রাখাইনে সেনাবাহিনীর উল্লাসনৃত্য

Spread the love

A Rohingya refugee woman carry a child while walking on the muddy road after travelling over the Bangladesh-Myanmar border in Teknaf, Bangladesh, September 1, 2017. REUTERS/Mohammad Ponir Hossain - RC1305D86090
A Rohingya refugee woman carry a child while walking on the muddy road after travelling over the Bangladesh-Myanmar border in Teknaf, Bangladesh, September 1, 2017. REUTERS/Mohammad Ponir Hossain – RC1305D86090

বাংলা সংলাপ ডেস্কঃ ফেসবুকে একটি ছবি। একটি বালিকার মৃতদেহ। পানিতে ডুবে মারা গেছে। ভাসছে। দু’হাত প্রসারিত। বলা হচ্ছে, সে রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার শিকার। ফেসবুক খুললেই সেনাবাহিনীর নৃশংস উল্লাসনৃত্যের দৃশ্য। পুরো নগ্ন করে যুবতীর দেহ নিয়ে উল্লাস করছে তারা। প্রহার করছে। লাথি মারছে। হাত পা কেটে নিচ্ছে। গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সেই মাথা হাতে নিয়ে তান্ডবনৃত্য করছে। কোনো এক বোনকে ঘিরে দরেছে হায়েনার দল। তার চোখমুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তিনি বাঁচার জন্য কাকুতি জানাচ্ছেন। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। সঙ্গে সঙ্গে লাথি দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়া হচ্ছে। চারদিকে তাকে ঘিরে আছে কয়েক শত মানুষ। সবাই সেই উল্লাস দেখছে। প্রহার করা হচ্ছে সেই বোনকে। রক্তাক্ত যুবতী বোনটি আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। না, তাকে সেই সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এবার তার গায়ে ঢেলে দেয়া হয় কেরোসিন বা কোনো জ্বালানি তরল। ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। যুবতী চিৎকার করেন। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। পারেন না। দাউ দাউ জ্বলতে থাকে আগুন তার শরীরে। তিনি গড়াগড়ি খেয়ে আগুন নিভানোর চেষ্টা করেন। হাত-পা ছোড়েন। কিন্তু না। পশুর দল তাকে বাঁচতে দেয় না। আবার তার দেহে জ্বালানি তরল ঢেলে দেয়া হয়। সারা শরীর এবার আগুনের বলয়ে পরিণত হয়। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যায় তার দেহ। পা দুটি টান টান হয়ে যায়। বাম হাতটি উপর দিকে উঠে যায়। নিস্তব্ধ হয়ে তিনি উপহাস করতে থাকেন পৃথিবীকে, পৃথিবীর মানুষকে। আরেকটি ভিডিও। এক যুবক অথবা টিনেজারের। পিছনে হাত নিয়ে বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। তার চারপাশে ঘুরছে সেনারা, তাদের লালিত উগ্রপন্থিরা। ওই টিনেজারের সঙ্গে তাদেরকে কথা বলতে দেখা যায়। মনে হতে পারে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়া হবে অথবা তাদের জিম্মায় রাখা হবে। কিন্তু এর পরের দৃশ্যটি ভয়াবহ। কোনো মানুষের পক্ষে তা সহ্য করা সম্ভব নয়। পিছন থেকে ধারালো অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসে একজন। কিশোরের মাথা পিছন দিকে টেনে ধরে এক হাতে। এতে কিশোরের গলা টান টান হয়। অমনি অন্য হাতে সেই গলায় চালায় ধারালো ছুরি। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়। ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রক্তের এক হোলি উৎসব যেন! কর্তিত মস্তক উঁচু করে দেখানো হয়। তারপর! তারপর সেই কর্তিত মাথা নিথর দেহের ওপর ফেলে দেয়া হয়। আরও একটি ভিডিও। কয়েকজন যুবককে অর্ধনগ্ন করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। একটি খোলা মেঝেতে। তাদের হাত পিছনে নিয়ে বাঁধা। দৃশ্যত সেনাবাহিনীর সদস্যরা চাবুক হাতে প্রহার করছে তাদের। একের পর এক। কারো মাফ নেই। চাবুকের আকাতে কুঁকড়ে উঠছেন যুবকরা। কারো মনে, প্রাণে একটু দয়া হচ্ছে না। আরো একটি ভিডিও। এক যুবককে দেখা যায় একটি ডোবার পানিতে। শুধু একটি জাঙ্গিয়ার মতো পরনে। যুবকটি জীবিত। তিনি হাত নড়াচড়া করছেন। তার গলায় রশি বাঁধা। তা ধরে উপর থেকে টেনে নিচ্ছে একজন। এভাবে টানাতে মারা যান ওই যুবক। তারপরও তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় রাস্তার ওপর দিয়ে। দু’জন যুবককে দেখা যায়। তাদেরকে প্রহার করা হয়। প্রহারে প্রহারে রক্তাক্ত হয়ে যায় তারা। অস্ত্র হাতে এগিয়ে যায় সেনা সদস্য। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কব্জি থেকে কেটে ফেলে হাত। এখাবে দু’হাতই কেটে ফেলা হয়। দু’পা কেটে ফেলা হয়। ছাটাতে থাকেন যুবক। তারপরও মুক্তি নেই। এবার আরো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। তার গলা কেটে মাথা আলাদা করা হয়। চুল ধরে তা উঁচু করে দেখানো হয়। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হয়। এরপর তারই শরীরের ওপর রেখে দেয়া হয় তা। একজন যুবতী। পুরো নগ্ন। তাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। আরেকজন যুবতী। তার ওপরের পোশাক কেড়ে নেয়া হয়েছে। শুধু অন্তর্বাস বাকি। তার ওপর অকথ্য নির্যাতন করা হচ্ছে। এমনিতরো অসংখ্য ভিডিও, ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুক সহ সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এগুলো মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো সেদেশের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধদের নির্যাতনের প্রমাণ। এসব ভিডিও বা ছবি কবে কখন তোলা হয়েছে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে না পারলেও এটা পরিস্কার, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো হচ্ছে অকথ্য নির্যাতন।81361_a শান্তির দূত (?) অং সান সুচির সরকার স্বীকার না করলেও এমন নির্যাতন হচ্ছে- নিঃসঙ্কোচিত্তে বলে দেয়া যায়। অং সান সুচি এ জন্য তার জীবনে অর্জিত সবটুকু হারিয়ে ফেলেছেন। তাকে গণতন্ত্রের, শান্তির দূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও তিনি সেই অবস্থানে এখন আর নেই। তিনিও বিশ্বের অন্য অনেকের মতো ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে গেছেন। তাই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারছেন না। তিনি জানেন, কথা বললেই, সেনাবাহিনী বা বৌদ্ধদের এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই তাকে ক্ষমতা হারাতে হবে। আবারও গৃহবন্দিত্ব বরণ করতে হতে পারে। তাই এসি রুমে বসে, প্রহরী পরিবেষ্টিত সুচি এখন মানবাধিকার লঙ্ঘন দেখেন না। তার সামনে যুবতীকে নগ্ন করে তার ইজ্জত হরণ করলেও তার কিছু এসে যায় না। কারণ, তিনি ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছেন! তার স্বাদ পেয়ে গিয়েছেন! বিশ্ব বিবেকও যেন বোকা, অন্ধ হয়ে গেছে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ভুয়া অভিযোগে যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে। লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত করতে যুদ্ধ বার্ধিয়ে দিতে পারে। ইরানকে দাবিয়ে রাখতে একের পর এক অবরোধ দিতে পারে। কিন্তু মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর প্রকাশ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে গণহত্যার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারে না। তারা পারে উত্তর কোরিয়া কেন ক্ষেপণাস্ত্র বানাবে, ইরান কেন পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখবে, চীন কেন আধিপত্য বিস্তার করবে- এসব দিকে নজর রাখতে। ইসরাইলের দিকে তাদের নজর পড়ে না। কোথায় জাতিসংঘ! কোথায় তাদের মানবতা! কি উদ্দেশে জাতিসংঘ সৃষ্টি হয়েছিল! কাদের জন্য? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে! কোথায় মানবাধিকার! কোথায় বিশ্ববিবেক! আর কত অপরাধ, আর কত নারীর ইজ্জত লুটে নিয়ে তাকে হত্যা করলে, আর কত শিশুকে পানিতে চুবিয়ে চুবিয়ে হত্যা করলে, আর কত স্ত্রীর সামনে তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হলে, আর কত মাকে তার সন্তানের সামনে ধর্ষণ করা হলে, আর কত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হলে হুঁশ ফিরবে! নাকি রোহিঙ্গারা মানুষ না? তাদের বাঁচার অধিকার নেই? তাদের কোনো মানবাধিকার নেই? তারা জাতিসংঘের সনদের বাইরে? তারা কার কাছে বিচার চাইবে? রোহিঙ্গা মুসলিমদের গায়ে এমন আঘাত কি অন্য মুসলিমের গায়ে আঘাত করে না? কোথায় মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের কান্ডারিরা? একটি মুসলিম দেশও তো এ ঘটনায় কথা বলছে না। কোথায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডানÑ কোথায় মুসলিম বিশ্ব! তাদের মুখে কোনো রা নেই কেন! তাহলে কি তারা রোহিঙ্গা নির্যাতনকে সমর্থন করছেন?


Spread the love

Leave a Reply