নতুন মানচিত্রে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন ‘কমানোর’ পক্ষে জাতিসংঘের ভোট
ডেস্ক রিপোর্টঃ জাতিসংঘ বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রটি বদলে এমন একটি মানচিত্র গ্রহণের পক্ষে ভোট দিয়েছে, যাতে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন আগের চেয়ে কম দেখাবে।
শুক্রবার ১৬৪টি দেশ একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর মাধ্যমে ষোড়শ শতাব্দী থেকে ব্যবহৃত ‘মার্কেটর’ (Mercator) মানচিত্রটি বাতিল করে ২০১৮ সালের একটি মডেল গ্রহণ করা হবে।
মার্কেটর মানচিত্রের বিন্যাসে বিষুবরেখা (নিরক্ষরেখা) থেকে কোনো ভূখণ্ড যত দূরে থাকে, সেটিকে তত বড় করে দেখানো হয়। এর ফলে রাশিয়া, কানাডা বা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় আফ্রিকার আয়তনকে অনেক ছোট মনে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। তাদের যুক্তি ছিল, এই পদক্ষেপটি একটি “মতাদর্শিক এজেন্ডা”কে উৎসাহিত করে এবং “আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি বা সুসম্পর্কের মতো প্রকৃত সমস্যা” থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
এই সংস্কারের উদ্যোগটি নিয়েছিল আফ্রিকান ইউনিয়ন। তাদের মতে, মার্কেটর মানচিত্রের এই বিকৃতির কারণে বিশ্ববাসীর কাছে আফ্রিকা মহাদেশটিকে “প্রতীকীভাবে ছোট” করে দেখানো হয়েছে।
আলোচনায় নেতৃত্বদানকারী দেশ টোগো জানিয়েছে, জাতিসংঘের এই ভোটের মাধ্যমে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে মার্কেটর মানচিত্র দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞানগত, শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক, ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে বিশ্ববাসীর সম্মিলিত ধারণায় আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের আয়তন অনেক কম বলে মনে হয়েছে।
যদিও এই প্রস্তাবটি কোনো দেশকে পুরোনো মানচিত্র বর্জন করতে বাধ্য করে না, তবে এটি সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রযুক্তি জায়ান্টদের ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ (Equal Earth) প্রজেকশন বা মানচিত্র মডেলটি ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করে। এই মডেলে দেশগুলোর আয়তন অনেক বেশি নির্ভুলভাবে ফুটে ওঠে।
ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটর ১৫৬৯ সালে তাঁর এই মানচিত্রটি তৈরি করেছিলেন। নাবিকরা যাতে কম্পাসের দিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরলরেখা ধরে পথ চলতে পারেন, সেজন্যই এটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ৫০০ বছর ধরে এটিই বিশ্বব্যাপী মানচিত্রের আদর্শ বা স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কিন্তু পৃথিবীকে উপস্থাপন করার তাঁর এই পদ্ধতির কারণে বিষুবরেখা থেকে দূরে অবস্থিত ভূখণ্ডগুলোকে আকারে অনেক বড় দেখায়।
যেমন—গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার প্রায় সমান আকারের মনে হয়, অথচ ডেনমার্কের অধীনস্থ এই অঞ্চলটি আফ্রিকা মহাদেশের তুলনায় ১৪ গুণ ছোট।
টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি বৃহস্পতিবার বলেন: “মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়।”
“এটি মানুষের ধারণাকে গড়ে তোলে এবং বিশ্বে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও মহাদেশের অবস্থান সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়াকে প্রভাবিত করে। এমনকি স্কুলজীবনের শুরু থেকেই এটি এমন সব চিত্র তুলে ধরতে পারে যা ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।” কোনো কোনো সমালোচক এমনও দাবি করেছেন যে, মারকেটর মানচিত্র বিন্যাসটি ঔপনিবেশিক মানসিকতাকে আরও জোরদার করেছে; কারণ এতে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের আকারকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে এবং এর বিপরীতে আফ্রিকান দেশগুলোর আয়তনকে ছোট করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটির আগে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো এই প্রস্তাবের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। অনেকের মতে, ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলোর আস্থা ও সমর্থন অর্জনের লক্ষ্যেই তিনি এমনটি করেছিলেন।
মিঃ বারো বলেন: “আমরা মারকেটর প্রজেকশন বা মানচিত্র বিন্যাসটি বর্জন করব এবং এর পরিবর্তে এমন সব মানচিত্র ব্যবহার করব যা নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী, ভূপৃষ্ঠের প্রকৃত আয়তনের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মানচিত্র-বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তুত।”