ব্রিটেনের সংবাদশীর্ষ সংবাদ

ব্রিটেনে তাপদাহের তাণ্ডব: দুই মাসে ২৭০০ মৃত্যু

Spread the love

সাজু আহমদ : 
একসময় যুক্তরাজ্যে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাই ছিল সংবাদ শিরোনাম। কিন্তু আজ সেই দেশেই ভয়াবহ হিটওয়েভে মাত্র দুই মাসে প্রায় ২,৭০০ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের নতুন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

The Guardian-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের মে ও জুন মাসের দুটি তাপপ্রবাহে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ২,৭০০ মানুষ সময়ের আগেই প্রাণ হারিয়েছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, জুন মাসের সবচেয়ে তীব্র তিন দিনের হিটওয়েভে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষকদের অনুমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি আবহাওয়ার ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ মানবিক মূল্য।

একটি ভয়াবহ তুলনা

এই পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বোঝাতে গবেষকরা যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী—
* সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ জন মারা যান।
* অ্যালকোহল ও মাদক-সম্পর্কিত কারণে প্রতিদিন মারা যান প্রায় ৩৫ জন।
অন্যদিকে, জুনের চরম তাপপ্রবাহের সময় প্রতিদিনের সম্ভাব্য তাপজনিত মৃত্যু ছিল প্রায় ৪৪০ জন, যা এই দুই কারণ মিলিয়েও বহুগুণ বেশি।
মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের প্রভাব
গবেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই উষ্ণায়নের কারণে হিটওয়েভ আরও তীব্র হয়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই মৃত্যুর ৪০ শতাংশেরও বেশি ঘটত না, যদি মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বর্তমান পর্যায়ে না পৌঁছাত।

গবেষণার প্রধান লেখক ড. ক্লেয়ার বার্নস বলেন, “সংখ্যাগুলো এত বড় যে এগুলোকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে চরম তাপমাত্রার প্রভাব স্পষ্টভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।”
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা?
চরম তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন—
* প্রবীণ মানুষ
* ছোট শিশু
* হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তি
* দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ রোগী
* খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ

গবেষকদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এর ফলে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।

তিন দিনের ‘রেড ওয়ার্নিং’
জুনের ওই তীব্র হিটওয়েভের সময় UK Health Security Agency এবং Met Office টানা তিন দিনের জন্য সর্বোচ্চ ‘রেড হিট-হেলথ ওয়ার্নিং’ জারি করেছিল। এটি ছিল জীবনহানির ঝুঁকি সম্পর্কে সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তাগুলোর একটি।
এর আগে UK Health Security Agency-এর এক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

শুধু যুক্তরাজ্য নয়, পুরো ইউরোপ সংকটে

এই হিটওয়েভ শুধু যুক্তরাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, জুনের এই তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায় এবং প্রাথমিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী সেখানে প্রায় ৫,৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও অন্যান্য দেশেও হাসপাতাল, স্কুল এবং পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

এখন কী করা প্রয়োজন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ কমাতে হলে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে এবং একই সঙ্গে সমাজকে চরম গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
তাদের মতে—
* নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
* শক্তি সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণ করতে হবে।
* শহরে সবুজ এলাকা ও গাছের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
* হাসপাতাল, কেয়ার হোম এবং স্কুলকে উচ্চ তাপমাত্রার উপযোগী করতে হবে।
* সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নেট জিরো নির্গমন লক্ষ্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।
বিজ্ঞানীদের শেষ সতর্কবার্তা

ড. ক্লেয়ার বার্নস বলেন, “নেট জিরো কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তবতা। আমরা যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধ করি, তাহলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ানোও বন্ধ হবে এবং ভবিষ্যতের হিটওয়েভ আরও ভয়াবহ হওয়ার ঝুঁকি কমবে।”
জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। এটি এখন মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাস্তব সংকট। আর মে ও জুন মাসে মাত্র দুই মাসে প্রায় ২,৭০০ অকাল মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতারই এক কঠিন স্মারক।


Spread the love

Leave a Reply