আন্তর্জাতিক

ফ্লাইদুবাই বিমান ছিনতাইকারী ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ ইসরায়েলগামী একটি বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টায় জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহৃত কুঠার (ক্র্যাশ এক্স) ব্যবহারকারী কো-পাইলট যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।

হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে; তিনি ২৯ বছর বয়সী ওমানের নাগরিক হাম্মাম আল-হাম্মামি।

জানা গেছে, তিনি বাকিংহামশায়ারের হাই উইকম্বে অবস্থিত বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটিতে এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট বা বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তিন বছর মেয়াদী দূরশিক্ষণ (ডিস্টেন্স-লার্নিং) কোর্সে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি ২০২৩ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে জানিয়েছে যে, হাম্মামি দূরশিক্ষণ কোর্সটি সম্পন্ন করলেও সেখানে পাইলট হওয়ার কোনো প্রশিক্ষণ নেননি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রসিকিউটর জেনারেল জানিয়েছেন, একটি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের ‘ক্র্যাশ এক্স’ বা জরুরি কুঠারটি ব্যবহার করে ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছারকে আক্রমণ করেছিলেন।

সাধারণত জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ককপিটের ভেতরে এই কুঠার রাখা হয়, যা দিয়ে পাইলটরা বিমানের ভেতরের প্যানেল ভাঙতে বা আটকে যাওয়া জরুরি নির্গমন পথ খুলে ফেলতে পারেন।

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ‘ফ্লাইদুবাই’-এর বিমানটি ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে গিয়েছিল যখন হাম্মামি পাইলটকে আক্রমণ করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অকেজো করার চেষ্টা চালান।

গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও মি. মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন; এর ফলে যাত্রীরা হাম্মামিকে কাবু করতে পারেন এবং বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করানো সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর ৯/১১-এর মতো কোনো হামলার আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

ধস্তাধস্তির পরবর্তী সময়ের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মি. মাচ্ছারের পরনে কোনো শার্ট নেই এবং তিনি রক্তমাখা হাতে বুক চেপে ধরে আছেন; তাঁর মুখে একটি অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। বিমানটি সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করার পর তাঁকে সেখানকার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর তথ্যমতে, উগ্র মতাদর্শ গ্রহণের আশঙ্কায় ওমান কর্তৃপক্ষ এর আগেই হাম্মামিকে বিমান চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।

এবিসি নিউজকে জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৯ বছর বয়সী ওমানের এই নাগরিক ওমান এয়ারে বেশ কয়েক বছর কো-পাইলট প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।

চরমপন্থী বা উগ্রবাদী বিষয়বস্তু নিজের কাছে রাখা এবং উগ্রবাদী ইসলামি ওয়েবসাইটগুলোতে প্রবেশের দায়ে তাঁর ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জাতীয় বিমান সংস্থায় প্রশাসনিক পদে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

সিএনএন-এর দেখা হামলাকারীর পরিচয়ের সাথে মিলে যাওয়া একটি লিঙ্কডইন প্রোফাইল থেকে জানা যায় যে, তিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওমান এয়ারে কর্মরত ছিলেন।

এরপর—বর্তমানে মুছে ফেলা সেই প্রোফাইল অনুযায়ী—হাম্মামি ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রয়্যাল এয়ার মরক্কোতে কাজ করেন; ধারণা করা হয়, এরপরই তিনি ফ্লাইদুবাই-তে যোগ দিয়েছিলেন।

একটি সূত্র ফক্স নিউজকে জানিয়েছে যে, কো-পাইলট হিসেবে নিয়োগের আগে ফ্লাইদুবাই ওমান এয়ারের কাছে তাঁর বিষয়ে কোনো খোঁজখবর নেয়নি।

ওই সূত্রটি—যিনি জানিয়েছেন যে উগ্রবাদী ইসলামি ওয়েবসাইট দেখার কারণে বিমান সংস্থাটি ২০২৪ সালেই হাম্মামিকে বিমান চালনা থেকে বিরত রেখেছিল—দাবি করেন যে এই কো-পাইলট সিরিয়ায় বেশ অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর মা বসবাস করেন।

অতীতে সেখানে তাঁর সম্ভাব্য কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে রয়্যাল এয়ার মরক্কো (RAM) রয়টার্সকে জানায় যে, তিনি ২০২৫ সালে বিমান সংস্থাটির অধীনে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে সেখানে কাজ করার জন্য তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। RAM এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

মন্তব্যের জন্য ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ ওমান এয়ার, ফ্লাইদুবাই এবং রয়্যাল এয়ার মরক্কোর সাথে যোগাযোগ করেছে।

ওমান এয়ারে কর্মরত থাকাকালীন হাম্মামি বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছিলেন বলে জানা গেছে; বিশ্ববিদ্যালয়টি দাবি করে যে, তারাই যুক্তরাজ্যের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা পাইলট হওয়া এবং এয়ারলাইন ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার ওপর ডিগ্রি প্রদান শুরু করেছিল।

প্রতিষ্ঠানটি জানায় যে, এভিয়েশন বা বিমান চলাচল শিল্পের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি এমন একটি কর্মসূচি পরিচালনা করে যেখানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তাদের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের প্রভাষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং পেশাদারদের সাথে যুক্ত করা হয়, যাতে তাঁরা এভিয়েশন সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি পরামর্শ বা ‘মেন্টরিং’ পেতে পারেন।

একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে হাম্মামি ফ্লাইদুবাই-তে আট মাস কাজ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ এবং ওমান ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও—কীভাবে তাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে সংযোগকারী অত্যন্ত সংবেদনশীল রুটে বিমান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর একটি শর্তে বলা হয়েছে যে, ইসরায়েলের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন দেশগুলোর পাইলটরা ইহুদি রাষ্ট্রটিতে (ইসরায়েলে) বিমান নিয়ে যেতে বা সেখান থেকে ফিরে আসতে পারবেন না।


Spread the love

Leave a Reply