প্রফেসর ডক্টর সফিউদ্দিন আহমদ এক সম্মোহক শিক্ষক-শিক্ষাবিদ
আবুল ফতেহ ফাত্তাহ
————————-
তাঁর দেহ-আঙ্গিক,ঝাকড়াচুল, খদ্দরের পাঞ্জাবি, সুতি সাদাপাজামা,পায়ে চপ্পল, অবয়বজুড়ে স্মিত হাসির রেশ আর শ্রেণিকক্ষে পিনপতন নীরবতা-সৃষ্টিকারী এক সম্মোহক শিক্ষক তিনি। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর তাঁর অধ্যয়নের এক-এক অধ্যায়। জীবন ও সাহিত্য পরিপূরক ছায়ায় এগিয়ে চলে। সাহিত্যপাঠে জীবন-অধ্যয়ন পরিশীলিত শিল্পবীক্ষণেরই নামান্তর। আবার বাস্তবের দেউড়িতে দাঁড়িয়ে নিষিক্ত জীবনের আস্বাদন কতোটা শিল্পবোধসম্মত এবং সুতীক্ষ্ণ — এ জিজ্ঞাসা কলাবিদ সমালোকদের অন্বিষ্ট। গণমুখী চেতনা শিল্পবিকাশের পথ ধরে এগোলেও এর একটা নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। আর সেই সক্ষমতার নাম ‘গণচেতনা’। বলছি, সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ-গবেষক এবং আমাদের জীবনে ভরদুপুরে প্রখর সূর্যকিরণ-শিক্ষক সফিউদ্দিন আহমদ(১৯৪১-২০২৬)-স্যারের কথা।
২
১৯৭৮ সালে বাংলা অনার্স ক্লাসে ভর্তি হই মুরারিচাঁদ কলেজে (ওই সময় সিলেট সরকারি কলেজ নামে খ্যাত)। আমাদের স্বপ্নের শিক্ষালয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পূর্ণ আঙিনা। টিলাগড়ের নিবিড়নিসর্গ ভাবুকমনে অন্য এক দ্যোতনার সৃষ্টি করে। টিলার ওপরে দ্বিতল কলাভবনের ধবলসাজ আর কাঠের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার রোমাঞ্চ আমাদের আপ্লুত করত।
ক্যামপাসের পশ্চিম সীমায় অনুচ্চটিলার ওপর অধ্যক্ষ-অফিস এবং শিক্ষকলাউঞ্জ। এর সামনে কিছুটা নিচে ছাত্রীমিলনায়তন। এর পাশ ঘেঁসে কালো পিচকরা রাস্তা তিনদিকে ছুটে গেছে। সিলেট-শিলং সড়কের পাশে কলেজের মূল ফটক। সেই ফটক পেরিয়ে সোজাসুজি যে মনোরম ভবনটি নজর কাড়ে, সেটিই আমাদের কলাভবন। কলাভবনে ওঠার সোপানটি
মনোরম। পুবপাশে বয়েচলা রাস্তা থ্যাকারে ট্যঙ্ক ছুঁয়ে বাঁদিকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি হয়ে ছাত্রমিলনায়তন। এরপর নতুন বিজ্ঞান ভবনগুলো পর্যন্ত এগিয়েছে। অধ্যক্ষবাসভবনটি থ্যাকারে টিলায় এক নির্জনস্থানে অবস্থিত। সেখান থেকে অধ্যক্ষস্যার সোপান পেরিয়ে আবার আরেক সোপান টপকে তাঁর অফিসে যেতেন। আবার তাঁর অফিস থেকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গোটা ক্যামপাস অবলোকতন করতেন। আমাদের সময়ে বাংলাবিভাগ ছিল মূল ফটকে ঢুকে ডান পাশের আসামটাইপ প্রথম ভবন। বাংলা ও অর্থনীতি বিভাগ ছিল ওই ভবনে। অর্থনীতিবিভাগের সামনে
টিনশেড এক উঁচুভবন আমাদের নজর কাড়ত। কিন্তু অনেকটা পরিত্যক্তভবন। জানা যায়, ওই ভবনটি ছিল আস্তাবল অর্থাৎ শিক্ষকদের ঘোড়াশালা। বাহনরূপে ঘোড়া একসময় জনপ্রিয় ছিল বলে শিক্ষকরা ঘোড়া চড়তেন। আমাদের সময়ে বিভাগপ্রধান ছিলেন, প্রফেসর মো. আবুল বশর। উন্নতরুচির আধুনিক মানুষ এবং রবীন্দ্র-অনুরাগী। অন্য শিক্ষকদের মধ্যে আবদুল মজিদ সরকার, মোহাম্মদ খায়রুল আলম,ফজলে রাব্বি খন্দকার, নূরুুল আলম রইসী, আমির আলী চৌধুরী, কবি আফজাল চৌধুরী,সফিউদ্দিন আহমদ, বীরেশ চক্রবর্তী, মোস্তফা আলী, কালাম মাহমুদ, মুকুলিকা সাহা, নিখিলরঞ্জন ভট্টাচার্যপ্রমুখ ধীমান ও সংবেদনশীল শিক্ষক।
৩
খুবসম্ভব ১৯৮০ সালের দিকে আমাদের বিভাগে যোগ দেন এক মনস্বী শিক্ষক — যাঁর চলনে বলনে রাবিন্দ্রীক এক আবহ খেলা করত। তাঁর পাজামা-পাঞ্জাবি ও চপ্পলের সঙ্গে বাঁহাত-বগলে আগলে-রাখা বইগুলোর প্রতি আমাদের নজর অতিশয় প্রগাঢ় ছিল। ‘বৃত্তাবদ্ধ রবীন্দ্রনাথ’, ‘মানুষ ও শিল্পী বিদ্যাসাগর’ প্রভৃতি তাঁর প্রণীত বইগুলোর সঙ্গে একটি সুদৃশ্য ডায়েরি শোভা পেত। তিনি আমাদের সময়ের ডিরোজিও অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ। ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষালয় আনন্দমোহন কলেজ থেকে তিনি বদলি হয়ে আমাদের মুরারিচাঁদ কলেজে আসেন।
সফিউদ্দিনস্যারের বাক-ভঙিমা, সম্মোহন, বিষয়-গভীরে অন্তরদৃষ্টি, পাঠান্তরে পরিক্রমণ-কৌশল শিক্ষার্থীদের আকর্ষণবিন্দু ছিল। মুগ্ধবিস্ময়ে আমরা তাঁর পাঠদানশিল্প অবলোকন করতাম।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ পাঠদানকালে মনে হতো স্যার এক-এক চরিত্ররূপে সংলাপ আওড়াচ্ছেন আর আমরা প্রেক্ষাগৃহে অভিনয়শিল্পীদের নাটকীয় সংলাপ প্রত্যক্ষ করছি। বিশেষত কৃষ্ণকান্তের উইলের বালবিধবা রোহিনীর মর্মন্তুদ সংলাপ : ‘সম্মুখে তৃষ্ণার জল, অথচ, ইহজনমে এই জল পান করিবার অধিকার আমার নাই।…কী অন্যায় করিয়াছিলাম…আমার দেহে রূপ আছে, যৌবন আছে, আমারওতো বাঁচার অধিকার আছে’…ইত্যাদি সংলাপ সফিউদ্দিনস্যারের কণ্ঠে আমি যেন মুগ্ধবশে এখনও শুনতে পাই । রোহিনী চরিত্রের এই জিজ্ঞাসা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কতোটা শিল্পচেতনায় ফুটিয়ে তুলেছেন, সেই জিজ্ঞাসাদীপ্ত অবয়ব আমরা ডক্টর সফিউদ্দিনে আবিষ্কার করতাম। শুধু কি তাই; রোহিনীর মৃত্যুতে শিল্পকলা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে সমালোচকের রক্তচোখ বঙ্কিমচন্দ্রকে আক্রমণ করলেও খুব স্থিতধী উচ্চারণে সফিউদ্দিনস্যার বলতেন, বিষপানে আত্মহত্যা করিয়ে বঙ্কিম তাকে পাঠকচিত্তে চিরকাল বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই হচ্ছে, আমাদের ডিরোজিও-শিক্ষক সফিউদ্দিন আহমদের ওজস্বিতা। তাঁর পাঠদান-কৌশল ও অস্মিতাগুণ।
৪
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পর মুরারিচাঁদ কলেজের শিক্ষকদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও উচ্চতর হয়। কর্মজীবনে সফিউদ্দিনস্যারের সান্নিধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের কিছুস্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই সূত্রে উপাচার্য প্রফেসর মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানস্যারকে সকৃতজ্ঞ স্মরণ করি। তাঁর আহ্বানে আমরা ক’জন সাস্টের বাংলা কোর্সে পাঠদানের সুযোগ পাই। আমার শিক্ষক প্রফেসর মো. আবুল বশর, গোবিন্দগঞ্জ আবদুল হক স্মৃতি কলেজের বাংলার শিক্ষক এম এ তাহেরভাই, মদনমোহন কলেজ থেকে আমি এবং শরদিন্দু ভট্টাচার্য(বর্তমানে সাস্টের বাংলার প্রফেসর।) । এ ছাড়া বৃহৎ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-সংস্থা আয়োজিত অনেক অনুষ্ঠানে স্যারের সঙ্গে যোগদানের দুর্লভ সুযোগ আমার ঘটে। সিলেট শহরকেন্দ্রিক সভাগুলো বিশেষত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, সিলেট সাহিত্য পরিষদ,মদনমোহন কলেজ সাহিত্য-পরিষদ,সিলেট মহিলা পরিষদসহ সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠনে স্যারের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সাস্টে থাকাবস্থায় সফিস্যার ঢাকার গাজিভবনে একটি ফ্ল্যাট কেনার প্রচেষ্টায় ছিলেন। এবং শেষপর্যন্ত স্যার গাজিভবনেই ওঠেন। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী অবস্থায় স্যার মানসিকভাবে বেশ চাঙ্গা ছিলেন। গত তেইশ ফেব্রুয়ারি দুহাজার ছাব্বিশ তিনি প্রয়াত হন। স্যারের অগণন স্মৃতি ধারণ করে আমরা তাঁকে খুঁজে নেব। তাঁর গ্রন্থরাজি পাঠককে দিক অপার সুষমা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উজ্জীবন।
লেখক: ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ
আকাশ-আঙিনা, সিলেট।
অধ্যক্ষ (অব:) সরকারি মদনমোহন কলেজ, সিলেট।
চব্বিশ ফেব্রুয়ারি দু-হাজার ছাব্বিশ