লন্ডনের বাংলা সংলাপ ও একজন মশাহিদ আলী
অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন ব্রিটেনের মতো উন্নত রাষ্ট্রে পত্রিকা চালানো কঠিন কোন বিষয় না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন । এখানে পত্রিকা প্রকাশ খুবই জটিল এবং ব্যয়সাপেক্ষ। যারা এর সাথে যুক্ত তারাই টের পাচ্ছেন মর্মে মর্মে ! নিকট অতীতে লন্ডনে বাংলা সংবাদপত্রের ছিল রমরমা অবস্থা। প্রায় ২০টির মতো সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা (নিয়মিত/অনিয়মিত) প্রকাশিত হলেও বর্তমানে টিকে আছে হাতেগোনা ক’টি । প্রিন্টেড পত্রিকা তেমন দেখাই যায়না।তবে কিছু পত্রিকা অনলাইন ভার্সনে টিকে আছে শুধুমাত্র অস্তিত্ব জানানোর স্বার্থে ।বেশিরভাগই ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায় ।ব্রিটেনের বাঙালি মাত্রই জানেন, লন্ডনের প্রায় সব মসজিদের সামনে শুক্রবার জুমার সময় বান্ডিল বান্ডিল পত্রিকা রাখা হতো।মুসল্লিরা নামাজ শেষে চয়েজ মতো নিয়ে যেতেন। যা ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি । এখন আর সেই দিন নেই।মসজিদগুলোর সামন থাকে ফাঁকা,পরিষ্কার । ফ্রি পত্রিকা আর কেউ রাখেন না। রাখবেনই বা কিভাবে ? প্রকাশ হলে তো রাখার প্রসঙ্গ আসে। বর্তমানে পত্রিকা জগতের চরম নিদানকাল চলছে। তবে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে হাতেগোনা যে ক’টি এখনো টিকে আছে তন্মধ্যে সাপ্তাহিক ‘বাংলা সংলাপ’ অন্যতম। অনেক চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে এটি দীর্ঘ ১৫বছর পেরিয়ে সাফল্যের সাথে ষোলোতে পদার্পণ করেছে । বাংলা সংলাপের এই অগ্রযাত্রার মূল কাণ্ডারি হচ্ছেন এর মালিক ও সম্পাদক মোঃ মশাহিদ আলী।যার ধ্যান জ্ঞান নেশা পেশা সবই বাংলা সংলাপকে ঘিরে। যিনি সমাজ সংসারকে তুচ্ছ করে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মতো বাংলা সংলাপকে সার্বক্ষণিক সঙ্গি হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বলা যায়, আপাদমস্তক তিনি একজন জাত সংবাদকর্মী। যে কারণে পত্রিকাটি তার গর্ব-অহংকারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ।
বাংলা সংলাপ ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর থেকে প্রকাশিত হলেও আমি ২০১৩ সালের শেষ দিকে বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই।প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, স্নেহভাজন সাংবাদিক মোঃ মশাহিদ আলীর সাথে সিলেটের স্বনামধন্য ও বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘সিলেটের ডাক’-এ কাজ করেছি ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ।নম্র ভদ্র বিনয়ী মশাহিদ আলী আমাকে সব সময়ই সম্মানের চোখে দেখেন।লন্ডনে স্থায়ী হওয়ার পরে তার কাছ থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছি তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। ব্যক্তিগতভাবে মশাহিদকে কেউ কেউ পছন্দ না করলেও তিনি অনেককে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে থাকেন অবলীলায় । তিনি দিনের প্রায় পুরোটা সময় পত্রিকা অফিসে সময় কাটান । তখন সংবাদপত্রের সাথে সংশ্লিষ্টরা ছাড়াও নানান সমস্যা নিয়ে অনেকে আসেন তার কাছে।তিনি পত্রিকার কাজ পরিচালনার পাশাপাশি সবাইকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করে থাকেন। দেশে এবং লন্ডনে তার আত্মীয় পরিজনকেও অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সাপোর্ট চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে । তিনি পত্রিকা প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে অনেক সময় ধারকর্জ করেছেন। না খেয়ে থেকেছেন । কিন্তু আত্মীয় পরিজনদের সহযোগিতা বন্ধ করেননি।

বাংলা সংলাপ শুরুর লগ্নে অনেকে তার সহযাত্রী হয়েছিলেন। তবে অলাভজনক প্রজেক্ট দেখে প্রায় সবাই কেটে পড়েছেন । নাছোড়বান্দা মশাহিদ হাল ছাড়েননি । মাঝ গাঙে প্রবল ঝড় তুফানের মধ্যে সাহসী মাঝি যেমন বীরত্বের সাথে নৌকার হাল আঁকড়িয়ে থাকেন, তেমনি মশাহিদও শত প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তার প্রাণপ্রিয় বাংলা সংলাপকে। কেউ তাকে থামাতে পারেনি। লক্ষ্য অটুট থাকায় আজ তিনি সফল। বলা যায়, সমুখসারির যোদ্ধার মতো বাংলা সংলাপকে সাফল্যের অগ্রযাত্রায় ধাবিত করেছেন । তিনি রাতদিন নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন । যে কারণে পত্রিকাটি শুধু টিকে থাকেনি, ইতোমধ্যে ইংল্যান্ডের মেইনস্ট্রিমের বেশ ক’টি এ্যাওয়ার্ডও উঠেছে তার হাতে।

মশাহিদের এই দুর্বার অগ্রযাত্রার পেছনে অবশ্য পত্রিকার প্রকাশক মোঃ আনছার মিয়ার অবদানও অনস্বীকার্য । তিনি পাশে আছেন শুরু থেকে। এছাড়া নির্বাহী সম্পাদক জাকির হোসেনও শুরু থেকে সঙ্গি ছিলেন, তার অবদানও স্বীকার করতে কুন্ঠিত হননা মশাহিদ। একজন মানুষের কথা না বললে লেখাটির পূর্ণতা পাবেনা, তিনি হচ্ছেন লন্ডনের বাংলা কমিউনিটির প্রিয়মুখ বিশিষ্ট সমাজকর্মী, সংগঠক সুফি সুহেল আহমদ । তিনি অনেকটা ছায়ার মতো মশাহিদের পাশে আছেন। এছাড়া আমি যাদেরকে পত্রিকায় সময় ও শ্রম দিতে দেখেছি তাদের মধ্যে আছেন জয়নাল আবেদীন, মুহাম্মদ শাহেদ রহমান, ডঃ আনিস রহমান, সাজু আহমেদ, জয়নুল আবেদীন,সাইদুল ইলাম, আব্দুর রহিম, সালেহ আহমেদ, রফিকুল ইলাম সজিব, মইনুল হোসেন ও আলী হোসেন প্রমুখ । তারা সব সময়ই বাংলা সংলাপ তথা মশাহিদের পাশে ছিলেন এবং আছেন। তাদের অবদানও মশাহিদ স্মরণে রাখেন নির্দ্বিধায়।
বাংলা সংলাপ সাফল্যের সাথে শুধু ১৫ বছর নয়, যুগ যুগ ধরে গ্রেট ব্রিটেনের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রিয় মুখপত্র হিসেবে টিকে থাকুক -এটাই আমার একান্ত প্রত্যাশা।
লেখকঃ বার্তা সম্পাদক,বাংলা সংলাপ।