ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে তেল অনুসন্ধান: যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে আর্জেন্টিনা
ডেস্ক রিপোর্ট: ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে তেল অনুসন্ধানের কাজ বন্ধ না করলে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ‘সি লায়ন’ (Sea Lion) তেলক্ষেত্র প্রকল্প—যা ইসরায়েলি ও ব্রিটিশ কোম্পানির একটি যৌথ উদ্যোগ—বাতিল করার জন্য দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দাবি, তাদের কাছে ব্রিটেনের দেওয়া বৈধ লাইসেন্স রয়েছে।
এই মন্তব্য যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দ্বীপপুঞ্জটির মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা এই অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছিল, কিন্তু পরে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করে। আর্জেন্টিনায় এই দ্বীপপুঞ্জটি ‘লাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত।
মিলেই বলেছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে এই সময়সীমা মানা না হলে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনি দলকে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ‘সি লায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের সম্পদের অবৈধ লুটপাট’ হিসেবে এই বিষয়টিকে অভিহিত করেছেন।
তিনি যুক্তরাজ্যকে আরও সতর্ক করে বলেছেন যে, দুই সপ্তাহের মধ্যে ওই অঞ্চলে ‘অবৈধ শোষণ’ বন্ধ না হলে আর্জেন্টিনা বিষয়টি ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অফ দ্য সি’ (সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল)-এর কাছে নিয়ে যাবে।
এই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালটি হামবুর্গ-ভিত্তিক একটি স্বাধীন বিচারিক সংস্থা, যা জাতিসংঘের ‘কনভেনশন অন দ্য ল অফ দ্য সি’ (সমুদ্র আইন বিষয়ক সনদ)-এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মিলেই সংস্থাটির তীব্র সমালোচনা করার পরপরই এই পদক্ষেপটি নেওয়া হলো।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ একটি ‘অকার্যকর সংস্থায়’ পরিণত হয়েছে, যা কেবল ‘সদিচ্ছাসম্পন্ন আমলা সেজে থাকা উদ্ধত পরজীবীদের’ স্বার্থ রক্ষা করে।
এরপর যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং মন্তব্য করেন যে, শক্তি প্রয়োগ করে ফকল্যান্ড দখলের ‘সক্ষমতা আর্জেন্টিনার নেই’।
এর আগে মিলেই ‘সি লায়ন’ তেলক্ষেত্রটিকে একটি ‘সুস্পষ্ট ও তাৎক্ষণিক বিপদ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রায় ১৩০ মাইল (২০৯ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত ‘সি লায়ন’ তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ১.৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দুটি তেল কোম্পানি—ব্রিটেনের ‘রকহপার এক্সপ্লোরেশন’ এবং ইসরায়েলের ‘নাভিটাস পেট্রোলিয়াম’—আগামী দুই বছরের মধ্যে ওই তেলক্ষেত্র থেকে তেল উত্তোলন শুরু করতে যাচ্ছে।
উভয় কোম্পানিই অতীতে জোর দিয়ে বলেছে যে, ‘সি লায়ন’ (Sea Lion) প্রকল্পের জন্য ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাদের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে।
২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে দ্বীপটির বাসিন্দারা বিপুল ভোটে যুক্তরাজ্যের ‘ওভারসিজ টেরিটরি’ বা বিদেশের অধীনস্থ অঞ্চল হিসেবেই থেকে যাওয়ার পক্ষে রায় দেন; সেখানে ৯৯.৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল অনুকূলে এবং মাত্র তিনজন বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
১৯৮২ সালে নিজেদের ভূখণ্ডগত দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আর্জেন্টিনার বাহিনী ফকল্যান্ডে অবতরণ করে। এর ফলে ওই অঞ্চলটি নিয়ে ৭৪ দিনব্যাপী যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করে।
এই সংঘাতের ফলে ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা, তিনজন দ্বীপবাসী এবং ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনাসদস্য প্রাণ হারান।