সেলুলাইটিস: একটি সাধারণ ত্বকের সংক্রমণ যা গুরুতর ক্ষতি করতে পারে

Spread the love

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন: সেলুলাইটিস সাধারণত ত্বকের গভীর স্তরের একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। এটি মূলত ডার্মিস ও সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাটকে আক্রান্ত করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি পায়ে দেখা যায়, তবে কখনও কখনও হাতেও হতে পারে। সেলুলাইটিসের প্রধান জীবাণু হলো Streptococcus pyogenes এবং Staphylococcus aureus। ত্বকের কোনো ক্ষত যেমন কাটা, কামড়, অস্ত্রোপচারের ক্ষত বা ফাটা ত্বকের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। হাসপাতাল পরিবেশে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াও সেলুলাইটিসের কারণ হতে পারে।

সেলুলাইটিস সাধারণত আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, ফোলা, উষ্ণতা ও ব্যথার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কখনও কখনও জ্বর হতে পারে, যা ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। আক্রান্ত ত্বক টানটান বা চকচকে দেখাতে পারে এবং কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে শরীরের অন্য অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। জটিল ক্ষেত্রে ফোঁড়া, লিম্ফ্যাংজাইটিস বা ত্বকে ফোসকা পড়তেও দেখা যায়।

কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কারণ সেলুলাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়। এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস মেলিটাস, দীর্ঘমেয়াদি এডিমা, স্থূলতা, পেরিফেরাল ভাসকুলার ডিজিজ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা। ত্বকের রোগ যেমন একজিমা, অ্যাথলিটস ফুট বা দীর্ঘস্থায়ী আলসার ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের সহজ পথ তৈরি করে। পূর্বে সেলুলাইটিস হওয়ার ইতিহাস থাকলেও পুনরায় সেলুলাইটিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সেলুলাইটিস প্রধানত রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ণয় করা হয়। সব ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না, তবে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বা সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন বেড়ে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থা বা সিস্টেমিক উপসর্গ থাকলে রক্তের কালচার করা হয়।

ইমেজিং পরীক্ষা সাধারণত প্রয়োজন হয় না, তবে যদি ফোঁড়া, গভীর সংক্রমণ বা ভিন্ন কোনো রোগের সন্দেহ থাকে, তখন এটি সহায়ক হতে পারে। ক্ষত থেকে সোয়াব নিয়ে কালচার ও অ্যান্টিবায়োটিক সেনসিটিভিটি টেস্ট করে কোন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হবে তা নির্ধারণ করা যায়।

সেলুলাইটিসের চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি। হালকা ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই চিকিৎসা করা যায়, যা সাধারণত গ্রাম-পজিটিভ জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর। যেমন পেনিসিলিন, তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোসপোরিন, ডক্সিসাইক্লিন, ক্লিন্ডামাইসিন, অ্যামোক্সিসিলিন, আজিথ্রোমাইসিন ইত্যাদি। মাঝারি থেকে গুরুতর ক্ষেত্রে শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ও হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে যদি সিস্টেমিক উপসর্গ, দ্রুত রোগের অগ্রগতি বা উল্লেখযোগ্য সহ-রোগ থাকে। সহায়ক চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে বিশ্রাম, ফোলা কমাতে আক্রান্ত অঙ্গ উঁচু করে রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণ। লালচে অংশের সীমানা চিহ্নিত করে রাখা হলে চিকিৎসার অগ্রগতি বোঝা সহজ হয়। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে উন্নতি দেখা যায়। উন্নতি না হলে রোগ নির্ণয়, অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন বা জটিলতা আছে কিনা তা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। কখনও কখনও সংক্রমিত স্থান পরিষ্কার করার জন্য অস্ত্রোপচারও প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসা না করলে বা যথাযথভাবে চিকিৎসা না হলে সেলুলাইটিস গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ফোঁড়া তৈরি, নেক্রোটাইজিং সফট টিস্যু ইনফেকশন, ব্যাকটেরেমিয়া, সেপসিস এবং দীর্ঘমেয়াদি লিম্ফোডিমা। বারবার সেলুলাইটিস হলে লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ফলে ভবিষ্যতে পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

প্রতিরোধের জন্য ত্বকের যত্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলোর নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক পরিষ্কার ও আর্দ্র রাখা, ছোটখাটো ক্ষত বা ফাঙ্গাল সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা এবং সুরক্ষামূলক জুতা ব্যবহার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। যাদের বারবার সেলুলাইটিস হয়, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে। সেলুলাইটিস একটি সাধারণ কিন্তু সম্ভাব্যভাবে গুরুতর ত্বকের সংক্রমণ, যার জন্য সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিকে ভালো ফল পাওয়া যায়, তবে চিকিৎসায় দেরি হলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। উপসর্গ সম্পর্কে সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও যথাযথ ব্যবস্থাপনাই ভালো ফলাফলের মূল চাবিকাঠি।

লেখকঃ

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
সেশন: ২০২০-২১
ব্যাচ: ইউএমসি ০৭
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ
ইমেইল: drmusabbir2000@gmail.com


Spread the love

Leave a Reply