মতামত

বিলেতের ‘নিউ নরমাল’: কেন বারবার হিটওয়েভে পুড়ছে যুক্তরাজ্য, আর কী বলছে বিজ্ঞান?

Spread the love

সাজু আহমদ:

একসময় যুক্তরাজ্যের গ্রীষ্ম মানেই ছিল মৃদু রোদ, হালকা বাতাস আর আরামদায়ক আবহাওয়া। ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলেই সংবাদমাধ্যমে তা বড় খবর হয়ে উঠত। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। এখন প্রায় প্রতি বছরই একাধিক হিটওয়েভ দেখা যাচ্ছে। ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর ব্যতিক্রম নয়; বরং জলবায়ু বিজ্ঞানীরা একে বলছেন “নিউ নরমাল” অর্থাৎ, নতুন বাস্তবতা।

এটি কি কেবল একটি গরমের মৌসুম, নাকি আরও বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।

চলতি গ্রীষ্মেও যুক্তরাজ্যে একের পর এক তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। আবহাওয়া দপ্তর Met Office বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। শুধু যুক্তরাজ্য নয়, একই সময়ে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও চরম তাপদাহের মুখোমুখি হয়েছে। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল ও জার্মানিতে উচ্চ তাপমাত্রা মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবহন ও অর্থনীতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপীয় গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপে তাপদাহ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ক্রমেই নিয়মিত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম গরমের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে এবং দীর্ঘ সময় স্থায়ী হচ্ছে।
‘নিউ নরমাল’ বলতে কী বোঝায়?

“নিউ নরমাল” শব্দটি অনেকেই শুনছেন, কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ কী?

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, কোনো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার ধরন যখন স্থায়ীভাবে বদলে যেতে শুরু করে, তখন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই “নিউ নরমাল” বলা হয়। অর্থাৎ, আগে যেটি ছিল বিরল, সেটিই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়।

একসময় যুক্তরাজ্যে ৩০ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা কয়েক দিনের জন্য দেখা যেত। এখন ৩০–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে এবং তাপপ্রবাহও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তন কেবল আবহাওয়ার ওঠানামা নয়; এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কেন বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা?

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে স্বাভাবিকভাবেই কিছু গ্রিনহাউস গ্যাস রয়েছে, যা সূর্যের তাপ ধরে রেখে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখে। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর থেকে কয়লা, তেল ও গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাত থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে।

এই অতিরিক্ত গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমে পৃথিবীর আরও বেশি তাপ আটকে রাখছে। ফলাফল—পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে, সমুদ্র উষ্ণ হচ্ছে, হিমবাহ গলছে এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে।

জাতিসংঘের Intergovernmental Panel on Climate Change (IPCC) বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছে যে মানুষের কর্মকাণ্ডই বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। বিশ্বের হাজার হাজার বিজ্ঞানীর গবেষণার ভিত্তিতে প্রকাশিত তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে দৃশ্যমান।
যুক্তরাজ্য কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে?

অনেকেই মনে করেন, “যুক্তরাজ্যে তো সবসময়ই আবহাওয়া পরিবর্তনশীল।” কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন শুধু আবহাওয়ার স্বাভাবিক ওঠানামা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও বদলে যাচ্ছে।

২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এটি শুধু একটি রেকর্ড ছিল না; এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা। এরপর থেকে প্রায় প্রতি গ্রীষ্মেই তাপপ্রবাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

Met Office-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া যুক্তরাজ্যে এমন চরম তাপমাত্রার সম্ভাবনা অনেক কম ছিল। অর্থাৎ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এই ধরনের ঘটনার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?

অতিরিক্ত গরম সবার জন্য সমান নয়।

চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন—

* প্রবীণ মানুষ
* পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু
* হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তি
* দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ রোগী
* গর্ভবতী নারী
* বাইরে দীর্ঘ সময় কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ

উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে, হিট এক্সহস্টশন বা হিটস্ট্রোক হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
লন্ডনের জন্য কেন বাড়ছে উদ্বেগ?

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, লন্ডনের মতো বড় শহরে “আরবান হিট আইল্যান্ড” বা নগর তাপদ্বীপের প্রভাবও রয়েছে। কংক্রিটের ভবন, পিচঢালা রাস্তা এবং ঘনবসতি দিনের বেলা প্রচুর তাপ শোষণ করে এবং রাতে ধীরে ধীরে সেই তাপ ছেড়ে দেয়। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি থাকতে পারে।

লন্ডনের জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নে দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে শহরের বহু আবাসিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল এবং কেয়ার হোম ভবিষ্যতে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ২০২২ সালের তাপপ্রবাহের সময় পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়েছিল।

শুধু স্বাস্থ্য নয়, অর্থনীতিও ঝুঁকিতে

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সীমাবদ্ধ থাকে না। অতিরিক্ত গরমের কারণে কর্মঘণ্টা কমে যায়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায় এবং পরিবহন ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারে।

রেললাইন অতিরিক্ত গরমে প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, সড়কের পিচ নরম হয়ে যেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে ট্রেনের গতি কমাতে হয়। অতীতে যুক্তরাজ্যে চরম তাপপ্রবাহের সময় যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।

এসব ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—যুক্তরাজ্যের অনেক অবকাঠামো এমন আবহাওয়ার জন্য নির্মিত হয়নি, যা এখন ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

সামনে কী?

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেবে যুক্তরাজ্য? সরকার কী করতে পারে? সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী? আর বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলো কেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে?

কীভাবে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এবং কেন বিজ্ঞানীরা একে “নিউ নরমাল” বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী কে? সমাধানই বা কী?
কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় উৎস কোথায়?

অনেকেই মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বড় বড় শিল্পকারখানাই দায়ী। বাস্তবতা আরও জটিল।

যুক্তরাজ্য সরকারের সর্বশেষ নির্গমন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটির সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী খাত হলো পরিবহন। ব্যক্তিগত গাড়ি, ভ্যান, ট্রাক এবং অন্যান্য সড়ক পরিবহন মিলিয়ে মোট নির্গমনের সবচেয়ে বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। ভবন—বিশেষ করে ঘরবাড়ি ও অফিস গরম রাখার জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি—দ্বিতীয় বড় উৎসগুলোর একটি। এরপর রয়েছে কৃষি, শিল্প এবং অন্যান্য খাত। একই সঙ্গে গত তিন দশকে যুক্তরাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ১৯৯০ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমাতে সক্ষম হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, সবচেয়ে কঠিন কাজটি এখনো বাকি। কারণ বিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতি হলেও পরিবহন, ভবন ও কৃষি খাতে নির্গমন কমানোর গতি এখনও যথেষ্ট নয়।
শুধু মানুষকে দোষ দিলে হবে না

আজকাল প্রায়ই শোনা যায়—“গাড়ি কম ব্যবহার করুন”, “গণপরিবহন ব্যবহার করুন”, “কার্বন কমান”।

কিন্তু বাস্তব প্রশ্নও আছে।

যদি একটি পরিবার ট্রেনে যাতায়াতের চেয়ে গাড়ি চালিয়ে কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে তারা কোনটি বেছে নেবে?

জলবায়ু নীতি সফল করতে হলে শুধু সচেতনতার আহ্বান যথেষ্ট নয়; মানুষকে বাস্তবসম্মত বিকল্পও দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে চায়, তাহলে বাস ও ট্রেনকে আরও সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং সহজলভ্য করতে হবে। গণপরিবহনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে মানুষ পরিবেশের জন্য নয়, নিজের সুবিধার কারণেও সেটি ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়।
শুধু নিঃসরণ কমানো নয়, মানিয়েও নিতে হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দুটি দিক রয়েছে।

প্রথমটি হলো Mitigation—অর্থাৎ, কার্বন নিঃসরণ কমানো।

দ্বিতীয়টি হলো Adaptation—অর্থাৎ, পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

এই দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্যের স্বাধীন Climate Change Committee (CCC) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার সতর্ক করেছে। তাদের মতে, যুক্তরাজ্যকে এমন একটি জলবায়ুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ, বেশি বৃষ্টিপ্রবণ এবং আরও অনিশ্চিত। হিটওয়েভ এখন আরও দীর্ঘ, আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হচ্ছে।

CCC-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, শুধু কার্বন কমানোর পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়; হাসপাতাল, কেয়ার হোম, স্কুল, রেলপথ, সড়ক, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নতুন ভবনগুলোকে ভবিষ্যতের আবহাওয়ার উপযোগী করাও জরুরি। অন্যথায় অর্থনৈতিক ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।
গাছ লাগানো কি যথেষ্ট?

অনেকেই মনে করেন, কয়েকটি গাছ লাগালেই জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান হয়ে যাবে।

বাস্তবে গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গাছ কার্বন শোষণ করে, শহরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। কিন্তু শুধু গাছ লাগিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থামানো সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন—
* নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ,
* ঘরবাড়ির তাপ নিরোধ (ইনসুলেশন) উন্নত করা,
* শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার,
* বৈদ্যুতিক যানবাহনের অবকাঠামো বাড়ানো,
* শিল্পখাতে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণ,
* এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
অর্থাৎ, এটি একটি সমন্বিত পরিবর্তনের বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য কেন এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশ বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে খুবই সামান্য অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত—এসবের প্রভাব ইতোমধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে পড়ছে।

বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভিবাসন একটি জটিল বাস্তবতা। মানুষ কেবল একটি কারণেই দেশ ছাড়ে না; অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং পারিবারিক কারণও বড় ভূমিকা রাখে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে অভিবাসনের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
সরকার কী করতে পারে?

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সুপারিশগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে।

প্রথমত, গণপরিবহনকে আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণে এমন নকশা ব্যবহার করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত গরমেও মানুষ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, পুরোনো ভবনের শক্তি দক্ষতা বাড়াতে হবে। ভালো ইনসুলেশন শুধু কার্বন কমায় না, মানুষের জ্বালানি বিলও কমাতে সাহায্য করে।

চতুর্থত, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে।

পঞ্চমত, শহরে আরও বেশি গাছ, ছায়া এবং সবুজ এলাকা তৈরি করতে হবে, যাতে তাপদ্বীপ প্রভাব কমে।

সবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সাধারণ মানুষ কী করতে পারে?

প্রতিটি মানুষ একা পৃথিবীকে বদলে দিতে পারবে না। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার কমানো, সম্ভব হলে হাঁটা বা সাইকেল চালানো, ঘরে বিদ্যুতের অপচয় কমানো, খাদ্য অপচয় কমানো, গাছ লাগানো এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার—এসবই দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের পুরো দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায্য নয়। বড় নীতিগত পরিবর্তন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগের নেতৃত্ব সরকার ও শিল্পখাতকেই দিতে হবে।
শেষ কথা

একসময় ব্রিটেনে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল ব্যতিক্রম। আজ ৩৫ ডিগ্রি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও উষ্ণ গ্রীষ্ম, আরও ঘন ঘন হিটওয়েভ এবং আরও বড় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে যুক্তরাজ্য।

জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো গল্প নয়। এটি এখনকার বাস্তবতা।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল প্রতিটি নতুন হিটওয়েভের খবর দেখেই থেমে থাকব, নাকি এই পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি নেব?

কারণ প্রকৃতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে, “নিউ নরমাল” একদিন আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।


Spread the love

Leave a Reply