মতামত

বাংলাদেশ কি আবারো উল্টো পথে?

Spread the love

দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটানোর প্রত্যয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গনঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়। বাহ্যিকভাবে এটি কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এর পেছনে জমে ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা জুলুম, নির্যাতন, খুন, গুম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও বঞ্চনার ইতিহাস।
এই আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর ছিল না,এটি হয়ে উঠেছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলন। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, কুলি, মজুর, নারী, শিশু থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল পরিবর্তনের দাবিতে। সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল একটাই স্লোগান “স্টেপ ডাউন হাসিনা”।
আন্দোলন দমনে ক্ষমতাসীনদের কঠোর দমন-পীড়ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, রক্তপাত, একের পর এক প্রাণহানি, আহতদের আর্তনাদ এবং নানা ভয়াবহ ঘটনার পরও বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণ পিছু হটেনি। শত বাধা, ভয়ভীতি ও রক্তক্ষয়ের মধ্যেও তারা তাদের দাবি থেকে এক চুলও সরে দাঁড়ায়নি।অবশেষে ৫ আগস্ট আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিন। দীর্ঘ সংগ্রাম, অসংখ্য ত্যাগ ও আত্মদানের বিনিময়ে মানুষ দেখতে পায় বিজয়ের আলো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে আর কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না, কারও অধিকার হরণ করা হবে না, গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হবে না এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো বাধা সৃষ্টি করা হবে না।
আমরা এমন একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যেখানে ন্যায়, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের বাংলাদেশ হবে ঠিক তার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির মতোই নির্মল, স্বচ্ছ ও সুন্দর, যেখানে প্রতিটি মানুষ মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে আশাভঙ্গে পরিণত হতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে ব্যাপক সংস্কারের আশা মানুষ করেছিল, তা যেন ক্রমেই ম্লান হতে থাকে। চারদিকে মব কালচার, জবরদখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় ছিল, এসব ঘটনার সঙ্গে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে যাওয়া।
১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ঢাকাভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অধিকার (Odhikar) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, হাসিনার শাসন শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতায় অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন।এছাড়া আরও ৪০ জনের বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ১৫৩ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ৪৩টি লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবুও মানুষ আশা হারায়নি। কারণ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করেছিল। তারা সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সংলাপ শুরু করে এবং দীর্ঘ আলোচনার পর সবার সম্মতিতে রাষ্ট্র সংস্কারে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়। সনদের কিছু বিষয়ে বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে, সর্বসম্মতিক্রমে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি গণভোটও প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটে পাস হয়। নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালান। একইভাবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদও বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এবং গণভোটে জনগণ সমর্থন দিলে জুলাই সনদের প্রতিটি বিষয় তারা বাস্তবায়ন করবেন।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অবস্থান অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ জুলাই সনদকে জাতির সঙ্গে প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেন। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থেই তারা জুলাই সনদে সম্মতি ও স্বাক্ষর করেছিলেন। এই বক্তব্য সংস্কার প্রত্যাশী মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা ও প্রশ্নের জন্ম দেয়।একটি জাতির সঙ্গে কি এভাবেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা যায়?
বিএনপি ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মতো হলো এই তিন মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে হতাশ হতে হয়। একই সঙ্গে মনে হয়, অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের করুণ পরিণতি দেখেও বিএনপি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি।
এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সারাদেশে নজিরবিহীন দলীয়করণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পথে অন্যতম বড় বাধা। জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনগুলোতে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দলীয়করণের প্রবণতা স্পষ্ট। অতীতে আওয়ামীলীগ যেভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে মেধাবী ও যোগ্য জনশক্তিকে বঞ্চিত করেছিল, বর্তমান সরকার একই ধারার পুনরাবৃত্তি করছে।
অন্যদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্রও উদ্বেগজনক। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের এই কয়েক মাসে ৪৬৪টি হত্যাকাণ্ড এবং ৬৬৬টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত না হলে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কেও সাধারণ মানুষ খুব কমই জানতে পারে।
সম্প্রতি রাজধানীতে ৭ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। একই সপ্তাহে সিলেটে ৪ বছরের শিশু ফাহিমা, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪ বছরের শিশু লামিয়া এবং মুন্সিগঞ্জে ১০ বছরের আরেক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু রামিসার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। অথচ একই সময়ে ঘটে যাওয়া অন্য ঘটনাগুলো তেমন গুরুত্ব পায়নি। এটি আমাদের আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গুরুতর ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। আমাদের দেশেও যদি সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো ইতোমধ্যেই নিজের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতেন।
বর্তমান বিএনপি সরকারের স্বল্প সময়ের শাসনামলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনাগুলো আমাকে বিস্মিত করছে। যে দলটি বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় স্বাধীন মতপ্রকাশের কারণে জেল-জুলুম ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, সেই দলই ক্ষমতায় এসে যেন একই ধরনের চর্চার পুনরাবৃত্তি শুরু করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় গ্রেফতারের ঘটনা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে অন্তত চারজনের তথ্য সামনে এসেছে। তবে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও বেশি। বিষয়টি খুব উদ্বেগজনক এবং এটি বিএনপির ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার লক্ষণ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য ও ইতিবাচক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটার কথা ছিল, তার স্পষ্ট ঘাটতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে চর্চা হচ্ছে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিপক্ষকে হেয় করার রাজনীতি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের টকশোগুলোতে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং সম্মানহানির প্রতিযোগিতা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের স্বপ্ন ছিল, সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নতি, অগ্রগতি এবং গণতান্ত্রিক বিকাশের পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু আজ বাস্তবতা দেখে প্রশ্ন জাগে দেশ কি আবারও সেই পুরোনো কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী পথেই ফিরে যাচ্ছে?সরকার, রাজনৈতিক দল সহ সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক এই কামনা করছি।

লেখক মানবাধিকার কর্মী সেক্রেটারি : জাস্টিস ফর জুলাই ইউকে যুক্তরাজ্য


Spread the love

Leave a Reply