কোভিড-১৯

বিশ্বের প্রথম এক ট্রায়ালে সুস্থ মধ্যবয়সীদের আলঝেইমারের ওষুধ দেওয়ার প্রস্তাব

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ স্মৃতিশক্তিজনিত কোনো সমস্যা নেই—এমন মধ্যবয়সীদের আলঝেইমারের ওষুধ দেওয়ার একটি ট্রায়াল বা পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ প্রতিরোধ করা।

ব্রিটেনে সোমবার থেকে অংশগ্রহণকারীদের বাছাই বা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া শুরু হবে। আন্তর্জাতিক এই গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ১৫টিরও বেশি কেন্দ্র অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আলঝেইমার রোগীদের ওপর পরিচালিত প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাত্র তিনটি মাসিক ইনফিউশনের (শিরাপথে ওষুধ প্রয়োগ) মাধ্যমেই এই চিকিৎসা মস্তিষ্কে জমে থাকা ক্ষতিকর ‘প্লাক’ বা প্রোটিনের আস্তরণ দূর করতে পারে। তাই এই চিকিৎসাকে একটি বড় আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এখন বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখবেন, রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই ‘ট্রনটিনেমাব’ (trontinemab) নামের এই ওষুধ প্রয়োগ করে আলঝেইমার রোগটি শুরু হওয়া বা বিকাশ লাভ করা ঠেকানো যায় কি না।

৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং স্মৃতিশক্তিজনিত সমস্যা নেই—এমন ব্যক্তিদের রক্ত ​​পরীক্ষা করা হবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে লক্ষণ প্রকাশের বহু বছর আগেই আলঝেইমারের উপস্থিতি বা এর নির্দেশক (মার্কার) শনাক্ত করা সম্ভব। যাদের শরীরে ‘টাউ’ (tau) নামক প্রোটিনের মাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকবে, তাদের এই ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

‘প্রিভেনট্রন’ (PrevenTron) ট্রায়ালের প্রধান গবেষক অধ্যাপক রামিন নিলফোরুশান বলেন, এই গবেষণাটি একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করছে—অর্থাৎ স্মৃতিশক্তিজনিত সমস্যা দেখা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে বরং শুরুতেই তা প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে বলেন: “কয়েক দশক ধরে আলঝেইমার রোগের গবেষণায় মূলত লক্ষণ প্রকাশের পর চিকিৎসার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। ‘প্রিভেনট্রন’ একটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে—তা হলো, লক্ষণ শুরুর আগেই আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি কি না।”

‘মস্তিষ্কের জন্য স্ট্যাটিন’

ইউরোপের মধ্যে ‘সারে অ্যান্ড বর্ডারস পার্টনারশিপ এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’ প্রথম কেন্দ্র হিসেবে এই ট্রায়াল শুরু করেছে এবং ব্রিটেনে অংশগ্রহণকারী সংগ্রহের (রিক্রুটমেন্ট) নেতৃত্ব দেবে।

স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের কেন্দ্রসহ যুক্তরাজ্যের ১৫টিরও বেশি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এতে অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং এগুলোর বেশিরভাগই বছরের শেষ নাগাদ কার্যক্রম শুরু করবে।

আন্তর্জাতিকভাবে ৫৫ থেকে ৮০ বছর বয়সী প্রায় ১,৬০০ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে এই ট্রায়ালের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ট্রায়ালটি চার থেকে ছয় বছর ধরে চলবে।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, শক্তিশালী নতুন ওষুধের সাথে রক্ত ​​পরীক্ষার সমন্বয়—যা লক্ষণ প্রকাশের বহু বছর আগেই আলঝেইমার শনাক্ত করতে সক্ষম—রোগটির চিকিৎসার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।

এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যবয়সেই প্রতিরোধমূলক হিসেবে এই ওষুধ দেওয়া। বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতিকে “মস্তিষ্কের জন্য স্ট্যাটিন” (statins for the brain)-এর সাথে তুলনা করেছেন।

অধ্যাপক নিলফোরুশান জানান, সাধারণত স্মৃতিশক্তিজনিত সমস্যার জন্য মানুষ যখন চিকিৎসার খোঁজ করেন, তারও পাঁচ থেকে ১০ বছর আগেই আলঝেইমার রোগের প্রক্রিয়া বা প্যাথলজি শুরু হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে স্মৃতিশক্তি বিষয়ক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য জ্ঞানীয় সমস্যা (cognitive problems) নেই।

এরপর তাদের ‘পি-টাউ২১৭’ (p-tau217) পরিমাপের জন্য রক্ত ​​পরীক্ষা করা হবে; এটি এমন একটি প্রোটিন যা আলঝেইমারের লক্ষণ প্রকাশের আগেই এর জৈবিক সংকেত বা উপস্থিতি জানান দিতে পারে।

যাদের ক্ষেত্রে এই প্রোটিনের মাত্রা বেশি এবং ট্রায়ালের জন্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকবে, তাদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে এমআরআই (MRI) ও পিইটি (PET) স্ক্যানসহ আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

অংশগ্রহণকারীদের দৈবচয়ন বা র‍্যান্ডম পদ্ধতির মাধ্যমে ‘ট্রনটিনেমাব’ (trontinemab) অথবা ‘প্লাসিবো’ (placebo) দেওয়ার জন্য ভাগ করা হবে। গবেষকরা চার থেকে ছয় বছর ধরে তাদের পর্যবেক্ষণ করবেন এটা দেখার জন্য যে, ওষুধটি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি সংক্রান্ত সমস্যা প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করতে পারে কি না।

‘পরীক্ষামূলক ওষুধ’
অধ্যাপক নিলফোরুশান জোর দিয়ে বলেন যে, এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমি বলছি না যে এই ট্রায়ালটি কোনো জাদুকরী সমাধান। এটি একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে—এটি আদৌ কাজ করবে কি না।”

সুইস ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘রোশ’ (Roche)-এর তৈরি ট্রনটিনেমাব হলো পরবর্তী প্রজন্মের একটি অ্যান্টিবডি চিকিৎসা। আলঝেইমারের বিদ্যমান ওষুধগুলোর তুলনায় এটি আরও কার্যকরভাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

ওষুধটি ‘অ্যামাইলয়েড’ (amyloid)-কে লক্ষ্য করে কাজ করে। এটি এক ধরণের আঠালো প্রোটিন যা মস্তিষ্কে জমা হয় এবং আলঝেইমার রোগের বিকাশের সাথে জড়িত।

এটি ‘ব্রেইন শাটল’ (brain shuttle) নামক একটি কৌশল ব্যবহার করে, যার উদ্দেশ্য হলো ‘ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার’ বা রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধক ভেদ করে আরও বেশি পরিমাণ ওষুধ মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়া।

প্রাথমিক ট্রায়ালগুলোতে এমন আশার সঞ্চার হয়েছে যে, এটি আগের চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত অ্যামাইলয়েড প্লাক দূর করতে সক্ষম। দেখা গেছে, উচ্চ মাত্রার ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে মাত্র তিনটি মাসিক ইনফিউশনের (শিরাপথে ওষুধ প্রয়োগ) পরেই রোগীদের মস্তিষ্ক অ্যামাইলয়েড-মুক্ত হয়ে যায়।

অ্যামাইলয়েড দূর করার এই গতি ‘লেকানেমাব’ (lecanemab) এবং ‘ডোনানেমাব’ (donanemab)-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উল্লেখ্য, আলঝেইমার রোগের অগ্রগতি ধীর করার ক্ষেত্রে এই দুটি ওষুধই প্রথম কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল, তবে সমপরিমাণ অ্যামাইলয়েড দূর করতে সেগুলোর সাধারণত এক বছরেরও বেশি সময় লাগত।

তবে, অ্যামাইলয়েড দ্রুত দূর করা গেলেই তা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি সংক্রান্ত সমস্যার বিরুদ্ধে আরও ভালো সুরক্ষা দেবে কি না, সে বিষয়ে গবেষকরা এখনও নিশ্চিত নন।

লেকানেমাব এবং ডোনানেমাবের ট্রায়ালে দেখা গেছে, যেসব রোগীর মধ্যে ইতিমধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে ওষুধগুলো যথাক্রমে ২৭ শতাংশ এবং ৩৫ শতাংশ হারে জ্ঞানীয় সক্ষমতার অবক্ষয় ধীর করতে পেরেছিল।

ব্রিটেনে ওষুধ দুটির অনুমোদন পাওয়া গেলেও, খরচ ও উপযোগিতার বিচারে সেগুলোকে এনএইচএস (NHS)-এর নিয়মিত ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করা হয়নি। ওষুধগুলো বাজারে আনার লক্ষ্যে দাম নির্ধারণের বিষয়ে প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো এনএইচএস কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

এই ওষুধগুলোর কারণে মস্তিষ্কে গুরুতর মাত্রায় ফোলাভাব ও রক্তক্ষরণ হতে পারে; ফলে রোগীদের বারবার এমআরআই (MRI) স্ক্যান করাতে হয়, যা চিকিৎসার খরচ বাড়িয়ে দেয়।

‘ট্রনটিনে ম্যাব’ (Trontinemab) এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শরীরের অন্যান্য অংশে এর প্রভাব কম পড়ে এবং মস্তিষ্কে অধিক পরিমাণে অ্যান্টিবডি পৌঁছানো যায়। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, এতে এ ধরনের জটিলতার হার কম হতে পারে। এর ফলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কম পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে এবং সামগ্রিক খরচও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‘হয়তো মানুষ তাদের বাবা-মায়ের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে চায়’
অধ্যাপক নিলফোরুশান বলেন, নিজেদের ঝুঁকির বিষয়টি জানার পেছনে রোগীদের ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বয়স্ক বাবা-মায়ের সেবাযত্ন করছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ থাকার সম্ভাবনা বেশি।

তিনি বলেন, “হয়তো কেউ কেউ তাদের জীবনের পরিকল্পনা করতে চান। হয়তো কেউ আগেভাগে অবসরে যেতে চান অথবা পরিবারের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে চান।”

“হয়তো তারা বিষয়টি জানতে চান, অথবা তাদের বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, নিজেদের ক্ষেত্রেও যেন তেমনটা না ঘটে—সেটাই নিশ্চিত করতে চান।”

পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তে ‘পি-টাউ২১৭’ (p-tau217)-এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি, তাদের আগামী এক দশকের মধ্যে স্মৃতিশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার (cognitive impairment) ঝুঁকি প্রায় ৭৮ শতাংশ।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, রক্ত ​​পরীক্ষায় ‘পি-টাউ২১৭’-এর মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলভাবে আলঝেইমার রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।

গবেষকরা প্রাথমিকভাবে এমন ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করবেন যারা আগে ‘মেমরি ক্লিনিক’-এ গিয়েছিলেন, কিন্তু পরীক্ষায় স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে বলে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। আগ্রহী ব্যক্তিরা সরাসরি ‘সারে’ (Surrey)-এর গবেষণা দলের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন; এতে সারা দেশ থেকেই অংশগ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ১৪ লাখে পৌঁছাবে।

এই ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক চিকিৎসার জন্য স্ক্রিনিং বা প্রাথমিক পরীক্ষায় আগ্রহীরা ‘সারে অ্যান্ড বর্ডারস পার্টনারশিপ’-এর গবেষণা দলের সাথে ০১৩৭২ ২১৬৫৮৪ নম্বরে অথবা research@sabp.nhs.uk ইমেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।


Spread the love

Leave a Reply