জবি, বেরোবি ও আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল-শিবির-ছাত্রশক্তির ত্রিমুখী সংঘর্ষ; জকসু নেতাসহ আহত অর্ধশতাধিক, হাসপাতালে হামলা
ডেস্ক রিপোর্টঃ দেশের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী छात्रদল, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সহিংস সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, উৎসব-অনুষ্ঠানে বাধা এবং ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে এই ত্রিমুখী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত সকাল ১১:৩০, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ-এর উপস্থিতিতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর একটি অনুষ্ঠান চলছিল। এই সুযোগে জকসু (JnUCSU) প্রতিনিধি, ছাত্রশক্তি এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কিছু মৌলিক দাবি নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ অতিদ্রুত সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরাণীগঞ্জের অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন।
জকসু প্রতিনিধিদের এই প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা দেশীয় অস্ত্র, হকি স্টিক, লোহার রড এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ছাত্রদলের ধাওয়ায় ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা একপর্যায়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হন।
ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়ে আহতরা যখন চিকিৎসার জন্য পুরান ঢাকার জনসন রোডের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান, তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় অতর্কিত হামলা চালায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডের ভেতরে ঢুকে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপর চড়াও হওয়া হয় এবং হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এই দুই দফা হামলায় সাংবাদিকসহ প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতদের মধ্যে রয়েছেন:মো. রিয়াজুল ইসলাম (ভিপি, জকসু)
আলিম আরিফ (জিএস, জকসু এবং জবি শিবির সভাপতি)
মাসুদ রানা (এজিএস, জকসু)
শাহিন মিয়া (সভাপতি, জবি ছাত্রশক্তি)
ফেরদৌস শেখ (সাধারণ সম্পাদক, জবি ছাত্রশক্তি)
ইয়াসিন সাইফ (ছাত্রদল নেতা)
কামরুজ্জামান (অর্থ সম্পাদক, জবি প্রেসক্লাব)
প্রশাসনের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি: জকসু নেতাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রশাসনের সামনে এই হামলা চালানো হলেও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে জবি প্রক্টর অধ্যাপক নাসির উদ্দীন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), রংপুর: ব্যানার বিতর্ক ও ১৪৪
ধারা ঘটনার সূত্রপাত (৩ আগস্ট রাত ৭:৩০): বেরোবির স্বাধীনতা স্মারক মাঠে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে ‘জুলাই এগেইনস্ট অপ্রেশন’ শিরোনামে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রদর্শনীতে ‘জুলাই কিলিং’ এর পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের (যেমন: সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) ছবি দিয়ে সেগুলোকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ (Judicial Killing) হিসেবে উল্লেখ করে একটি বিতর্কিত ব্যানার টাঙানো হয়।সংঘর্ষের বিবরণ: ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এই ব্যানারের তীব্র বিরোধিতা করে তা সরিয়ে ফেলার দাবি জানায়। এই নিয়ে শুরু হওয়া তর্কাতর্কি একপর্যায়ে সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) পর্যন্ত দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল ও চেয়ার ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মাথায় হেলমেট এবং হাতে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়।ক্ষয়ক্ষতি ও আহত: এই সংঘর্ষে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আশিকুর রহমানসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৭ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।বর্তমান পরিস্থিতি: ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাজহাট থানায় ১৪৪ ধারা জারির আবেদন জানিয়েছে। উপাচার্য নির্দেশিত ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে গত ২ আগস্ট ঢাবির শহীদুল্লাহ হলে ছাত্রদল-শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। আজ জবি ও বেরোবির ঘটনার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও (জাবি) ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে থমথমে পরিস্থিতি ও ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা: সিট দখল নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ’
ঘটনার সূত্রপাত (বিকাল ৪:০০): ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এলাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে এবং মাদ্রাসার অভ্যন্তরে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকেই হলের সিট অবৈধভাবে দখল করাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। দুপুরের পর এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিকাল ৪টার দিকে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলের সিট অবৈধভাবে দখলে নেওয়ার প্রতিবাদ করায় ছাত্রদলের কর্মীরা তাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ছাত্রদলের দাবি—ছাত্রশিবির সুনির্দিষ্ট ছক মেনে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে।ক্ষয়ক্ষতি ও বর্তমান পরিস্থিতি: সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। ঘটনার পর মাদ্রাসা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোায়েত করা হয়েছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির এই ত্রিমুখী সংঘাত সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, অবিলম্বে ক্যাম্পাসগুলোকে লেজুড়বৃত্তিক ও সহিংস রাজনীতিমুক্ত করে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।