চরিত্র বদলায়নি পুলিশ
মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও পথচারিদের মারধর করছে পুলিশ এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের আইনে পুলিশকে “ইচ্ছানুযায়ী” কাউকে তল্লাশি বা মারধর করার অধিকার দেয় না। সংবিধান জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে এবং ২০১৩ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (প্রতিরোধ) আইন শারীরিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে পুলিশ বল প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদেরকে টার্গেট লাঠিপেটা করছে পুলিশ।পুলিশের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ বা আইন বিরোধী কাজের একাধিক অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশে কখনও এর বিচার হয়না। কারণ ক্ষমতাশীন সরকার বিরোধীদের দমন পীড়নের উদ্দেশ্যে পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। অভিযোগ উঠেছে পুলিশের পোষাক পরিবর্তন করা হলেও চরিত্র বদল হয়নি। গণুভ্যুত্থানের আগের অত্যাচারী চরিত্র এখনও ধারণ করছে পুলিশ। পুলিশের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে গণঅভ্যুত্থানের বিপ্লবি ছাত্রদের প্রতি মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে উঠতে দেখা গেছে এমন অভিযোগ উঠেছে।
১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে, পুলিশের গ্রেপ্তারের জন্য বৈধ কারণ থাকতে হবে। যদিও তারা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (আমলযোগ্য অপরাধ) পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে, তবে তাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫০ ধারায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে “তার পলায়ন রোধ করার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ” প্রয়োগ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (প্রতিরোধ) আইন, ২০১৩, পুলিশের পক্ষে নির্যাতন বা অতিরিক্ত বল প্রয়োগ অবৈধ । সাংবিধানিকভাবে, যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া ব্যক্তিদের জীবন বা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং তাদের গ্রেপ্তারের কারণ জানার অধিকার রয়েছে। এই আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও,বাংলাদেশের পুলিশ তোয়াক্কা করে না। তারা প্রায়শই দায়মুক্তির সাথে কাজ করে, নির্যাতন বা হেফাজতে মৃত্যুর জন্য বিচার করা হয় না।
অভিযোগ উঠেছে উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে। ঢাকার সোহরাওয়াদী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানেরর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিনের উপর হামলা চালায় মাসুদের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা গত দুদিন থেকে উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদকে অপসারনের দাবীতে শাহবাগ থানায় ঘেরাও সহ বিক্ষোভ করে আসছে। এঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে কোন প্রতিক্রিয়া আসেনি।
উল্লেখ্য উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলমের সাম্প্রতিক কর্মকান্ড বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দলনকারিদের উপর বেধরক লাঠিচার্জ, শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে হামলা , পথচারিদের উপর লাঠিচার্জ, সাংবাদিকদের উপরও লাঠিচার্জ উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলমের নেতৃত্বে হয়েছিল। ইতিমধ্যে তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশির্বাদপুষ্টও হয়েছেন। তারেক রহমান মাসুদের কাঁদে হাত রেখে আশির্বাদের ইঙ্গিত করেছিলেন। তার বদৌলতে তিনি ফ্যাসিস্ট আমলের ডিবি হারুনের ভূমিকায় অবতীর্ন হচ্ছেন কি না প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক এবং চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযানে মারধর ও আটকের ঘটনা ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অভিযানের সময় পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে কিনা এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।
ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সময় দুইজন সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পথচারিদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করতেও দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে। অবশ্য পরে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভুক্তভোগী অনেকের দাবি, কোনো ধরনের অবৈধ কিছু না পেয়েও পুলিশ তাদেরকে মারধর করেছে। যদিও পুলিশ বলছে, অভিযান চালানোর সময় কাজে বাঁধা দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মারধরের ঘটনা ‘ভুল বোঝাবুঝির’ কারণে হয়েছে বলেও দাবি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলমের।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক বিরোধী অভিযানের এই ঘটনা ছাড়াও ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় পুলিশের একাধিক অভিযানে তরুণ ও কিশোর বয়সীদের আটকের ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
এসব অভিযানে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে তেমনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে, বিশেষ করে ছিনতাই ও মাদকের ব্যবহার কমাতে এর পক্ষেও কথা বলেছেন কেউ কেউ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের যে অভিযোগ সাধারণ মানুষের রয়েছে সেটি আবারও সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের এমন পদক্ষেপ দরকার হলেও আইনের মধ্যে থেকেই এসব অভিযান পরিচালনা করা উচিৎ বলেও মনে করেন তারা।
এদিকে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও বিভাগীয় শাস্তি হিসেবে ঐ সদস্যকে ক্লোজড বা অপসারন করার চেয়ে বেশি কিছু হয়না। কার্যত পুলিশের বিরুদ্ধে আইন বিরোধী কোন কাজেরই বিচার হয়না।
এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে অভিযানের সময় আইনের ব্যত্যয় ঘটলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।
এই অভিযানের সময় দুইজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিওতে পুলিশের সঙ্গে কয়েকজনকে তর্কে জড়াতে দেখা যায়। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে লাঠিচার্জ করে পুলিশ।
এসময় দুইজনকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যেতেও দেখা যায় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে। যেখানে একজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা গেছে।
ওই ভিডিওতে পুলিশের একজন সদস্য দাবি করেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক বিরোধী অভিযানের সময় জেরার মুখে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেন একজন মাদকসেবী। এই ঘটনায় পুলিশের একজন সদস্য আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্য একটি ভিডিওতে, ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বা ডিসি মাসুদ আলমের সাথে একজনকে তর্কে জড়াতে দেখা যায়।
বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হঠাৎ এক পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে-হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন এবং বাংলানিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন জানান, ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ নামক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করতেই সহকর্মীদের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলেন তিনি।
“আমাদের কাছে অবৈধ কিছু না পেয়েও তর্ক করার অভিযোগ তুলে আমাদের পুলিশ মারধর করে। আমার আরেক বন্ধুকেও তারা পিটিয়েছে,” বলেন মি. উদ্দিন।
এই ঘটনায় আহত তোফায়েল আহমেদ নামে আরেকজন গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেন, পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে পুরো বিষয়টিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করছেন ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ডিএমপি রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম।
তার দাবি, অভিযানের সময় এক মাদকাসক্তের হামলায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় ভুল করে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপরও মারধরের ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানান।
কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধরের বিষয়ে মি. আলম বলেন, অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশির এক পর্যায়ে কয়েকজন তর্কে জড়ান এবং তল্লাশি চালাতে বাঁধা দেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের থামিয়েছেন বলেও দাবি করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
মি. আলম বলেন, “আমাদের দুই তিনজন সদস্য আলোচনার মধ্যে পেছন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করে, এই ঘটনাটা অনাকাঙ্ক্ষিত। যারা এটা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।”
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়াও গত রবিবার ও সোমবার ঢাকার ধানমণ্ডি লেক এবং চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। তাদেরকে মারধর করা, কানে ধরিয়ে উঠবস করানো বা মুচলেকা নিয়ে ছাড়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
এসব ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদকসেবী কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এমন নানা অভিযোগ আনা হয়েছে পুলিশের তরফ থেকে।
পুলিশ বলছে, নির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগের প্রেক্ষিতেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। গভীর রাতে এসব এলাকায় কম বয়সী কিছু কিশোর এবং তরুণ নিয়মিত মাদকের ব্যবহার করছিল বলেও দাবি তাদের।
কিন্তু এভাবে কোনো অভিযান চালাতে গিয়ে মারধর করা বা কানে ধরে উঠবস করানো বা অপমান করার ক্ষমতা পুলিশের আছে কিনা, সামাজিক মাধ্যমে অনেকে সেই প্রশ্ন তুলেছেন।

পুলিশ কতটা শক্তি প্রয়োগ করতে পারে?
পুলিশের বিরুদ্ধে আইনের ব্যত্যয় ঘটানো কিংবা অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ নতুন নয়। জনবান্ধব পুলিশিংয়ের কথা বলা হলেও বাহিনীর অনেকে সদস্যের কর্মকাণ্ডে নানা সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এই বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিআরপিসি, পেনাল কোড, পিআরবি এবং সংবিধান এসব আইনগত কাঠামো পুলিশের কাজের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে পুলিশ কোন পরিস্থিতিতে কি অ্যাকশন নিবে সে সম্পর্কেও বলা আছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলছেন, পুলিশ কী করতে পারবে, কী পারবে না এগুলো আইনগত কাঠামোয় স্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ। বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যথাসম্ভব সীমিত।
এছাড়া পুলিশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশের শক্তি প্রয়োগের যথার্থতা জরুরি।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে জাতিসংঘের বেসিক প্রিনসিপলস বলছে, শক্তির প্রয়োগ হবে ‘অ্যাবসোলুটলি নেসেসারি’ এমন পরিস্থিতিতে। অর্থাৎ যেখানে অন্য কোনো উপায় নেই।
মি. মোরশেদ বলছেন, “পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশের সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিস্থিতি অনেক দিন ধরেই ভালো নয়। মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে ওই এলাকাটি।”
উদ্ভুত পরিস্থিতি পুলিশের ভূমিকাকে বৈধতা দেয় কিনা সেটা দেখা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। পুলিশ কেন আঘাত করেছে সেটি তদন্ত ছাড়া বলা কঠিন, কারণ দুই পক্ষই যার যার মতো করে ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
“অতিরিক্ত কেউ কিছু করলে, পুলিশ হলে তাকেও আইনের আওতায় আসতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মধ্যে আইন ভাঙার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটাও ঠিক নয়,” বলে মনে করেন মি. মোরশেদ।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান এবং টহলের প্রয়োজন রয়েছে তবে এগুলো করতে গিয়ে পুলিশ মারমুখি হচ্ছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক।
তিনি বলছেন, অতীতে পুলিশের অনেকে যেভাবে মারমুখি হয়ে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেন তেমন একটি চেষ্টা অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
“সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছে কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ভিন্ন,” বলেন মি. হক।
প্রশিক্ষিত বাহিনী হিসেবে পুলিশকে যেমন আইন ও বিধানের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে তেমনি পুলিশের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করা কিংবা তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণও গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মনে করেন।
ফ্যাসিস্ট আমলে ছাত্রদের উপর দমন পীড়নের সময় পুলিশ তার ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি মাস্ক পরে আন্দোলনকারিদের উপর হামলা করত। যার ধারাবাহিকতায় পুলিশ এখনও মাস্ক পরে আন্দোলনকারিদের উপর হামলা চালায়। একই সাথে পুলিশের বুকে টানানো নেম প্লেট ঢেকে রাখেন তারা। এক্ষেত্রে হামলাকারি পুলিশকে চিহ্নিত করা যায় না। যেকারণে পুলিশ মাস্ক পরাটাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও পুলিশ অফিসারদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার যাবতীয় পিপিই পরিধান থাকে।
বাংলাদেশে, পুলিশ নাগরিক বা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তল্লাশি করার পদ্ধতি মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি এবং বাংলার পুলিশ প্রবিধান (PRB) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আইন পুলিশকে তল্লাশি চালানোর ক্ষমতা দিলেও, এটি স্পষ্ট পদ্ধতি এবং বিধিনিষেধ আরোপ করে।
তল্লাশি চালানোর ক্ষমতা মূলত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) এবং তার উপরে পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের উপর ন্যস্ত। কনস্টেবলরা স্বাধীনভাবে তল্লাশি চালাতে পারবেন না এবং শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সহায়তা করতে পারবেন। সিআরপিসির ধারা ৯৪ এবং ৯৬ অনুসারে, পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন বা তল্লাশি পরোয়ানা থাকলেই নির্দিষ্ট নথি বা জিনিসপত্র উদ্ধারের জন্য তল্লাশি চালাতে পারে।
ধারা ১০২ এবং ১০৩ আরও বলে যে, স্থানীয় কমপক্ষে দুজন সম্মানিত সাক্ষীর উপস্থিতিতে বাড়ি বা ব্যাগের মতো ঘেরা স্থানগুলিতে তল্লাশি চালানো উচিত। তবে, ধারা ১৬৫ সীমিত ব্যতিক্রম প্রদান করে। যদি কোনও কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন যে পরোয়ানার জন্য অপেক্ষা করার ফলে প্রমাণ নষ্ট বা ধ্বংস হতে পারে, তাহলে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি চালানো যেতে পারে। এই ধরনের ক্ষেত্রে, অফিসারকে কারণগুলি রেকর্ড করতে হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে।ব্যক্তিগত তল্লাশি সংক্রান্ত নিয়ম
ব্যক্তিগত তল্লাশি সিআরপিসির ধারা ৫১ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পুলিশ কেবল তখনই কোনও ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করতে পারে যদি সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে, পুলিশ ব্যক্তির পোশাক ছাড়া অন্য জিনিসপত্র জব্দ করতে পারে। জব্দকৃত জিনিসপত্রের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে হবে এবং ব্যক্তিকে একটি কপি দিতে হবে। ধারা ৫২ মহিলাদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা আরোপ করে।
শুধুমাত্র মহিলা পুলিশ কর্মীরা মহিলাদের তল্লাশি চালাতে পারবেন এবং এই ধরনের তল্লাশি মর্যাদা ও শালীনতার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে করা উচিত। পুরুষ অফিসারদের নারী দেহ তল্লাশি করা নিষিদ্ধ।
তল্লাশির সময় নাগরিকদের প্রকাশ্যে অপমান করা বা হয়রানি করা পুলিশি আচরণবিধির লঙ্ঘন।তল্লাশির সময় নাগরিকদের অধিকার
তল্লাশির সময় নাগরিকদেরও নির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা রয়েছে। ব্যক্তিরা পুলিশ অফিসারদের পরিচয়পত্র দেখাতে অনুরোধ করতে পারেন। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তবে সাদা পোশাকের অফিসাররা আইনিভাবে পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য। নাগরিকরা নিরপেক্ষ বা পরিচিত সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি চালানোর অনুরোধও করতে পারেন। পুলিশ যদি মোবাইল ফোন বা মানিব্যাগের মতো ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করে, তাহলে ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক জব্দ তালিকা বা রসিদ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
মারধর বা নির্যাতন: আইন কী বলে?
বাংলাদেশের কোনও আইনই পুলিশকে সন্দেহভাজন, আটক ব্যক্তি বা গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের উপর আক্রমণ বা শারীরিক নির্যাতনের অধিকার দেয় না। যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে পুলিশ ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে অথবা থানায় নিয়ে যেতে পারে। তবে, শারীরিক আক্রমণ বা প্রকাশ্যে মারধর পুলিশের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (প্রতিরোধ) আইন, ২০১৩, মানবাধিকার রক্ষা এবং নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য তৈরি একটি বিশেষ ফৌজদারি আইন। এই আইনের অধীনে, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন – ভয় দেখানো সহ – শাস্তিযোগ্য। যদি কোনও সরকারি কর্মকর্তার নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হয়, তাহলে শাস্তির মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০০,০০০ টাকা জরিমানা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। যদি ভুক্তভোগী আহত হন, তাহলে শাস্তির মধ্যে কমপক্ষে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উচ্চ আদালতও নির্দেশ দিয়েছে যে গ্রেপ্তার বা আটকের সময় নির্যাতন নিষিদ্ধ। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারায় পুলিশের বল প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুলিশ গ্রেপ্তার করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বল প্রয়োগ করতে পারে, বিশেষ করে যদি কোনও সন্দেহভাজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কোনও ব্যক্তিকে দমন করার পর যে কোনও শক্তি প্রয়োগ অবৈধ।
ধারা ৫৪ পুলিশকে অপরাধে জড়িত থাকার যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে ওয়ারেন্ট ছাড়াই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার অনুমতি দেয়। তবে, গ্রেপ্তারের আগে বা পরে যে কোনও তল্লাশি যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল, ১৯৪৩ পুলিশকে স্বীকারোক্তি বা তথ্য সংগ্রহের জন্য শারীরিক বা মানসিক চাপ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। পুলিশ কেবল তখনই লাঠি বা বল প্রয়োগ করতে পারে যখন জননিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়, যেমন দাঙ্গার সময়।
সাংবিধানিক সুরক্ষা
বাংলাদেশের সংবিধান নির্যাতন এবং অবমাননাকর আচরণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
ধারা ৩৫(৫) স্পষ্টভাবে বলে যে কোনও ব্যক্তিকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক, বা অবমাননাকর শাস্তি বা আচরণের শিকার করা হবে না।