নাইজেল ফারাজ “কোনো নিয়মই ভঙ্গ করেননি”-রবার্ট জেনরিক
ডেস্ক রিপোর্টঃ যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে জালিয়াতির দায়ে দণ্ডিত এক সহযোগীর কাছ থেকে পাওয়া সুবিধা ঘোষণা না করার অভিযোগ ওঠার পর রবার্ট জেনরিক বলেছেন, নাইজেল ফারাজ “কোনো নিয়মই ভঙ্গ করেননি”।
‘দ্য সানডে টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফারাজ নির্বাচিত হওয়ার আগের বছর জর্জ কট্রেল তাঁকে নিরাপত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া কর্মীসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়েছিলেন। পত্রিকাটির আরও দাবি, বাকিংহাম প্যালেসের কাছে কট্রেলের ভাড়া করা একটি বাড়িতে ফারাজ অবস্থান করেছিলেন।
‘রিফর্ম ইউকে’-র অর্থ বিষয়ক মুখপাত্র জেনরিক বিবিসিকে বলেছেন, এমপি হওয়ার আগে “সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে” সহায়তা নেওয়া হয়েছিল বলে ফারাজের পক্ষে তা নিবন্ধন করার প্রয়োজন ছিল না।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা এ বিষয়ে তদন্তের জন্য পার্লামেন্টের মানদণ্ড বিষয়ক কমিশনারের (পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনার) কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
নিবন্ধিত না হওয়া ৫০ লাখ পাউন্ডের এক উপহার বা অনুদান নিয়ে ফারাজ ইতিমধ্যেই পার্লামেন্টের তদন্তের মুখে রয়েছেন।
তাঁর যুক্তি হলো, ওই অর্থ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ছিল এবং তা রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি, কারণ তখন তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
কট্রেলের কাছ থেকে পাওয়া কথিত ‘ইন-কাইন্ড’ বা নগদ-বহির্ভূত সুবিধার বিষয়টি কেন নিবন্ধন করা হয়নি, সে ক্ষেত্রেও তাঁর দল একই যুক্তি দেখিয়েছে।
৩২ বছর বয়সী কট্রেল ফারাজের দীর্ঘদিনের সহযোগী; ২০১৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ‘ওয়্যার ফ্রড’ বা ইলেকট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে জালিয়াতির একটি অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন। ব্রেক্সিট গণভোটের আগে তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ইউকেআইপি (UKIP)-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
‘দ্য সানডে টাইমস’-এর তথ্যমতে, কট্রেল একজন ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোক্তা এবং অফশোর জুয়ার ওয়েবসাইট ‘টেদার ডট বেট’ (Tether.bet)-এর সঙ্গে জড়িত।
বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় জেনরিক কট্রেলকে ফারাজের “পুরানো বন্ধু” হিসেবে অভিহিত করেন।
জেনরিক বলেন: “তিনি (কট্রেল) নাইজেলকে এমপি হওয়ার আগে সহায়তা দিয়েছিলেন; এমপি হওয়ার পর আর তা দেননি।”
“কোনো নিয়মই ভঙ্গ করা হয়নি।”
জেনরিক আরও বলেন, এটি একটি “অনেক পুরনো ঘটনা যা খুঁড়ে বের করা হয়েছে” এবং এর উদ্দেশ্য হলো “নাইজেলকে নিচে নামানো”। তিনি যোগ করেন: “এতে কোনো কাজ হবে না।”
ফারাজ কট্রেলের ভাড়া করা কোনো টাউনহাউসে থেকেছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেনরিক বলেন: “আমার জানা মতে, নাইজেল বলেছেন যে তিনি সেখানে দু-একবার থেকেছিলেন; খুব কম সময়ের জন্য, যা করার অনুমতি রয়েছে।” “নাইজেল ফারাজের বন্ধু থাকার অধিকার রয়েছে; একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বন্ধুর বাড়িতে থাকার অনুমতিও তাঁর আছে। আর অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সেই সময়ে নাইজেল কোনো নির্বাচিত রাজনীতিবিদ ছিলেন না। বরং বলা যায়, তখন তিনি ছিলেন একজন প্রাক্তন রাজনীতিবিদ।”
জেনরিক আরও বলেন, এমপি হওয়ার আগেই ফারাজ কর্মী নিয়োগের খরচ—যার মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত ছিল—সে বিষয়ে কট্রেলের কাছ থেকে “নিঃসন্দেহে” সহায়তা পেয়েছিলেন।
তিনি বলেন: “সংসদ সদস্য হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিগত বন্ধুর কাছ থেকে উপহার, সহায়তা—বা আপনি একে যা-ই বলুন না কেন—তা গ্রহণ করার অনুমতি রয়েছে, যদি তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়ে থাকে।
“সুতরাং, এই ঘটনায় আসলে অস্বাভাবিক বা আপত্তিকর কিছুই নেই।”
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কট্রেলকে আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ডার্ক ওয়েবে মানি লন্ডারার বা অর্থ পাচারকারী সেজে অপরাধীদের প্রতারণা করার চেষ্টার কথা স্বীকার করে ‘ওয়্যার ফ্রড’ (ইলেকট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা)-এর অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
একটি রিপাবলিকান সম্মেলন থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার পথে যখন মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাঁদের আটক করে, তখন ফারাজ তাঁর সঙ্গেই ছিলেন।
ফারাজ ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ‘রিফর্ম’ (Reform) দলের সম্মানসূচক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ৩ জুন তিনি নিশ্চিত করেন যে, তিনি দলের নেতা হিসেবে ফিরে আসছেন এবং সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি ক্ল্যাকটনের এমপি নির্বাচিত হন।
সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, নতুন এমপিদের নির্বাচনের আগের ১২ মাসে প্রাপ্ত আর্থিক স্বার্থ এবং “নিবন্ধনের যোগ্য সুবিধা” (registrable benefits)-র কথা ঘোষণা বা নথিভুক্ত করতে হয়।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উপহার বা সুবিধার ক্ষেত্রে নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই।
এমপি হওয়ার পর, ফারাজ ২০২৪ সালের এপ্রিলে কট্রেলের সৌজন্যে বেলজিয়াম সফরের বিষয়টি (যার মূল্য ছিল ৯,২৫৩ পাউন্ড) নিবন্ধন করেন। পরবর্তীতে তিনি কট্রেলের কাছ থেকে পাওয়া আরও একটি অনুদানের কথা যুক্ত করেন—যা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইটের খরচ বাবদ ১৫,২৭৬ পাউন্ডের সহায়তা।
‘সদস্যদের আর্থিক স্বার্থের রেজিস্টার’-এ কট্রেলের কাছ থেকে পাওয়া অন্য কোনো সহায়তার উল্লেখ নেই।
ফারাজের একজন মুখপাত্র বলেন: “গত সাধারণ নির্বাচনে ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকা লেবার পার্টিকে সমর্থন জানিয়েছিল। তাই তাদের পক্ষে এমন একটি ভিত্তিহীন ও মনগড়া খবর প্রকাশ করা মোটেও আশ্চর্যজনক নয়—বিশেষ করে এমন এক সময়ের ঘটনা নিয়ে খবরটি করা হয়েছে, যখন নাইজেল ফারাজ কোনো নির্বাচিত রাজনীতিবিদ তো দূরের কথা, সক্রিয় রাজনীতিবিদও ছিলেন না।” “প্রতিবেদনটিতে যে ধরনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে তার বিপরীতে সত্য হলো, কোনো সংসদীয় নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়নি।”
একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজনীতিতে ফেরার পর ফারাজের নিরাপত্তা ও কর্মীদের খরচের বিষয়টি ‘রিফর্ম’ (Reform) দল বহন করেছিল।
ওই সূত্রটি আরও জানিয়েছে যে, ফারাজ কট্রেলের (Cottrell) কাছ থেকে কোনো আবাসন সুবিধা নেননি; কারণ ওই এমপি লন্ডনের সেই বাড়িতে থাকেননি।
সংসদীয় মানদণ্ড বিষয়ক কমিশনার ড্যানিয়েল গ্রিনবার্গ বর্তমানে তদন্ত করছেন যে, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ব্রিটিশ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগকারী ক্রিস্টোফার হারবোর্নের কাছ থেকে পাওয়া ৫০ লাখ পাউন্ডের উপহারের ক্ষেত্রে ফারাজ কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেছেন কি না।
ফারাজ জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খরচ মেটানোর জন্যই হারবোর্ন তাঁকে এই অর্থ দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, এই উপহারটি ছিল “সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত” এবং “কোনোভাবেই রাজনৈতিক নয়”।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট (লিব ডেম) এমপি জশ বাবারিন্ডে কমিশনার গ্রিনবার্গের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তিনি কট্রেলের কাছ থেকে ফারাজের সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর “গভীর তদন্ত” করেন।
পাশাপাশি বাবারিন্ডে গ্রিনবার্গের কাছে জানতে চেয়েছেন যে, তিনি কি বিদ্যমান তদন্তেরই অংশ হিসেবে এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবেন, নাকি এটি একটি আলাদা বিষয় হিসেবে তদন্ত করবেন।