ফ্রান্সের বর্দো শহর থেকে এখন মাত্র নয় মাইল দূরে দাবানল , সতর্কবার্তা মেয়রের
ডেস্ক রিপোর্টঃ বর্দো শহরের মেয়র জানিয়েছেন যে তিনি “যেকোনো পরিস্থিতির” জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কারণ ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া দাবানলগুলোর মধ্যে একটি এখন দক্ষিণ-পশ্চিমের এই শহরটি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) দূরে অবস্থান করছে।
থমাস কাজনাভ বলেন, “যদি আরও মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে বিপুল সংখ্যক মানুষের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেস জানিয়েছেন, জিরোন্দ (Gironde) অঞ্চলের দমকলকর্মীরা এক “অভূতপূর্ব” পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন; তারা এমন এক আগুনের বিরুদ্ধে লড়ছেন যার আচরণ বা বিস্তার যেন “নিজস্ব গতিতে” চলছে।
ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার এবং স্পেনে ১ লাখেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; স্পেনে মাদ্রিদের পশ্চিমে আগুন “নিয়ন্ত্রণহীনভাবে” ছড়িয়ে পড়ছে।
মঙ্গলবার আরেকটি তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে, যা আগুন নেভানোর প্রচেষ্টাকে আরও ব্যাহত করতে পারে।
বর্দোর দক্ষিণে অবস্থিত সেস্তাস (Cestas) শহরের মেয়র জেরোম স্টেফে বিবিসিকে বলেছেন, এটি হতে যাচ্ছে “শতাব্দীর ভয়াবহতম দাবানল”।
তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে দুই দিন আগে আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সময় তাঁর শহর থেকে ১৭ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৪২ হাজার হেক্টর (১ লাখ ৩ হাজার একর) জমি পুড়ে গেছে এবং ২৪০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আমার শহরে পরিস্থিতি সত্যিই বিপর্যয়কর।”
যদিও আগুনের বিস্তারের গতি এখন কিছুটা কমেছে, তবুও তিনি বলেন যে তাঁর দলগুলো “মাত্র একটি ছোট লড়াইয়ে জিতেছে”। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বাতাসে উড়ে আসা জ্বলন্ত অঙ্গার বা বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “সুরক্ষামূলক ‘ফায়ারব্রেক’ বা অগ্নিনিরোধক ফাঁকা জায়গা তৈরির কাজে আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি।” তবে তিনি স্বীকার করেন, “এই পরিস্থিতির মুখে আমরা সবাই ভীত।”
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সতর্ক করেছেন যে দেশটি “অভূতপূর্ব এক দাবানলের মৌসুমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে”।
সোমবার ‘এক্স’ (X)-এ দেওয়া এক পোস্টে লেকর্নু লেখেন, “জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টর [২ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫২ একর] জমি পুড়ে গেছে এবং ১৩ হাজার ৫৬৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।”
মন্ত্রী জানান, প্রতি ১০টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৯টির পেছনেই রয়েছে মানুষের ভূমিকা এবং এর বেশিরভাগই ঘটে অসতর্কতার কারণে—যেমন সিগারেটের টুকরো ফেলা, বারবিকিউ করা কিংবা যথাযথ সতর্কতা ছাড়া কোনো কাজ করা। তবে তিনি এও বলেছেন যে, “এই সব অগ্নিকাণ্ডই দুর্ঘটনা নয়” এবং “এর মধ্যে কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে”; তিনি আরও জানান যে ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত অন্যান্য দলের প্রতি সংহতি জানাতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বর্তমানে জিরোন্দ (Gironde) অঞ্চলের অগ্নিকাণ্ড-বিধ্বস্ত কিছু এলাকা পরিদর্শন করছেন।
ফ্রান্সের আরও কয়েকটি অঞ্চলেও দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ভার (Var) ও লান্দ (Landes) অঞ্চল এবং কর্সিকা দ্বীপের ওত-কোর্স (Haute-Corse) এলাকা।
এদিকে, রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে ভয়াবহ দাবানলের কারণে প্রতিবেশী দেশ স্পেন সোমবার জাতীয় জরুরি অবস্থার পঞ্চম দিনে পদার্পণ করেছে।
বিবিসি ভেরিফাই (BBC Verify) উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণ করে মাদ্রিদের পশ্চিমে দাবানলের বিস্তৃতি পর্যবেক্ষণ করছে; এই দাবানলে এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২৪ ও ২৬ জুলাইয়ের উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায়, আলমরক্স (Almorox), ভিলা দেল প্রাডো (Villa del Prado) এবং সান মার্তিন দে ভালদেইগলেসিয়াস (San Martín de Valdeiglesias) এলাকার কয়েকটি পৃথক অগ্নিকাণ্ড একত্রিত হয়ে একটি বিশাল দাবানলে পরিণত হওয়ার পর দুই দিনে তা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ছবিগুলোতে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুড়ে যাওয়া এলাকার দ্রুত বিস্তৃতি ফুটে উঠেছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, অঞ্চলটি তার “ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের” মুখোমুখি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ হলো বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ; এখানে বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে তাপমাত্রা বাড়ছে।
এর ফলে গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ইউরোপের পানি সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে এবং দাবানল আরও তীব্র হয়ে উঠছে।