বাংলাদেশশীর্ষ সংবাদ

মালয়েশিয়ায় তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠকঃ আসিয়ান ব্যবস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আহ্বান

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের একটি টেকসই, নিরাপদ এবং ব্যাপক সমাধান খুঁজে বের করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের (ASEAN) ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার ‘পুত্রা পেরদানা’ ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর, যা দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আসিয়ানের মাধ্যমে যৌথ কূটনৈতিক উদ্যোগ
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই নেতা জানান, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চলমান মানবিক সংকট এবং এর বহুমুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সফলভাবে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে দুই দেশ অভিন্ন প্রচেষ্টা চালাবে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের (Stakeholders) সাথে সম্পৃক্ততা ও আলোচনা আরও নিবিড় করা হবে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আসিয়ানের কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সাথে বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (RCEP) চুক্তিতে যোগদানের যে আগ্রহ দেখিয়েছে, তাতে মালয়েশিয়া পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে।
May be an image of the Oval Office, dais and text
গাজা ইস্যু ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় অবস্থান
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সংকট প্রসঙ্গে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গাজায় ইসরায়েলি জায়নবাদী শাসনের চলমান নৃশংসতা ও বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের অমানবিক দুর্ভোগের অবসান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে উভয় দেশ অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে।
এছাড়াও, উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে এবং ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের জন্য দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং ফলপ্রসূ সংলাপের ওপর দুই নেতাই বিশেষ জোর দেন।
May be an image of the Oval Office, dais and text that says "PejabatPerdanı erdana Menteri Pejabat MALAYSIA"
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে ৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
উভয় দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল গতানুগতিক শ্রমবাজার বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি ও গবেষণার মতো উচ্চ-মূল্যের খাতে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিনিময় করা হয়:
    • সাংস্কৃতিক সহযোগিতা: দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সুদৃঢ় করতে একটি ‘সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক’ (MoU) বিনিময় করা হয়েছে।
    • সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী যৌথ গবেষণা: আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ গবেষণার উদ্দেশ্যে একটি ‘নোট বিনিময়’ (EoN) স্বাক্ষরিত হয়।
    • বিনিয়োগ প্রচার ও সহজীকরণ: দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বাধা দূর করতে এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ সহজ করার লক্ষ্যে দ্বিতীয় ‘নোট বিনিময়’ (EoN) সম্পন্ন হয়েছে।

নতুন দিগন্তের যৌথ অঙ্গীকার
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শীর্ষ বৈঠক এবং সহযোগিতা চুক্তিগুলো দুই দেশের অর্থনৈতিক বা কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও সুসংহত করবে। এই উদ্যোগ উভয় দেশের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে একটি ঘনিষ্ঠ, গতিশীল এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের যৌথ অঙ্গীকারকেই সফলভাবে প্রতিফলিত করে।

এরপর  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আনয়ার ইব্রাহীমের মধ্যে একটি চার দফা বৈঠক হয় এবং পরবর্তীতে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদলকে নিয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নেতৃত্ব দেন আনোয়ার ইব্রাহীম, যা একটি সম্মানজনক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, হালাল শিল্প এবং কর্মশক্তি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার প্রচেষ্টার ওপর আলোকপাত করা হয়।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে সহায়তা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে  মালেয়শিয়ান প্রধানমন্ত্রী সাধুবাদ জানান এবং তাদেরকে নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই সর্বোত্তম সমাধান—এই বিষয়ে মালয়েশিয়ার দৃঢ় অবস্থানকে  স্বাগত জানান।
মালয়েশিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং আত্মবিশ্বাসী যে, উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সহযোগিতার আরও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে যা অন্বেষণ করা যেতে পারে।

 


Spread the love

Leave a Reply