শীর্ষ সংবাদআন্তর্জাতিক

ভয়াবহ দাবানলের মুখে বোর্দো শহর; বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ প্রাণঘাতী দাবানল বোর্দো শহরের দিকে ধেয়ে আসছে এবং কর্মকর্তারা শহরটি খালি করার কথা বিবেচনা করছেন।

বোর্দোর মেয়র টমাস কাজেনাভ আগুনকে “মহানগর এলাকার প্রবেশদ্বারের সন্নিকটে” বলে বর্ণনা করেছেন; ইতিমধ্যে শহরতলির ৫০,০০০ মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জিরোন্দ ফায়ারফাইটার্স ইউনিয়নের প্রধান সেবাস্টিয়ান বার্জ বলেছেন: “দমকলকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। আগুনের বিস্তারের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এখন বোর্দো শহর নিয়েও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।”

রবিবার বোর্দোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, গত রাতে আগুনের ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে; প্রবল বাতাসের কারণে আগুন ফ্রান্সের নবম বৃহত্তম এই শহরের দিকে এগিয়ে আসছে।

আগুন মাত্র ৩০ মাইল দূরে থাকায়, ২ লাখ ৭০ হাজার জনসংখ্যার বোর্দো শহরটি পুরোপুরি খালি করার কথা বিবেচনা করছে সিটি কাউন্সিল।

ফ্রান্স ইতিমধ্যে শান্তিকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় স্থানান্তর বা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমের জিরোন্দ ও লান্দ অঞ্চল থেকে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষকে—যার মধ্যে অনেক ব্রিটিশ প্রবাসীও রয়েছেন—বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেছেন, শান্তিকালীন সময়ে ফ্রান্সে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটিই সম্ভবত সর্ববৃহৎ কার্যক্রম হতে যাচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

বোর্দো অঞ্চলটি আঙুরক্ষেতের জন্য বিখ্যাত এবং আটলান্টিক উপকূলের নিকটবর্তী অবকাশ যাপন কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণকারী পর্যটকদের জন্য শহরটি অন্যতম প্রধান পরিবহন কেন্দ্র।

ফরাসি পুলিশ একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যাতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে, দেয়াল টপকে মানুষকে দ্রুত এলাকা ছাড়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

একজন পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, “আপনার সন্তান ও পোষা প্রাণীদের নিয়ে দ্রুত সরে পড়ুন।”

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ৩০টি দাবানল মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মন্ত্রীদের সাথে জরুরি বৈঠক করতে যাচ্ছেন; সরকার এই পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে অভিহিত করেছে।

বর্দো (Bordeaux) এলাকার কাছে অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের সহায়তার জন্য ফরাসি সরকার ১,৫০০ সৈন্য পাঠিয়েছে। এছাড়া শনিবার একটি A400M সামরিক পরিবহন বিমান—যা একবারে ২০ টন পর্যন্ত অগ্নিনির্বাপক রাসায়নিক (fire retardant) ছড়াতে সক্ষম—আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত ছোট বিমানগুলোর বহরে যুক্ত হয়েছে।

মিঃ নুনেস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৯৮,০০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, যা একটি ‘ঐতিহাসিক রেকর্ড’।

শনিবার জিরোন্দ (Gironde) এলাকায়—যেখানে ৩২,০০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে—জীবন বিপন্ন করার সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সরকারি কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে আতশবাজি জ্বালানোর অভিযোগ রয়েছে।

বাড়িঘর পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা রাতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন এবং পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের প্রভাব মোকাবিলায় জিরোন্দের বাসিন্দাদের মাঝে ১৫ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্দো থেকে স্পেন সীমান্ত পর্যন্ত প্রধান এ৬৩ (A63) মহাসড়কের প্রায় ৪০ মাইল অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

রেল সংস্থা এসএনসিএফ (SNCF) জানিয়েছে, তারা বর্দোর দক্ষিণে প্রায় ৬০ মাইল এলাকায় ট্রেন চলাচলও বন্ধ রেখেছে।

স্থানীয় আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী সপ্তাহে ফ্রান্স ও স্পেনে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বেশিরভাগ স্থানেই বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১২ মাইলের বেশি হতে পারে।

মাদ্রিদের পশ্চিমে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ার পর স্পেনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে; এতে ভ্যালেন্সিয়ায় একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং শনিবার সন্ধ্যায় টলেডোর নিকটবর্তী আরও আটটি শহরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি ২৮ হাজার মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দুটি পৃথক দাবানলকে একে অপরের সাথে মিশে যাওয়া থেকে আটকাতে শত শত দমকলকর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে স্প্যানিশ কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, রাজধানীর কাছে সৃষ্ট একটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা দমকলকর্মীদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।

মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো এই অগ্নিকাণ্ডকে “অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল” হিসেবে অভিহিত করেছেন; এতে প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শনিবার বলেছেন যে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো “জীবন বাঁচানো”। তিনি সতর্ক করে বলেন যে সামনে একটি “জটিল” লড়াই অপেক্ষা করছে। একই সাথে তিনি “জলবায়ু জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে জাতীয় সমঝোতা”র আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন—বিজ্ঞানীদের মতে, এই জলবায়ু সংকটই দাবানল পরিস্থিতির তীব্রতায় ভূমিকা রেখেছে।


Spread the love

Leave a Reply