সিলেটের পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের লন্ডনে বাড়ি, ফ্ল্যাট,রেষ্টুরেন্ট, পূর্বাচলে প্লট সহ বিপুল গুপ্ত সম্পদ
খালেদ আহমেদ, বাংলাদেশঃ সিলেট সিটি করপোরেশনের পদচ্যুত, লন্ডনে পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর বিপুল সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দেশে ও যুক্তরাজ্যে তার এসব সম্পদ রয়েছে।
‘ছোট আপার’লোক হিসেবে ব্যাপক পরিচিত আনোয়ারুজ্জামান হঠাৎ করেই দেশে এসে একতরফা নির্বাচনে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আসিন হন।
মেয়র পদে দাড়ানো নিয়ে ব্যাপক কোন্দল ছিল দলের মধ্যে। কিন্তু কথিত ‘ছোট আপার’ ক্ষমতার দাপটে দলীয় সিনিয়র নেতাও চুপসে যান। শেখ হাসিনা এককভাবে মেয়র পদে তাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষনা করেন। কিন্তু ৮ মাস পরই তাকে পালিয়ে যেতে হয়।
আনোয়ারুজ্জামানের যেসব গুপ্ত সম্পদ রয়েছে তা আয়কর নথি ও নির্বাচনী হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেননি বলে অভিযোগ করেছে দুদকের।এসব অভিযোগে সিলেটের আদালতে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধানকালে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণ করে অপসারিত মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নিজ নামে লন্ডনে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যেমন—Ilford, Essex-এর ৪ হাজার বর্গফুটের বাড়ি, Talwin St. London-এর ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও Kipling Indian Restaurant-এর তথ্য গোপনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এ ছাড়া নির্বাচনী হলফনামায় পূর্বাচলে রাজউকের বরাদ্দ করা ৫ কাঠা জমির তথ্য গোপন করেছেন।
এজাহারে দুদকের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ খ্রিষ্টাব্দে দাখিল করা আয়কর রিটার্ন অনুসারে তার মোট সম্পদ ৮৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৮ টাকা। কিন্তু এই টাকা তিনি কীভাবে অর্জন করেন, তার কোনো সঠিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং মেয়র পদে বেতন ও সম্মানি ভাতা বাবদ ১০ লাখ ৫৩ হাজার টাকা প্রাপ্ত হন, যা গ্রহণযোগ্য। তবে মোট অগ্রহণযোগ্য নিট সম্পদ ৯৩ লাখ ৪৪ হাজার ৯৮ টাকা, যা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ সেপ্টেম্বর দুদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নামে ইস্যু করা সম্পদ বিবরণীর নোটিশ জারি করার জন্য গেলে সিলেট নগরীর পাঠানটুলার বাসা তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়, ফলে নিয়মানুযায়ী তার বাসার গেটে সাক্ষী রেখে সম্পদ বিবরণীর মূল ফরম (ফরম নং: ০০৬৫৫৭) টানিয়ে আসে দুদক হয়। এ সময় উপস্থিত স্থানীয় লোকজন জানান, আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বর্তমানে এই ঠিকানায় বসবাস করেন না, লন্ডনেই তার স্থায়ী বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে।
সিলেট মহানগর হাকিম আদালতে রোববার এই মামলা দায়ের করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক রাফী মো. নাজমুস সাদাৎ।
তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ে সম্পদের তথ্য না দেওয়ায় কিংবা সময় বাড়ানোর আবেদন না করায় কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলাটি করেন। বিধি অনুযায়ী তদন্ত ও পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে সিসিকের মেয়র পদে প্রায় আট মাস দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৩ এর সিসিকের মেয়র নির্বাচিত হওয়া আনোয়ারুজ্জামান যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক। গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পলিয়ে ভারত যাওয়ার খবর পেয়ে সিলেট থেকে নগরভবন ছেড়ে পালিয়ে যান আনোয়ারুজ্জামানও। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত হয়ে গোপনে যুক্তরাজ্যে চলে যান। এরপর তাকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করে সরকার।
এক হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আনোয়ারুজ্জামান বলেন, ‘আমার অবৈধ কোনো সম্পদ নেই। যা আছে, সবই লিগ্যাল। ট্যাক্স দেওয়া’।
তিনি বলেন, ‘দুদকের নোটিশের খবর পেয়ে দেশে আমার আইনজীবীর মাধ্যমে হিসাব দাখিল করার পাশাপাশি সময় চাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে এসব মিথ্যা, বানোয়াট ও হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। দেশে কখনো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে দুদক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে মামলা করব।’