বিশেষ সম্পাদকীয়: তারুণ্যের বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঐক্য হোক আগামীর পথচলা
সাহসের সাথে ১৫ বছর পার করে গৌরবের ১৬ বছরে পদার্পণ করল বাংলা সংলাপ। এর মধ্যে অনেক বাধা এসেছে, পেরিয়ে গেছি। সাহস হারাইনি, দমেও যাইনি। আপনাদের সমর্থনই আমাদের পাথেয়, আপনাদের ভালোবাসাই আমাদের শক্তি। আজকের এই আনন্দক্ষণ মূহুর্তে আমাদের মিলিয়ন পাঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানাচ্ছি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সংকটকালে যারা আমাদের পাশে থেকে অনুপ্রাণিত করেছেন তাদের প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালবাসা । ১৫ বছর আগে এই দিনে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যতো বাধা আসুক না কেন সকল ভয়কে জয় করে আমরা কমিউনিটি মানুষের পাশে থাকবো। আমরা কথা রেখেছি, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিনি।
প্রিয় পাঠক যুক্তরাজ্যে আমাদের কমিউনিটির মানুষজন একেবারেই যে ভাল আছেন তা নয়, কষ্টে আছেন অনেকেই। ব্রিটেনে অর্থনৈতিক সংকটের ফলে জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি মানুষকে অতীষ্ট করে তুলেছে। যাদের ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন ( আই এল আর) বা ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেই তারা সর্বদা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কখন কোন ইমিগ্রেশন আইন হচ্ছে, এ যেন এক নতুন আতঙ্ক। রাজনৈতিক দলগুলো একের পর এক কঠোর অভিবাসন নীতি ঘোষণা করে যাচ্ছে। যার ফলে বৈধ কিংবা অবৈধ অভিবাসীদের জন্য এদেশে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
আমাদের প্রাণের দেশ বাংলাদেশের মানুষও ভাল নেই। দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান হলেও দেশের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি এখনও। রাষ্টের প্রতিটি যন্ত্র যেনো অকেজো হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি আর দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রের নিম্ন থেকে উচ্চস্তরের প্রতিটা কর্মকর্তা যেন শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীর মধ্যে দেশপ্রেম উঠে গেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পরিবর্তে তারাই যেন রাষ্ট্র ধবংসের কারিঘর হয়ে উঠেছে। জুলাই অভ্যুত্থাণে শেখ হাসিনার প্রতি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অকুন্ঠ সমর্থনের ফলে আমাদের ২,০০০ এরও বেশি ছাত্রজনতা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ২০,০০০ এর অধিক ছাত্রজনতা। আর এসব কিছুই হয়েছে পুলিশ র্যাব সেনাবাহিনীর হাত ধরেই। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশের বন্দুকের গুলি থেকে রক্ষা পায়না পিতার কোলে থাকা ৬ বছরের শিশু পর্যন্ত। কি নির্মম বর্বরতার দৃশ্য সেদিন দেখতে হয়েছিল দেশবাসীকে । আমাদের ছাত্র সমাজের গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সহ তার দোসররা। মুক্তি পায় বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ। আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। সালাম জানাই আহত সংগ্রামীদের, অভিবাদন জানাই কিশোর-তরুণ ছাত্রদের আর বাংলাদেশের কোটি সাহসী মানুষকে। একই সাথে গণ অভ্যুত্থানে হতাযজ্ঞের সাথে জড়িত সকল পুলিশ র্যাব ছাত্রলীগ যুবলীগ ও আলীগ ক্যাডারদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা্র দাবী জানাচ্ছি। সেই সাথে হত্যাকারী স্বৈরাচার হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে জনসম্মুখে ফাঁসি কার্যকরের ব্যবস্থা করা হোক।
প্রিয় পাঠক বাংলা সংলাপ বিগত ১৫ বছর ধরে সু-সাংবাদিকতা অনুশীলনের চেষ্টা করে চলেছে। যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা আমাদের নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে বাংলা সংলাপ দুটি ভাষায় প্রকাশ হয়ে থাকে। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংলিশ ভার্ষণে আমরা চেস্টা করি যুক্তরাজ্য তথা বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া সকল সংবাদ তুলে ধরার । আমাদের সংবাদের ধরণ গতানুগতিক অন্য পত্রিকার মতো না। আমরা বরাবরই আলাদা, আমাদের নিজস্ব স্বতন্ত্রতা দিয়ে সংবাদ সাজিয়ে আপনাদের কাছে তুলে ধরি। বিশেষ করে আমাদের ফ্রন্ট পেজের সংবাদটি সব সময় থাকে আকর্ষনীয়, স্বাভাবিকভাবে আমাদের ফ্রন্ট পেজের সংবাদ পাঠকদের নজর কেড়ে থাকে। আপনাদের ভালবাসা আমাদের সাথে আছেই বলে আমরা চার বার বেস্ট বাইলেংগুয়াল নিউজপেপার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। একটা মেইন্সট্রিম অ্যাওয়ার্ড অর্জন করা চারটিখানি কথা না, এসব কিছু সম্ভব হয়েছে আপনাদের ভালবাসার কারণে, কারন আপনারা আমাদেরকে সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগিয়েছেন ।
দীর্ঘ ১৫ বছরের পথচলায় কখনো কখনো আমাদের ভুলভ্রান্তি হয়েছে, কিন্তু অবিলম্বে সেসব ভুল শুধরে নেওয়া হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, সে কারণেই বাংলা সংলাপ ব্রিটেনে সর্বাধিক প্রচারিত ও আস্থাভাজন একমাত্র সংবাদমাধ্যমের মর্যাদা অর্জন করেছে; বাংলা সংলাপ একমাত্র সংবাদপত্র যা যুক্তরাজ্যের মেইন্সট্রীমের সংবাদ প্রকাশ করে থাকে । আমাদের মূল লক্ষ মেইনস্ট্রীমের সংবাদ প্রকাশ করা, যেসকল সংবাদ আমাদের কমিউনিটি মানুষের পক্ষে জানা দুস্কর হয়ে পরে। বাংলা সংলাপ গতানুগতিক বাশি সংবাদে বিশ্বাস করেনা ,যাহা সোস্যাল মিডিয়ার বদৌলতে পত্রিকায় ছাপা হওয়ার আগেই পাঠকরা জেনে যান । আমরা সব সময় চেস্টা করি যুক্তরাজ্য তথা বিশ্বের তাৎক্ষনিক ঘটে যাওয়া সকল তাজা খবর প্রকাশ করার ।
প্রিয় পাঠক, আমরা দৌঁড়াতে জানি ঘোড়ার বেগে, দ্রুত গতিতে। আমরা কখনও ক্লান্ত হইনা। আমাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম খুবই শক্তিশালী এবং সর্বদা সক্রিয়, বাংলা সংলাপের অনলাইন ভার্ষণ ২৪ ঘন্টা আপডেট থাকে সর্বশেষ তাজা খবর নিয়ে। আমরা সোসিয়াল মিডিয়াতেও সর্বদা সরব রয়েছি, আর ডিজিটাল এই দুনিয়ায় বাংলা সংলাপের অসংখ্য পাঠক রয়েছেন বিশ্বজুড়ে। আমরা দৃঢ়তার সহিত বলতে চাই গোটা ইউরোপ জুড়ে বাংলা ভাষাভাষিদের কাছে বাংলা সংলাপ শক্ত অবস্থান তৈরী করে নিয়েছে । সেই সাথে আমেরিকা,কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে আমাদের অজস্র পাঠক ।
২০১০ সালের ১০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠালগ্নে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাংলা সংলাপ যাত্রা শুরু করে ,কিন্তু আমাদের এই দীর্ঘ পথ নিষ্কণ্টক ছিল না। যেসব চ্যালেঞ্জ সামনে ছিল, সেগুলো এখনো আছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়েছে। তারপরও আমরা হতোদ্যম হইনি। শুরু থেকে মানবতার কল্যাণে বাংলা সংলাপ সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতিতে অটল রয়েছে,এবং থাকবে।
আমরা সব সময় ভাল কাজের সমর্থন জানাই, মন্দ কাজের সমালোচনা করি। সৃজনশীল, উদ্যোগী মানুষদের আরও এগিয়ে নিতেও উৎসাহ যোগাই। আমরা যুক্তরাজ্য বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশে রয়েছি, পাশে থাকব ।
বাংলা সংলাপ পাঠকের হৃদয়ে কড়া নাড়ে প্রতি সপ্তাহে । আমাদের উপস্থাপনা সব সময় ব্যতিক্রমী যে কোন পাঠকের হৃদয়ে নাড়া না দিয়ে পারেনা । সামনে এগিয়ে যাবার পথে অনেক কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয়েছে আমাদের । খুবই ব্যয়বহুল এই যাত্রা পথে প্রতি সপ্তাহে আপনাদের সামনে হাজির হওয়াটা ছিল একটা বিশাল চ্যালেঞ্জের ব্যাপার । শত কষ্ট ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আমরা হাজির হয়েছি আপনাদের সামনে । কারণ কমিউনিটির মানুষের প্রতি আমাদের ভালবাসা ছিল সীমাহীন । আমরা জানি এটা আমাদের আদর্শিক চ্যলেঞ্জ । আমরা এগিয়ে যাবো শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে । ১৫ বছরের দীর্ঘ সুগমের পথে আমাদের লেখনি অনেকের আকাঙ্ক্ষা পুরণ করতে পারিনি । কারণ আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, ভুলত্রুটিও আমাদের হয়। চরম দুঃসময়েও আমরা যখন এগিয়ে যাচ্ছিলাম তখনও বিভিন্ন মহল থেকে চাপের সম্মুখিন হতে হয়েছে ।এমনকি পত্রিকাটির প্রকাশনা বাধা গ্রস্থ করতে আমাদেরকে মামলা হামলা হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে । আমাদেরকে বাধাগ্রস্ত করতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করে। মামলায় ব্যর্থ হয়ে মানিক তার নিজস্ব লোক দিয়ে আমাদের অফিসে সন্ত্রাসী হামলা পর্যন্ত করেছিল। তারপরও আমরা ফ্যাসিস্ট বিচারপতির অন্যায়ের কাছে আপোস করিনি। শামসুদ্দিন মানিকের মতো অনেক বড় বড় লাগব বোয়ালরা বাংলা সংলাপের আগ্রযাত্রা স্তব্ধ করার ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছেন। একমাত্র পাঠকদের ভালবাসার শক্তি ,সততা ও মনোবলের কারনে আমরা এসকল প্রতিকুলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি ।
প্রিয় পাঠক আমরা নীতি ও আদর্শে বিশ্বাসী । কোন অপশক্তির কাছে মাথা নত করার ব্রতি নিয়ে বাংলা সংলাপের জন্ম হয়নি । বাংলা সংলাপ সব সময় আপোসহীন এবং ভয় ভীতির উর্ধে । কারণ সত্য কখনো দূর্বল হতে পারেনা । আমরা বিশ্বাস করি, বাংলা সংলাপের শক্তি আপনারা, আমাদের শ্রদ্ধেয় পাঠকেরা। সব সময় বাংলা সংলাপ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের এক নম্বর কাগজ।
আমরা আমাদের নীতি ও আদর্শ থেকে বিচলিত হইনি । আমাদের কলমের মুখে লাগাম টেনে ধরিনি। এই সাহসের মূলেও কিন্তু আপনারাই—আমাদের বিপুলসংখ্যক পাঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষী যারা আমাদেরকে সব সময় সাহস যোগান। আপনারা সঙ্গে আছেন বলেই আমরা সাহসী, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ, আপসহীন। আপনারা সঙ্গে আছেন বলেই আমরা বিনয়ী। আমাদের চেষ্টা পরিশীলনের, শুদ্ধতার, সুরুচির, সংস্কৃতির। কমিউনিটি মানুষের প্রতি আমাদের যে দায়বোধ, তা থেকে আমরা বিন্দুমাত্র সরে আসিনি, কখনো আসব না।
ছাত্র জনতার অভ্যত্থানে বাংলাদেশ ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়েছে , কিন্তু ফ্যসিস্টের দোসর এখনও রয়ে গেছে। নতুন নতুন ষড়যন্ত্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছে। তাই ফ্যাসিস্টদের দোসরদের মোকাবেলা করতে হলে দরকার রাজনৈতিক ঐক্য, তবেই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে সকল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান এই দেশ আমাদের সকলের। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলি। আর এটাই আমাদের প্রত্যাশা।