পূর্বাচলে সম্পদের পাহাড় তারিক সিদ্দিকের, ৪৫ প্লট, শত বিঘা জমি!
শরিফ রুবেল, মানবজমিনঃ তারিক আহমেদ সিদ্দিক। আয়নাঘরের কারিগর। অসংখ্য গুম-খুন, ক্রসফায়ারের সেনাপতি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা। জনশ্রুতি আছে গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার পরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাবেক এ মেজর জেনারেল। দেশের সমরাস্ত্র, ব্যাংক বীমা, পোশাক শিল্প, আবাসন, এভিয়েশন, শেয়ারবাজার, জ্বালানি, সামরিক বাহিনীর বদলি-পদোন্নতি, শিল্প ও বাণিজ্য খাতে তারিক সিদ্দিকের ছিল একক অধিপত্য। এসব খাত সংশ্লিষ্টদের জিম্মি করে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন তিনি। স্ত্রী-সন্তানদের নামেও দেশে-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। ব্যবসায়ীদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিল তারিক সিদ্দিক। যখন তখন একে ওকে ডেকে পাঠাতেন। দাবি করে বসতেন শত কোটি টাকা। দেড় যুগে নিজের পদ ব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত বিঘা জমি, শতাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি, বাড়ি, রিসোর্ট, বাংলো বাড়ি, মাছের ঘের, গরুর খামারের মালিক হয়েছেন তারিক সিদ্দিক। সম্পদে শেখ পরিবারের লোকজনকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এক প্রকার বাধাহীনভাবে অঢেল সম্পদ গড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এই জেনারেল। কারণে অকারণে হস্তক্ষেপ করতেন সেনাবাহিনীতেও। মানবজমিন অনুসন্ধানে দেশের একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তার গোপন বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের নানা প্রান্তে তারিক সিদ্দিকের হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে। ঢাকার পূর্বাচলে শত শত বিঘা সম্পদ কিনে রীতিমতো হৈচৈ ফেলেছেন শেখ রেহানার স্বামী শফিক সিদ্দিকের এ ছোট ভাই।
কোন মৌজায় কতো জমি: পূর্বাচলের ৩০০ ফিট মূল সড়ক থেকে ১০০ ফিট সংযোগ সড়কের ইছাপুর বাজার টেম্পার গ্লাস ফ্যাক্টরির পূর্ব পাশে তারিক সিদ্দিকের ৫টি আবাসিক প্লট রয়েছে। এগুলো বাড়িয়াছনি মৌজায় ৫১০৬ খতিয়ানের আরএস ১২৩ নং দাগে ২৫ শতাংশ, ১২৪ নং দাগে ১৩.৯২ শতাংশ, ১২৫ নং দাগে ১২.৬৫ শতাংশ, ১২১ নং দাগে ৯ শতাংশ। একই মৌজায় ৫২০৭ খতিয়ানের ১২৫ নং দাগে ৮.২২ শতাংশ। জমিগুলো তারিক সিদ্দিকের নিজের নামেই রয়েছে। এ ছাড়া রূপগঞ্জ আনন্দ হাউজিং এর পশ্চিম পাশে গোপালেরঠুঠা গ্রামে তার ১৫০ শতাংশের একটি মাছের ঘের রয়েছে। এগুলো রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুতিয়াব মৌজায় ৮৬৪০ নং খতিয়ানের আরএস ২২৩৬ নং দাগে ২৬ শতাংশ, ২৭৩৪নং দাগে ২৪ শতাংশ। একই মৌজায় ৮৫৭২ নং খতিয়ানের আরএস ২২২৪ নং দাগে ২.৭৫ শতাংশ, ২২৩৮ নং দাগে ১২.৩৭ শতাংশ, ২২৪১ নং দাগে ৪.২৫ শতাংশ, ২২২৪ নং দাগে ২ শতাংশ, ২২৪১ নং দাগে ২ শতাংশ। পাশের আরও ৩টি দাগে ৭৭ শতাংশ জমিতে মাছের ঘের করা হয়। ওই ঘেরে এখনো মাছ চাষ হচ্ছে। তবে ৫ই আগস্টের পরে এলাকাবাসী দলবেঁধে এসে অনেক মাছ ধরে নিয়ে যান। এ ছাড়া রূপগঞ্জ দাউদপুর ইউনিয়নের বিরহাটাব গ্রামে আল জামি’আহ আস-সালাফিয়্যাহ মাদ্রাসার পাশে বিরহাটাব মৌজায় ১৯৪ নং খতিয়ানের আরএস ৩৫ নং দাগে ৮.৯০ শতাংশ, ৩৬ নং দাগে ৭৫.৭ শতাংশ, ৩৪ নং দাগে ৪.৫ শতাংশ, ৭৪ নং দাগে ২১ শতাংশ, ৪৭ নং দাগে ১৪.৫৬ শতাংশ জমি রয়েছে তারিক সিদ্দিকের। একই ইউনিয়নের দাউদপুর ভূমি অফিসের আওতাধীন দেবাগ্রাম মৌজার দেবই এলাকায় ৪ দাগে ৯ বিঘা জমি রয়েছে তার। জমিটি ফারুক নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি কিনে দিয়েছেন। একই ইউনিয়নের বাঘপাড়া মৌজার বাঘলা ও রহিলা এলাকায় ৩০০ শতাংশ জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালে এই জমি কেনেন তারিক সিদ্দিক। এ ছাড়া উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের হিরনাল গ্রামে ছায়াবীথি হাউজিং সোসাইটিতে ৯০ শতাংশের ১১টি প্লট রয়েছে তারিক সিদ্দিকের। ওই হাউজিংয়ের মূল সড়ক থেকে একটু ভেতরে ঢুকেই ৩ ইউনিটের বিলাশবহুল একটি ৫ তলা বিল্ডিং করা হয়েছে। ভবনটিতে বর্তমানে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের সদস্যরা ভাড়া থাকেন। তারিক আহমেদ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট রফিকুল ইসলাম মোল্লার মাধ্যমে রূপগঞ্জ ও পূর্বাচলে বেশকিছু জমি কিনেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এই রফিকুলের বাড়ি রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের কালনি গ্রামে। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে আইনজীবী রফিকুল ইসলাম মোল্লাকে ফোন করা হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, তারিক সিদ্দিক একটা জালেম। তার কোনো বুক পিঠ নাই। আমি তাকে সব জমি কিনে দিয়েছি এটা সত্য নয়। তবে আমি তাকে বিঘা পাঁচেক জমি কিনে দিয়েছি। তার পিএস শামসুল আলম তাকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে তিনি আমাকে রূপগঞ্জ এলাকায় জমি কিনে দিতে চাপ দেন। কিন্তু আমি তখন রাজি হইনি। ২০১৮ সালে একদিন রাতে আমাকে র্যাব দিয়ে তুলে নেয়া হয়। ১০ দিন আমাকে আয়নাঘরে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করান। পরে জীবন বাঁচাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে জমি কিনে দিতে হয়েছে। সে আমার একটি জমি দলিল করে নিয়ে আমাকে টাকা দেয়নি। আসলে ও একটা মুনাফেক। তারিক সিদ্দিকের একটি পালিত ছেলে আছে। নাম মেজর শরিফ। শরিফ নিজে এসে জমি কিনতো। ওই শরিফের নামে রূপগঞ্জে শত শত প্লট কিনেছে তারিক সিদ্দিক। শরিফের নামে জমি নাই রূপগঞ্জে এমন কোনো মৌজা পাওয়া যাবে না। পিএস শামসুলের নামেও অনেক জমি কিনেছে। জমি কেনা ওর নেশা ছিল। সে কম দামে জমি কিনে বসুন্ধরার কাছে চড়া দামে বিপুল পরিমাণ জমি বিক্রি করেছে। বিভিন্ন জনের নামে শত শত বিঘা জমি কিনেছে। জমি কিনেই হাউজিং কোম্পানিগুলোকে ধরে এনে জোর করে চড়া দামে জমি বিক্রি করে দিতেন। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে কখনোই তারিক সিদ্দিকের ভালো সম্পর্ক ছিল না। মৃত্যুর ভয়ে তাকে জমি কিনে দিতে হয়েছে। রূপগঞ্জ ঘেঁষা গাজীপুর কালিগঞ্জ উপজেলায় তারিক সিদ্দিকের ১১ বিঘা জমি রয়েছে। জমিগুলো রূপগঞ্জের লোকজন দেখাশোনা করেন। এ ছাড়া পূর্বাচল নিউ টাউনে প্রস্তাবিত কূটনৈতিক জোন ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রোডে তারিক সিদ্দিক ও তার স্ত্রী শাহনাজ সিদ্দিকের ১০ কাঠার দুটি প্লট রয়েছে। তারিক সিদ্দিকের স্ত্রী শাহিন সিদ্দিকের নামে পূর্বাচল কুলিয়াদী মৌজায় ১৮৯৬ নং খতিয়ানের আরএস ৫৩ নং দাগে ১৪.২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রূপগঞ্জ পুটিনা মৌজায় ৪টি দাগে ৭০ শতাংশ জমি রয়েছে। যার হোল্ডিং নম্বর-২৪৪। এ ছাড়া রূপগঞ্জ কামালকাঠি মৌজায় ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে। যার হোল্ডিং নম্বর-৪৯১/১।