বিবিসি এক বছরে পাঁচ লাখ টিভি লাইসেন্স ফি প্রদানকারীকে হারিয়েছে
ডেস্ক রিপোর্টঃ বিবিসিতে নানা কেলেঙ্কারির ঘটনায় গত এক বছরে লাইসেন্স ফি প্রদানকারীর সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি কমেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে ২ কোটি ৩৩ লাখ (২৩.৩ মিলিয়ন) টিভি লাইসেন্স কেনা হয়েছে, যা আগের ১২ মাসের তুলনায় ৫ লাখ ৩৯ হাজার কম।
বিবিসিকে কেন্দ্র করে একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনার পরই এই সংখ্যা হ্রাসের বিষয়টি সামনে এল।
গত অক্টোবরে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ প্রকাশ করে যে, ‘প্যানোরামা’ অনুষ্ঠানের একটি পর্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছিল। এতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ২০২১ সালে ক্যাপিটল ভবনে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর সমর্থকদের উসকানি দিয়েছিলেন।
‘গাজা: হাউ টু সারভাইভ আ ওয়ারজোন’ (Gaza: How To Survive A Warzone) নামক তথ্যচিত্রটি নিয়ে বিবিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, এতে নির্ভুলতা বিষয়ক সম্পাদকীয় নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছিল। কারণ, তথ্যচিত্রটিতে শিশু বর্ণনাকারীর বাবা হামাস-পরিচালিত সরকারের কোন পদে ছিলেন, সেই তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এসব কেলেঙ্কারির জেরে মহাপরিচালক টিম ডেভি এবং বিবিসি নিউজের প্রধান নির্বাহী ডেবোরা টার্নেস পদত্যাগ করেন।
কোভিড মহামারির সময় লাইসেন্স ফি প্রদানকারীর সংখ্যা ৭ লাখ ৩৮ হাজার কমেছিল; এরপর এবারই সবচেয়ে বড় বার্ষিক হ্রাসের ঘটনা ঘটল। এর অর্থ হলো, ১৯৯৯ সালের পর থেকে বর্তমানে লাইসেন্স ফি প্রদানকারীর সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, লাইসেন্স ফি (প্রতি পরিবার পিছু ১৮০ পাউন্ড) থেকে প্রাপ্ত আয় “সর্বজনীন জনসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য অপর্যাপ্ত”।
বিবিসির নতুন মহাপরিচালক ম্যাট ব্রিটিন বলেছেন, এই সংখ্যা কমে যাওয়াটা কর্পোরেশনটির সামনে থাকা “আর্থিক চ্যালেঞ্জ”-কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে লাইসেন্স ফি-র মূল্য বৃদ্ধির কারণে সর্বশেষ অর্থবছরে বিবিসি এ খাত থেকে ৩৮৮ কোটি (৩.৮৮ বিলিয়ন) পাউন্ড আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড বেশি।
প্রতিবেদনে বিবিসির সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া তারকাদের আয়ের বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে।
এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন স্কট মিলস। ব্যক্তিগত আচরণের অভিযোগে গত এপ্রিলে বরখাস্ত হওয়ার আগে ‘রেডিও ২’-এর ব্রেকফাস্ট শো এবং ইউরোভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য তিনি ৭ লাখ ৪৫ হাজার থেকে ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯৯ পাউন্ড পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া কর্মীদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন বিবিসি রেডিও ১-এর ডিজে গ্রেগ জেমস, যার আয় ৪,৪০,০০০ থেকে ৪,৪৪,৯৯৯ পাউন্ডের মধ্যে; এরপরই রয়েছেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের রেডিও উপস্থাপক স্টিফেন নোলান, যার বেতন ৪,২৫,০০০ থেকে ৪,২৯,৯৯৯ পাউন্ডের মধ্যে।
তালিকায় সপ্তম স্থানে আছেন জাস্টিন ওয়েব (বেতন ৩,৭৫,০০০ থেকে ৩,৭৯,৯৯৯ পাউন্ড) এবং অষ্টম স্থানে রয়েছেন নাগা মাঞ্চেটি (বেতন ৩,৬০,০০০ থেকে ৩,৬৪,৯৯৯ পাউন্ড)।
‘কোয়েশ্চেন টাইম’-এর উপস্থাপক ফিওনা ব্রুস নবম স্থানে রয়েছেন (বেতন ৩,৪৫,০০০ থেকে ৩,৪৯,৯৯৯ পাউন্ড) এবং সাংবাদিক সোফি রাওর্থ দশম স্থানে আছেন (বেতন ৩,৪০,০০০ থেকে ৩,৪৪,৯৯৯ পাউন্ড)।
লরা কুন্সবার্গ এখন বিবিসির সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এবং সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত নারী; তাঁর বেতন ৪,০৯,৯৯৯ পাউন্ড পর্যন্ত।
বিবিসি স্পোর্টস-এর সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন অ্যালান শিয়ারার; ফুটবল বিশ্লেষক বা ‘পান্ডিট’ হিসেবে কাজের জন্য তিনি ৩,৯০,০০০ থেকে ৩,৯৪,৯৯৯ পাউন্ড পারিশ্রমিক পান।
বার্ষিক প্রতিবেদনে ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির কারণে বিবিসির যে ক্ষতি হয়েছে, তাও স্বীকার করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে: “খ্যাতির দিক থেকে বিবেচনা করলে, বেশ কিছু আলোচিত ঘটনা বিবিসির নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনগণের ধারণার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”
গত এক বছরে বিবিসি সংবাদ পরিবেশনায় নিরপেক্ষ—এমনটা বিশ্বাস করা মানুষের সংখ্যা কমেছে; পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে বিবিসি নিউজ ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের হার ৭৪ শতাংশ থেকে কমে ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনের ভূমিকায় মিস্টার ব্রিটিন লিখেছেন: “আজকের দিনে বিবিসির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম—দর্শক বা শ্রোতাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম হিসেবে তাদের পাশে থাকা, আমাদের সৃজনশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তি হওয়া এবং আমাদের ঐক্যবদ্ধ রাখার শক্তি হিসেবে কাজ করা—সবক্ষেত্রেই এর গুরুত্ব রয়েছে।
“বিবিসি যখন কোনো ভুল করে তখন তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং সর্বদা পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ও কঠোর পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি আরও যোগ করেন: “আমরা জানি যে লাইসেন্স ফি থেকে আয় কমে যাওয়া, সেই সঙ্গে খরচ বৃদ্ধি এবং একটি কঠিন বাণিজ্যিক পরিস্থিতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা। এ কারণেই অর্থবছর শেষে বিবিসি প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলোর ঘোষণা দিতে শুরু করেছে।
“আমাদের নিজেদেরকেই সততার সাথে প্রশ্ন করতে হবে: আজ যদি আমরা বিবিসিকে নতুন করে গড়ে তুলতাম, তবে আমরা কী করতাম?”