শীর্ষ সংবাদব্রিটেনের সংবাদ

বায়ুদূষণ হ্রাসের ফলে ব্রিটেনে তীব্র তাপপ্রবাহ, গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ নতুন এক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, বায়ুমণ্ডল থেকে দূষণ কমে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার ফলেই ব্রিটেনে তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা ঘটছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮০-র দশক থেকে ইউরোপের তাপমাত্রা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে; প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় মহাদেশটির তাপমাত্রা এখন ২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। যেখানে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

পশ্চিম ইউরোপে তাপমাত্রার এই দ্রুত বৃদ্ধি প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যেমন ধাঁধায় পড়েছেন, তেমনি প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্পেনের গবেষক এবং যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর (মেট অফিস) এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ব্রিটেন ও ইউরোপে অনুভূত অতিরিক্ত তাপের বড় একটি অংশের সাথে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বায়ুমণ্ডলে কণা-জাতীয় দূষক (পার্টিকুলেট) নিঃসরণ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত মন্ট্রিল প্রোটোকল—যার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার—পৃথিবীর ওজোন স্তর রক্ষার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে অ্যারোসল ও কণা-জাতীয় দূষক নিঃসরণ সামগ্রিকভাবে হ্রাস পায়।

বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন, কিছু দূষক কমে যাওয়ার ফলে সূর্যের তাপ আরও বেশি পরিমাণে পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে। পাশাপাশি, এটি বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহের ধরনেও পরিবর্তন আনছে, যার ফলে ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ আবহাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

বার্সেলোনা সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের অধ্যাপক মার্কাস ডোনাট বলেন: “একদিকে, বায়ু পরিষ্কার হওয়ার ফলে সূর্যের আলো আরও বেশি পরিমাণে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে।

“অন্যদিকে, আমাদের ধারণা—এই অতিরিক্ত শক্তি বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় এমন পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, যা পশ্চিম ইউরোপে আরও বেশি তাপ বয়ে আনছে।” অ্যারোসল—বিশেষ করে সালফেট—সূর্যের আলোকে মহাশূন্যে প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে শীতল রাখে। কিন্তু এগুলোর অনুপস্থিতিতে পৃথিবী অধিক তাপ শোষণ করে, বিশেষ করে মেরু অঞ্চলে; এর ফলে মেরু ও বিষুবরেখার মধ্যকার তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যায়।

জেট স্ট্রিম বা বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের তীব্র গতির বায়ুপ্রবাহকে সচল রাখার জন্য মেরু ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের তাপমাত্রার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।

জেট স্ট্রিম—যা আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে—পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় এবং পৃথিবীর আহ্নিক গতির ফলে সৃষ্ট ‘রসবি ওয়েভ’ (Rossby Waves) বা বিশাল বক্রাকার পথে বিশ্বজুড়ে আবর্তিত হয়।

সাধারণত এই তরঙ্গগুলো ক্রমাগত ওঠানামা বা ঢেউয়ের মতো চলতে থাকে; কিন্তু বাতাসে সালফেটের ঘাটতির কারণে তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ায় এগুলো প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে আবহাওয়ার ধরন এক জায়গায় আটকে যাচ্ছে এবং ইউরোপ তীব্র তাপপ্রবাহের বলয় বা ‘হিট ডোম’-এর কবলে পড়ে অত্যধিক তাপমাত্রার শিকার হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বছরের তাপপ্রবাহের পেছনে এই ঘটনাটি ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ২০০৩, ২০০৬, ২০১৫, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের ইউরোপের প্রচণ্ড গরমের জন্যও এটি দায়ী ছিল—যে সময়গুলোতে হাজার হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু এবং ব্যাপক কৃষি-ক্ষতি হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, যদিও সালফেট কমানোর ফলে ইউরোপে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়েছে, তবুও যদি সালফেট নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা না হতো, তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সামগ্রিক প্রভাব আরও ভয়াবহ হতো।

গত মাসে ব্রিটেনে জুনের তাপমাত্রার রেকর্ড তিনবার ভেঙেছে। ২৬ জুন সাফোকের স্যান্টন ডাউনহ্যামে তাপমাত্রা ৩৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ২৪ ও ২৫ জুনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।

বার্সেলোনা সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের পেদ্রো রোলদান-গোমেজ বলেন: “এখন যেহেতু ইউরোপের আকাশ থেকে সালফেট সরে যাচ্ছে, আমরা কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পূর্ণ প্রভাব দেখতে পাচ্ছি।”

“১৯৮০ সাল থেকে উত্তর গোলার্ধের ক্রান্তীয়-বহির্ভূত (extratropical) অঞ্চলগুলোর গড় তাপমাত্রার তুলনায় ইউরোপ প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হয়েছে।”

“ইউরোপে অতিরিক্ত উষ্ণায়নের এই ঘটনার বড় একটি অংশকে বাতাসে কণা বা অ্যারোসল নিঃসরণ হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত করা যেতে পারে।”

“ইউরোপের ওপর ‘কোয়াসি-স্টেশনারি’ বা প্রায়-স্থির রসবি ওয়েভের বৃদ্ধিই মূলত এই গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহের কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।” গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদিও বর্তমান জলবায়ু মডেলগুলোতে জেট স্ট্রিমের পরিবর্তনকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, তবুও সেগুলোতে বিষয়টি ভুলভাবে নিরূপণ করা হয়েছিল; কারণ এতে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে এর ফলে ইউরোপে তাপের মাত্রা ৪ শতাংশ হ্রাস পাবে। অথচ বাস্তবে, বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত তাপের পরিমাণ ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।


Spread the love

Leave a Reply