, যার একটি বাড়িতে টিউলিপের মা থাকতেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সত্য কথা হলো, আমি ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও আমার খালার বিরোধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র। বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আমি তাদের কেউ নই।
এদিকে, গার্ডিয়ানে টিউলিপ সিদ্দিকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তার অভিমত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, টিউলিপ সিদ্দিকের দ্য গার্ডিয়ানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ছয়টি উল্লেখযোগ্য বিষয় উঠে এসেছে। সেগুলো হলো:
১. বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব: টিউলিপ বারবার বলছেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা সম্পর্কে তাকে কিছুই জানায়নি। তিনি বলেন, ‘আমি একটি কাফকায়েস্ক দুঃস্বপ্নে আটকে আছি, যেখানে আমাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, কিন্তু আমি জানিই না অভিযোগ কী বা বিচার কী নিয়ে।’ এটি অযৌক্তিক। বাংলাদেশে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি স্থানীয় একজন আইনজীবী নিয়োগ করতে পারতেন, যা তিনি স্পষ্টতই ইচ্ছাকৃতভাবে করেননি। তাই এই অভিযোগের কথা বারবার বলা বন্ধ করা উচিত।
২. তার খালার প্রতি অবস্থান: টিউলিপ বলেন, ‘আমি আমার খালাকে রক্ষা করতে এখানে নেই। আমি জানি তার সরকারের সমাপ্তি নিয়ে তদন্ত চলছে। আমি আশা করি বাংলাদেশের মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পাবে।’ কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এটুকু বলাই কি যথেষ্ট? সিদ্দিক নিশ্চয়ই জানেন যে, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে তার খালা শেখ হাসিনার সরকারকে ২০২৪ সালের জুলাই/আগস্টে শত শত নিরস্ত্র প্রতিবাদকারী ও দর্শকের হত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে এবং তার খালা নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
৩. ফ্ল্যাট উপহারের বিষয়ে অজ্ঞতার দাবি: টিউলিপ বলছেন, ২০০৪ সালে তিনি যখন বিশের কাছাকাছি বয়সে ছিলেন, তখন তাকে একটি ফ্ল্যাট উপহার দেওয়া হয়েছিল, যা সম্পর্কে তিনি জানতেন না। এখন তিনি তার ‘বয়স্ক পিতামাতার’ স্মৃতির ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়, বিশেষ করে তার বোনকেও কয়েক বছর পরে একটি ফ্ল্যাট উপহার দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
৪. বর্তমান বাড়ির মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক: টিউলি দাবি করেন, তিনি যে বাড়িতে থাকেন, তার মালিকের সঙ্গে তার পরিচয় লেবার পার্টির মাধ্যমে হয়েছিল। এটি সত্য হলেও, তিনি নিশ্চয়ই শিগগিরই জানতে পেরেছিলেন যে, ওই ব্যক্তি যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতা। এই বিষয়টি তিনি উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন বলে মনে হয়।
৫. খালার সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক অবস্থান: তিনি বলেন, ‘আমার খালা কে, তা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’ এটি সত্য। কিন্তু তিনি তার খালার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবেন এবং তার খালার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতি কীভাবে সাড়া দেবেন, তা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
৬. ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হওয়ার দাবি: টিউলিপ বলেন তিনি ‘ক্ষতিগ্রস্ত’, কিন্তু তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী নয়। তিনি দাবি করেন, এটি মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার খালার মধ্যে ‘বিরোধের’ কারণে। এটি সঠিক নয়। বর্তমানে যদি কোনো বিরোধ থাকে, তা হলো তার খালা এবং বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে, যে দেশটি বছরের পর বছর স্বৈরাচার থেকে পুনরুদ্ধার করছে এবং ২০২৪ সালের জুলাই/আগস্টে তিন সপ্তাহের মারাত্মক রক্তপাতের ঘটনায় তার খালার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রায় ১০০০ মানুষকে হত্যা করেছে। তবে, যদি এই ‘বিরোধের’ ফলে তাকে নির্বিচারে মামলার মুখোমুখি করা হয়, তা অবশ্যই অন্যায়।