পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এড মিলিব্যান্ডকে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব কী?
ডেস্ক রিপোর্টঃ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এড মিলিব্যান্ডের নিয়োগ আমেরিকার কোনো কোনো অঞ্চলে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোতে এই খবরটি উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম ‘দ্য টাইমস’-কে বলেছেন, “এটি একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত। এড একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক। তিনি বোঝেন যে, আমাদের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো—যার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়ভার—মোকাবিলায় এমন সব দায়িত্বশীল মানুষের প্রয়োজন, যারা সীমানা ছাড়িয়ে কাজ করতে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত।”
নিয়োগের পর দেওয়া প্রথম বিবৃতিতে মিলিব্যান্ড যেসব অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেগুলোর কারণেই ওয়াশিংটন ডিসিতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মহলের সাথে তাঁর সংঘাত অনিবার্য। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং জলবায়ু বিষয়ক কূটনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার ওপর মনোযোগ দিতে চান।
যদিও ৫৬ বছর বয়সী এই লেবার রাজনীতিবিদ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের সম্পর্ককে ‘সুদৃঢ়’ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন, তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে যে তিনি আদৌ সেই কাজটি করার জন্য উপযুক্ত অবস্থানে আছেন কি না। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সব আলাপ-আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, “এতে প্রচুর আলোচনার খোরাক পাওয়া যাবে।”
দশ বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্য যখন তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিচ্ছে, তখন আটলান্টিকের ওপারে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নতুন সরকারের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালে মনে হতে পারে যে বার্নহ্যাম যেন ব্রিটেনের ‘জোহরান মামদানি’; এমনকি ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউ ইয়র্কের গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক মেয়র এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়রের মধ্যে সাদৃশ্যও টানা হচ্ছে।
ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে বার্নহ্যামের ভাষণকে ফক্স নিউজ স্বাগত জানিয়েছিল এই শিরোনামে— “নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে সমাজতন্ত্রের বিস্তার”, এবং সেই সাথে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল “অন্ধকার ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ” পরিস্থিতির।
তবে ট্রাম্প শুরুতে বার্নহ্যামের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও—‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনিই এই পদের জন্য সঠিক ব্যক্তি—পরবর্তীতে ওয়াশিংটন ডিসিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন মিলিব্যান্ড, যাকে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা মিলিব্যান্ডকে—যিনি ২০১৬ সালে ট্রাম্পকে “বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী এবং নিজের দোষ স্বীকার করা যৌন নিপীড়ক” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন—সম্পর্কের ক্ষেত্রে “ঘর্ষণের উৎস” হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর নিয়োগকে বার্নহ্যাম সরকারের জন্য একটি “অশুভ” সূচনা বলে আখ্যায়িত করেছেন। ‘দ্য টাইমস’-এর প্রথম প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, বার্নহ্যামের মন্ত্রিসভায় মিলিব্যান্ডের ‘চ্যান্সেলর’ (অর্থমন্ত্রী) হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা লেবার পার্টির নেতাদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে এটি একটি “ভুল” সিদ্ধান্ত হবে। এর কারণ হিসেবে তাঁরা উত্তর সাগরে নতুন তেল ও গ্যাস উত্তোলনের লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে মিলিব্যান্ডের বিরোধিতার কথা উল্লেখ করেন—যা তাঁদের মতে “মতাদর্শগতভাবে চালিত” এবং এর ফলে এমন সব আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যা দিয়ে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় মেটানো সম্ভব হতো।
যদিও শেষ পর্যন্ত সেই পরিস্থিতি এড়ানো গেছে—এবং জন হিলিকে ‘নম্বর ১১’-এর (অর্থ মন্ত্রণালয়ের) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—তবুও তাঁকে রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিল। আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রীর পরেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তথাকথিত ‘বিশেষ সম্পর্ক’ (special relationship) পরিচালনার ক্ষেত্রে মিলিব্যান্ডকে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে নিয়োগ দিলে তা যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়ারেন স্টিফেনস এর আগে ‘দ্য টাইমস’-কে বলেছিলেন যে, জ্বালানি বিষয়ক দায়িত্বে থাকাকালীন মিলিব্যান্ডের সাথে তাঁর মাত্র একটি বৈঠক হয়েছিল এবং সেটি “খুব একটা ভালো হয়নি”—যার ফলে আর কোনো বৈঠক হয়নি। জ্বালানি সংক্রান্ত বিষয়ে মিলিব্যান্ডের সিদ্ধান্তের সাথে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিরোধও ছিল। তৎকালীন জ্বালানি মন্ত্রী যখন নিউসামের (ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর) সাথে অফশোর উইন্ড বা সমুদ্র-বায়ু বিদ্যুৎসহ পরিচ্ছন্ন-জ্বালানি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন যে “তাঁদের তাঁর (নিউসামের) সাথে কাজ করাটা অনুচিত”। তিনি নিউসামকে (যিনি ২০২৮ সালে ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন) একজন “ব্যর্থ ব্যক্তি” (loser) হিসেবে অভিহিত করে আরও বলেন: “তিনি যা কিছুতেই হাত দিয়েছেন, তা-ই আবর্জনায় পরিণত হয়েছে। তাঁর অঙ্গরাজ্যটি ধ্বংসের পথে এবং পরিবেশ নিয়ে তাঁর কাজগুলো বিপর্যয়কর।”
তবে, ওই দায়িত্বে থাকাকালীন মিলিব্যান্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথেও কাজ করেছেন। জলবায়ু বিষয়ক রাজনীতির কারণে মিলিব্যান্ড মার্কিন প্রশাসনের সাথে মতপার্থক্যের মুখে পড়লেও, তিনি জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইটের সাথে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে—যেমন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তি ও হাইড্রোজেন সংক্রান্ত চুক্তি—একযোগে কাজ করেছেন।
তাই মিলিব্যান্ডের সমর্থকদের যুক্তি হলো, কাগজে-কলমে যাদের সাথে তাঁর মতের মিল নেই, তাদের সাথেও সাধারণ লক্ষ্য বা সমঝোতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তাঁর সফল নজির রয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বে তিনি এমনটা করতে পারেন কি না, তার প্রথম পরীক্ষাটি হবে বুধবার। সেদিন ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিতব্য ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ (আসিয়ান) শীর্ষ সম্মেলনে মিলিব্যান্ড তাঁর মার্কিন সমকক্ষ মার্কো রুবিও-র সাথে বৈঠক করবেন।
এক্ষেত্রে সংঘাতপূর্ণ বা স্পর্শকাতর কিছু বিষয় স্পষ্ট। এর মধ্যে একটি হলো ইরান যুদ্ধ। ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে মার্কিন বোমারু বিমানের জন্য যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন মিলিব্যান্ড। এই সিদ্ধান্তের জেরে ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং স্টারমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এছাড়া, দিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহারের মার্কিন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অবস্থান আরও কঠোর করে তোলে। বর্তমানে ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের সরকারের প্রস্তাবিত চুক্তির বিরোধিতা করছেন। এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান টার্নার ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা “পুনরায় আলোচনায় ফিরে আসে এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানোর বিষয়ে প্রকৃত মনোযোগ দেয়”।