নেট-জিরো অর্জনের দৌড়: বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও বিল বাড়ার ঝুঁকি
ডেস্ক রিপোর্টঃ জাতীয় গ্রিড কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রস্তুতকৃত একটি গোপন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ব্রিটেনের ‘নেট জিরো’ (কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার) লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা দেশটিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও উচ্চ বিদ্যুৎ বিলের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
একজন তথ্য ফাঁসকারীর (হুইসেলব্লোয়ার) মাধ্যমে ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকার হাতে আসা এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের দিকে জোর পদক্ষেপ নেওয়ায় ‘ন্যাশনাল এনার্জি সিস্টেম অপারেটর’ (নেসও বা Neso)-এর পক্ষে আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঠিক মডেল তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তথ্য ফাঁসকারী দাবি করেছেন যে, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নেসও বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যত “অন্ধের মতো” কাজ করছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভুল পূর্বাভাসের কারণে গ্রাহকদের ওপর খরচের বোঝা বাড়ছে এবং নিরাপদভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য গ্রিড নেটওয়ার্ককে স্থিতিশীল রাখতে নেসও-র ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কর্নওয়াল ইনসাইট’-কে দিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করিয়েছিল নেসও। গত মাসে তীব্র দাবদাহের (হিটওয়েভ) কয়েক সপ্তাহ আগেই তারা প্রতিবেদনটি সম্পন্ন করে; সেই সময় ব্রিটেন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বলে তথ্য ফাঁসকারী ও বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন।
নেসও-র অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৩ জুন বিদ্যুৎ গ্রিড পাঁচটি পরিচালনগত নিরাপত্তা সীমা অতিক্রম করেছিল এবং সিস্টেমের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও তথ্য ফাঁসকারীর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, পূর্বাভাসের ত্রুটিগুলো এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
ব্রিটেনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেসও-কে প্রতি মুহূর্তে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয় এবং বাজারে ঘাটতি দেখা দিলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হয়।
অতীতে ব্রিটেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারকারী বড় জীবাশ্ম-জ্বালানি চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে নেসও সহজেই পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।
তবে ‘নেট জিরো’ লক্ষ্যমাত্রার কারণে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র (উইন্ড ফার্ম), সোলার প্যানেল এবং ব্যাটারির দ্রুত প্রসার ঘটেছে—যার মধ্যে হাজার হাজার ছোট স্থাপনা রয়েছে যাদের নেসও-র সাথে সরাসরি কোনো যোগাযোগ বা সমন্বয়ের প্রয়োজন হয় না।
এছাড়া ব্রিটেন ইউরোপের সাথে সংযোগকারী সমুদ্রতলদেশের ক্যাবলগুলোর ওপর ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে; এই ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের নোটিশে বিদ্যুৎ আমদানি থেকে রপ্তানিতে (বা এর বিপরীতে) যাওয়া সম্ভব।
কর্নওয়াল ইনসাইট জানিয়েছে, বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি এবং বিদ্যুতের অন্যান্য নতুন উৎসের বিস্তারের ফলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পক্ষে এখন “গ্রেট ব্রিটেন (GB) নেটওয়ার্কে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ও গ্রহণকারী সক্ষমতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে”, যার ফলে সরবরাহ ও চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়া অনেক বেশি জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায় যে, “প্রকৌশলীরা গত দুই বছর ধরে এই বিষয়গুলো তুলে ধরে আসছেন”, কিন্তু তাঁদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করেন না। “নেট জিরো নিয়ে আমাদের কোনো মতামত নেই, আমরা শুধু চাই সিস্টেমটি নিরাপদ থাকুক, কিন্তু নির্বাহীরা রাজনৈতিকভাবে এতটাই ভীত যে তারা বলতে পারছেন না নবায়নযোগ্য শক্তি সিস্টেমটিকে অনিরাপদ করে তুলছে। পরিস্থিতি সপ্তাহান্তে আরও খারাপ হবে কারণ আমরা এমন অনেক কিছু সংযুক্ত করছি যা আমরা মডেল করতে পারি না।”
কর্নওয়াল ইনসাইটের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে এই দশকের শেষে, এর ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ৭.৭ গিগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা মোটামুটি দুটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনের সমান।
এতে বলা হয়েছে: “ভুল মডেলিংয়ের কারণে… সম্ভবত নেসোকে স্বল্প নোটিশে নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট পরিষেবার জন্য বেশি অর্থ প্রদান করতে হবে, যার ফলে গ্রাহকদের খরচ বাড়বে।”
ভুল পূর্বাভাসের কারণে নেসোকে তার “ব্যালান্সিং মেকানিজম”-এর মাধ্যমে স্বল্প নোটিশে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করতে হয়, যার ফলে পাইকারি বাজার থেকে আগে থেকে কেনা বিদ্যুতের চেয়ে খরচ বেশি হয় এবং এই অতিরিক্ত খরচ গ্রাহকদের মাসিক বিলের হিসাবে যুক্ত হয়।