বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বির্নিমাণে রোভারিং

Spread the love

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন:

রোভারিং মূলত স্কাউট আন্দোলনের একটি বিস্তৃত ধারা, যা ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মানবিক গুণ, নেতৃত্ব, সেবা ও চরিত্র গঠনের পথে এগিয়ে দেয়। বাংলাদেশে রোভার স্কাউটরা দীর্ঘদিন ধরেই সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত। তাদের আদর্শভিত্তিক প্রশিক্ষণ, দলগত কাজের অভিজ্ঞতা এবং মানবিক সেবার প্রতি দায়বদ্ধতা দেশের উন্নয়নযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে রোভারিং আজ আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক স্তরে বৈষম্য দূর করতে হলে দরকার সচেতন তরুণ, নৈতিক নেতৃত্ব এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা যা রোভারিং তরুণদের ভেতরে গড়ে তোলে।

বাংলাদেশে বৈষম্য নানা রূপে প্রকাশ পায়। কারও কাছে অর্থ, শিক্ষা, চিকিৎসা বা সুযোগের সুষম বণ্টন নেই। আবার কোথাও লিঙ্গ, ধর্ম, ভাষা বা সামাজিক অবস্থান ঘিরে বৈষম্য দেখা যায়। এই বৈষম্য কমাতে হলে পুরোনো ধ্যানধারণা বদলাতে হবে, দরকার হবে সামাজিক আন্দোলন, সমান সুযোগের ব্যবস্থা এবং মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ। রোভাররা তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঠিক এই জায়গাগুলোতেই কাজ করে থাকে। তাদের প্রতিটি কার্যক্রমে সমতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার চর্চা করা হয়, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সরাসরি সহায়তা করে।

২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা ১০ জন স্কাউটদেরকে হারিয়েছি। কেন এরা প্রাণ দিলো? কারণ তারা চেয়েছিলো দেশে এক বৈষম্যহীন ও কোটামুক্ত চাকরি নির্বাচন। তবে এই ব্যবস্থা নিয়ে আসার জন্য আমরা তাদেরকে হারিয়ে ফেলেছি। কারণ তারা স্কাউটিং শিক্ষা ও আদর্শকে আগে রেখে আন্দোলন যোগদান করেছে। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থান মাধ্যমে আমরা আমাদের রোভারিং আদর্শের প্রমাণ অবশ্য পেয়েছি।

রোভারিংয়ের অন্যতম শক্তি হলো “কমিউনিটি সার্ভিস”। রোভার স্কাউটরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ায়। তারা বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঠে নেমে ত্রাণ বিতরণ, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, পানিবন্দি মানুষের পাশে থাকা, চিকিৎসা ক্যাম্পে সহায়তা করা এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঘর পুনর্গঠনে সহযোগিতা পর্যন্ত করে থাকে। এসব কাজ একদিকে মানুষের কষ্ট লাঘব করে, অন্যদিকে সমাজে সমতার বোধ তৈরি করে। যখন একজন রোভার একটি দরিদ্র পরিবারের খাদ্যের ব্যবস্থা করে বা একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসায় সাহায্য করে, তখন তারা শুধু সেবা দানই করে না, বরং সমাজে মানবিক সমানতার পরিসর তৈরি করে যা বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের ভিত্তি।

রোভারিং শিক্ষা বৈষম্য কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রোভার স্কাউটরা দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা শিশুদের নিয়ে বিনামূল্যে কোচিং, বই বিতরণ, স্কুলে ফিরিয়ে আনার প্রচার, ড্রপআউট রোধে অভিভাবক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করে। গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহরের বস্তিতে যারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাদের কাছে পৌঁছে রোভারদের এমন উদ্যোগ শিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়। শিক্ষা বৈষম্যমুক্ত সমাজের মূল চাবিকাঠি; তাই রোভারদের এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে দেশ উন্নয়নের পথে তরুণ-শিশু সবাই সমান অংশীদার হতে পারবে।

রোভারিংয়ের একটি মৌলিক দিক হলো নেতৃত্ব উন্নয়ন। রোভার স্কাউটরা বিভিন্ন দলে কাজ করে, পরিকল্পনা নেয়, কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং সমস্যা সমাধান শিখে। এই অভিজ্ঞতা তাদের দায়িত্বশীল ও সৎ নেতৃত্বে পরিণত হতে সাহায্য করে। বৈষম্যহীন দেশ গড়তে প্রয়োজন সৎ, নীতিনিষ্ঠ ও মানবিক নেতৃত্ব যারা সমাজের সকল শ্রেণির প্রতি সমান আচরণ করবে। রোভারিং এমন নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ একজন রোভার ছোটবেলা থেকেই নিজেকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করতে শেখে, যা ভবিষ্যতে তার কাজের জগৎ, প্রশাসন বা রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সচেতনতা। রোভার স্কাউটরা নিয়মিত বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালায়। যেমন মাদকবিরোধী প্রচার, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষা, নারী-পুরুষ সমতার প্রচারণা ইত্যাদি। এসব কার্যক্রম শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে কাজ করে না, বরং সমাজের সামগ্রিক ভাবনাকে মানবিক ও বৈষম্যমুক্ত পথে পরিচালিত করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন রোভার যখন গ্রামে গিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের প্রচার চালায়, তখন সে শুধু একটি বিয়ে বন্ধ করে না, বরং সেই সমাজে নারীর প্রতি সম্মান এবং সমতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে।

রোভারদের “মেসেঞ্জার অফ পিস” কার্যক্রমও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণের পথে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণরা শান্তি, সহমর্মিতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ধর্ম, জাতি, ভাষা বা সামাজিক অবস্থান ভেদ করে নয় সব মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার এই মনোভাবই বৈষম্যমুক্ত সমাজের প্রাণ। রোভাররা যখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করে, তখন সমাজে বিভাজন কমে এবং ঐক্যের ভিত্তি আরও শক্ত হয়।

রোভার স্কাউট আন্দোলন তরুণদের নৈতিক চরিত্র গঠনেও সাহায্য করে। তারা শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সততা, সময়ানুবর্তিতা, দেশপ্রেম এবং মানবতার মূল্য শেখে। এই নৈতিক গুণগুলো যখন একজন তরুণের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন সে অন্যকে বৈষম্যের চোখে দেখে না। সবার প্রতি সমান আচরণ, ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা, দুর্বলকে সহায়তা এবং অন্যায় প্রতিরোধ এসব গুণই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত গড়ে। রোভারিং এই গুণাবলিকে প্রাত্যহিক চর্চার মাধ্যমে দৃঢ় করে।

রোভারদের মাঠপর্যায়ের কাজের সাফল্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন আরও সুসমন্বিত উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোভার স্কাউট ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন, সমাজসেবামূলক প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব, কমিউনিটি উন্নয়ন কর্মসূচিতে রোভারদের সক্রিয় যুক্ত করা এসব উদ্যোগ নিলে রোভারদের প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে। তরুণরা যদি সমাজের প্রতিটি স্তরে সেবা, সমতা ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে বৈষম্য কমানো অনেক সহজ হবে।

একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি একটি বাস্তব লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন সচেতন জনগোষ্ঠী, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং মানবিক মনোভাব। রোভার স্কাউটরা ঠিক এখানেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তারা সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা, সেবা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়; দুর্যোগে পাশে থাকে, দুর্বলকে সহায়তা করে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা করে এবং সম্প্রদায়ের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করে।

সুতরাং, বলা যায় যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণে রোভারিং অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। যেদিন দেশের প্রতিটি তরুণ রোভার আদর্শে অনুপ্রাণিত হবে, সেদিন বৈষম্য, বৈপরীত্য বা বিভাজন টিকে থাকার জায়গা পাবে না। রোভাররা সমাজের জন্য কাজ করে, আর তাদের এই নিরলস মানবিকতা নতুন প্রজন্মকে একটি সমতা ও ন্যায্যতার বাংলাদেশ উপহার দিতে পারে।

 

নাম: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
সদস্য সচিব
জনসংযোগ, মার্কেটিং ও মিডিয়া সাব কমিটি
আমরা স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা


Spread the love

Leave a Reply