হাসনাতকে ঘিরে লন্ডনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তান্ডব
বাংলা সংলাপ রিপোর্ট: জাতীয় নাগরিক পার্টি ( এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহর যুক্তরাজ্য সফরকে কেন্দ্র করে ফ্যাসিবাদের দোসর, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা লন্ডনে যে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও উগ্রতা দেখিয়েছে, তা সমগ্র ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও, আলীগ কর্মীদের এই কর্মসূচি কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত, বেপরোয়া এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
পূর্ব লন্ডনে হাসনাত আব্দুল্লাহর অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে আলীগের ক্যাডাররা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, তারা সমস্ত গণতান্ত্রিক ও সভ্য রীতিনীতিকে হার মানিয়েছে। ব্রিটিশ আইন প্রতিটি নাগরিককে শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক প্রতিবাদ কর্মসূচীর গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়। কিন্তু নিষিদ্ধ আলীগের এই কর্মসূচীগুলো ছিল ব্রিটিশ আইনের পরিপন্থী, সম্পূর্ণ উগ্রবাদী এবং সন্ত্রাসী প্রকৃতির। নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিতে তারা সাধারণ পথচারীদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত নোংরা ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ডিম নিক্ষেপ করে লন্ডনের রাস্তায় এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে।
এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহকে আওয়ামী লীগের লক্ষ্যবস্তু করার কারণ কী?
হাসনাত আবদুল্লাহ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারির সমন্বয়ক ছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে তার নেতৃত্ব ও আন্দোলন বড় ভূমিকা রেখেছিল। ফলে, ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি ক্ষোভ ও রাজনৈতিক আক্রোশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ।
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর হাসনাত আবদুল্লাহ এবং তার দল এনসিপি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোকে (যেমন ছাত্রলীগ) নিষিদ্ধ করার দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন. তাদের তীব্র চাপ ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণেই বাংলাদেশে সংগঠনটিকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, যা দলটির কর্মী-সমর্থকদের উসকে দিয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ নিজে প্রায়শই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগের “পালিয়ে থাকা” নেতা-কর্মীদের ব্যঙ্গ বা উপহাস করে বক্তব্য দেন। এমনকি লন্ডনের ঐ সভাতেও তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে প্রতীকীভাবে “ডিম উৎসর্গ” করেন। এই ধরণের কড়া রাজনৈতিক স্লেজিং বা উপহাসের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা জবাব হিসেবেই তার ওপর ডিম ছুড়ে মারার এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে ।
আওয়ামীপন্থী বিক্ষোভকারীদের এবং লন্ডন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে তাদের দলের নেতা-কর্মীদের ওপর যে মামলা, হামলা এবং “মব জাস্টিস” বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে হাসনাত আবদুল্লাহর পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ উসকানি রয়েছে. তারা একে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে এই তথাকথিত “গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ” গড়ে তোলার অজুহাত দেয়।

পূর্ব লন্ডনে কি ঘটেছিল
এনসিপি কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক ( দক্ষিনাঞ্চল) জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আব্দুল্লাহ সম্মানে আয়োজিত পূর্ব লন্ডনে মায়েদাগ্রীল বেনকুইটিং হলে শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানকে ঘিরে আওয়ামী সমর্থিত কিছু দুস্কৃতিকারী বিশৃংখূলা সৃষ্টি করে। তারা হাসনাত আব্দুল্লাহ সমাবেশ পন্ড করার ব্যাপক পায়তারা চালিয়ে পুলিশি বাধার মুখে ব্যর্থ হয়। এসময় পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতিতে হাসনাত আব্দুল্লাহ নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে সমাবেশে প্রবেশ করেন।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে থেকে হোয়াইটচ্যাপেল এবং পূর্ব লন্ডনের অন্যান্য স্থানে আওয়ামী লীগের কর্মীরা জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
মায়েদাগ্রীল বেনকুইটিং হলের বাইরে একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা লাউডস্পিকারে স্লোগান ও গালিগালাজ করতে থাকে, অন্যদিকে হলের ভেতরে ও আশেপাশে থাকা এনসিপি (NCP) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকরাও প্রতিবাদের মুখে পাল্টা স্লোগান দেয়।
আওয়ামীলীগ কর্মীরা হাসনাত আব্দুল্লাহকে না পেয়ে অনুষ্ঠানে আশা ডেলিগেটদের ওপর ডিম নিক্ষেপ করে। তারা ইস্ট লন্ডন মসজিদ লক্ষ করে ডিম নিক্ষেপ করে। আলীগের উচ্ছৃংখূল কর্মীরা পুলিশের ওপরও ডিম ছুড়ে। ঘটনাস্থল আলীগের দু কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এলম পার্ক এলাকায় কি ঘটেছিল?
সোমবার বিকেলে লন্ডনের রমফোর্ড এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ ও ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসময় কয়েকজন আওয়ামীলীগ কর্মী হাসনাত আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে তাকে লক্ষ করে ডিম ছুঁড়ে। উপস্থিত পথচারিদের একজন যুক্তরাজ্য আলীগের দপ্তর সম্পাদক শাহ শামীমকে আঘাত করেছেন এমনটা সোসিয়াল মিডিয়ার ভিডিওতে দেখা যায়।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে হাসনাতকে ঘিরে বিক্ষোভ
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন গত ১৪ই জুন ‘দ্য স্টুডেন্ট লেড আপরাইজিং অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ পোস্ট-রিভল্যিউশনারি বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এই অনুষ্ঠানেই বক্তব্য রেখেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, ডাকসুর ভিপি ও ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম, যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আলিয়ার হোসেন ও বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস।
এই অনুষ্ঠানের ঘোষণার পর থেকেই যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগের একদল সমর্থক সামাজিক মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে এবং তারা ১৪ই জুন অনুষ্ঠান চলাকালে অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে প্রতিবাদের কর্মসূচি ঘোষণা করে। তবে এনসিপি সমর্থক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কঠোর অবস্থানের ফলে নিষিদ্ধ আলীগ কর্মীরা সুবিধা করতে পারেনি। তবে তারা অশ্লিল ভাষায় হাসনাত আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ ও শ্লোগান দিয়েছেন সেখানে।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে হাসনাত আব্দুল্লাহর সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, সাবেক গুম কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আলিয়ার হোসেন যোগ দিয়েছিলেন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন জানিয়েছে, হাসনাত আব্দুল্লাহদের নিয়ে যেই অনুষ্ঠানটি হয়েছে সেটি অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজিত হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা সেখানকার কর্মী হিসেবে যারা নিবন্ধিত তারা এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ যা বলেছেন
পূর্ব লন্ডনের সভায় শুরুতে হাসনাত আব্দুল্লাহ আজকের অনুষ্ঠানে নিক্ষেপকৃত সকল ডিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীদের উৎসর্গ করে বক্তব্য শুরু করেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন এখানে প্রত্যেক মানুষ বাংলাদেশকে পছন্দ করে। ১৭ বছরেরও বেশি দিন থেকে বাংলাদেশ নামক দেশটি পরিচালিত হতো সীমান্তের ওপার ভারত থেকে । আমাকে অক্সফোর্ডে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আওমীলীগকে আর রাজনীতি করতে দেওয়া হবে কি না, আমি বলেছি এটা জনগন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ রাজনীতি করবে কি না। এই দলের নেত্রী ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। কোন রাজনৈতিক দল কখনও নিজ দেশের মানুষকে গুলি করে হত্যা করে না, যেটা আওয়ামীলীগ করেছে। জুলাই আন্দোলনে শিশু নারী বৃদ্ধ যুবক মাদ্রাসা কলেজের ছাত্র হিন্দু মুসলমান বাবা মারা সহ প্রত্যেক শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। আওয়ামীলীগ কাউকেই ছাড় দেয়নি তাদেরকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। আপনারা দেখেছেন হেলিকপ্টার থেকে শিশুদের ওপর গুলি করা হয়েছে। এই আন্দোলনে যারা আসছিল তাদের চাকরির কোন প্রয়োজন ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্থ থেকে যারা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল কেউ চাকরির জন্য করেনি। আপনারা প্রবাসীরা বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করেন বলে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। যার ফলে দিল্লি থেকে পরিচালিত একটি দলকে বাংলাদেশ থেকে পালাতে হয়েছে। আমি ইউকে এনসিপি ডায়াসপোরা ফোরাম সহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই যারা রেমিটেন্স বন্ধ সহ বিভিন্ন ভাবে এই আন্দোলনে আমাদেরকে সাপোর্ট দিয়েছেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন আমি যত জায়গায় গিয়েছি সবার আতিথেয়তা পেয়েছি। কেই আমার কাছে কিছু চায়নি। সবার একটি চাওয়া আমরা যখন বাংলাদেশে যাই এয়ারপোর্টে আমাদের সাথে এমনভাবে আচরণ করা হয় মনে হয় আমরা এদেশের মানুষ না। আমাদের সাথে চোর ডাকাতের মতো আচরণ করা হয়। হাসনাত বলেন এটা আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতা। আমাদের কাঠামোটা এভাবেই তৈরি করা হয়েছে যাদের পাওয়ার আছে তাদেরকে ভিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়, যারা বিদেশে টাকা পাচার করে বেগম পাড়া বানিয়েছে। তাদেরকে রাষ্ট্র পৃষ্টপোষকতা করে। আমাদের কাঠামোটা এমন যেখানে আপনাকে স্যার হইতে বাধ্য করা হবে। হাসনাত বলেন আমি যখন এয়ারপোর্টে আসলাম তখন আমাকে স্যার স্যার বলে তুলোধনি করলো। এর আগে যখন ডমেস্টিক ফ্লাইটে যেতাম তখন আমার সাথেও এরকম আচরন করা হতো না। হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রমিজ করে বলেন এখান থেকে যাওয়ার পর আমি আর কখনও ভিভিআইপি মর্যাদা নেব না, এটাই শেষ। যতদিন পর্যন্ত আমি সবার জন্য সমতা প্রতিষ্টা করতে না পারছি ততোদিন পর্যন্ত ভিভিআইপি সুবিধা নেব না। একই সাথে সকল বিমানবন্দরে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রদান এবং হয়রানী বন্ধ করা নিশ্চিত করবো।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন সিলেট বিমান বন্দরকে আধুনিকায়ন করা সহ পূর্নাজ্ঞ সুযোগ সুবিধা প্রদান, সিলেটের সাথে সকল যোগাযোগ আধুনিকায়নে আমি কথা বলবো।
হসাসনাত বলেন ৫৫ বছরের বাংলাদেশে মানুষের না পাওয়ার ক্ষোভ রয়েছে। আমরা চাই বাংলাদেশে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক যেখানে আপনারা স্বাধীনভাবে সব কিছু করতে পারেন। হাসনাত এনসিপিকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার আহবান জানান। তিনি বলেন বিদেশ যেন মানুষের স্বপ্ন না হয়। আমরা যাতে করে হাদী ভায়ের স্বপ্ন , আবরার ফাহাদ ও ফেলানিদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারি।

আয়োজকদের ত্রুটি
পূর্ব লন্ডনে হাসনাত আব্দুল্লাহর অনুষ্ঠানে চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাপক উত্তেজনা ও ৩ ঘণ্টার বিলম্বের ঘটনা ঘটেছে। আয়োজকদের দূরদর্শিতার অভাব এবং যথাযথ নিরাপত্তা পরিকল্পনা না থাকায় অনুষ্ঠানটি পণ্ড হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হাসনাত আব্দুল্লাহর যুক্তরাজ্য সফরে দুইটি পৃথক অনুষ্ঠানের সূচি ছিল। একটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংগঠন ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন’-এর বাংলা বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত। অন্যটি পূর্ব লন্ডনে আয়োজন করে ‘এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স’। অক্সফোর্ডের আয়োজনটি সফল হলেও পূর্ব লন্ডনের অনুষ্ঠানটিতে আয়োজকদের ব্যাপক গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পায়। সমালোচক ও সাধারণ প্রবাসীদের মতে, আয়োজকদের উচিত ছিল হাসনাত আব্দুল্লাহকে অনুষ্ঠান শুরুর নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই সভাস্থলে নিরাপদে নিয়ে আসা। অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল ৬টায়। ঠিক একই সময়ে সভাস্থলের বাইরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি ও বিক্ষোভ শুরু করে। আকস্মিক এই বিক্ষোভের কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ব্রিটিশ পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে হাসনাত আব্দুল্লাহকে সভাস্থলে আসার অনুমতি দেয়নি।দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা পর, পুলিশের একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী ও কঠোর পাহারার মাধ্যমে হাসনাত আব্দুল্লাহকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসা সম্ভব হয়।পুলিশের কঠোর তৎপরতার কারণে বিক্ষোভকারীরা কোনোভাবেই হাসনাত আব্দুল্লাহর সংস্পর্শে বা কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।সভাস্থলে ঢুকতে না পেরে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা চরম উগ্র আচরণ শুরু করে। তারা সেখানে উপস্থিত সাধারণ পথচারীদের লক্ষ্য করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ডিম নিক্ষেপ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।এই ঘটনার পর যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আয়োজকদের অপরিণামদর্শিতা এবং বিক্ষোভকারীদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে।
বিক্ষোভের আড়ালে ‘অ্যাসাইলাম’ পরিকল্পনা
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও পূর্ব লন্ডনে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উগ্র আচরণকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং আসল উদ্দেশ্য নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিক্ষোভের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে মূল ভূমিকা ছিল সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে পালিয়ে আসা সাবেক ছাত্র-যুবলীগ কর্মীদের। অক্সফোর্ড ও পূর্ব লন্ডনের কর্মসূচিতে যারা সবচেয়ে বেশি উগ্র ও সহিংস আচরণ করেছেন, তাদের বড় অংশই গত ৫ই আগস্ট (২০২৪) বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে আসা সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মী। যুক্তরাজ্যে আসা এই কর্মীদের একটি বিশাল অংশ বর্তমানে দেশটিতে বৈধ কোনো ভিসা ছাড়া সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বসবাস করছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসনাত আব্দুল্লাহর অনুষ্ঠানে এই বিক্ষোভ প্রদর্শন কেবল রাজনৈতিক আদর্শের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এরা সবাই ব্রিটিশ সরকারের কাছে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ বা অ্যাসাইলাম (Asylum) দাবি করেছেন। কিন্তু নিজেদের দাবির সপক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ বা ডকুমেন্টের অভাব ছিল তাদের। হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো জুলাই যোদ্ধা ব্যক্তিত্বের অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ করে তারা মূলত প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে তারা এখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং তাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় ধারণ করা নিজেদের ছবি এবং উগ্র আচরণের ভিডিও ফুটেজগুলো তারা যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হোম অফিসে (Home Office) জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, এই ভিডিওগুলোকে প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন (Asylum Grant) দ্রুত অনুমোদন করিয়ে নেওয়া।রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবাসীদের মতে, নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা এবং যুক্তরাজ্যে থাকার বৈধতা নিশ্চিত করতেই এই সাবেক ছাত্র-যুবলীগ কর্মীরা প্রবাসে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন উগ্র আচরণে লিপ্ত হয়েছেন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কী বলছে
ওদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েম অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণে লন্ডনে যাচ্ছেন এমন খবরে আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রচার প্রচারণা চলছিল।
এরপর একপক্ষ এটিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান, আর অন্য পক্ষ এর সাথে অক্সফোর্ডের কোনো সম্পর্ক নেই- এমন সব প্রচার শুরু করে। ফলে বিতর্ক শুরু হয় অক্সফোর্ড ইউনিয়ন নিয়েও। যদিও অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকা নাবিলা ইদ্রিস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, তাদের “অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আমন্ত্রণেই আমরা এসেছি,” বলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানটি নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন নিজেই জানিয়েছে, “অক্সফোর্ড ইউনিয়ন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত নয়। তবে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সদস্য হতে হলে কোনো না কোনো সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা কর্মী হিসেবে নিবন্ধিত থাকতে হয়। এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না; এটি শিক্ষার্থীদের দ্বারাই আয়োজিত হয়েছিল”।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ডিরেক্টর অফ প্রেস তার ই-মেইলে জানান, “১৪ই জুনের অনুষ্ঠানটি অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজিত হয়, যা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন”।
অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সাবেক সভাপতি আহমেদ মুহতাদি অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সদস্য। তিনি ওই অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
“যখন আমার এক বন্ধু প্রথম আমাকে জানায় যে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন জুলাই বিপ্লব নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে আগ্রহী এবং আন্দোলনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে আমন্ত্রণ জানাতে চায়, তখন আমি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুবই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। একই সঙ্গে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম যে সাধারণ শিক্ষার্থীসমাজও এই বিষয়টির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মুহতাদি।
“তাই আমি উদ্যোগ নিয়ে অনুষ্ঠানটিকে অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির সহযোগিতায় আয়োজনের ব্যবস্থা করি, যাতে এর সদস্যরা- অর্থাৎ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বা কর্মরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদরা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন এবং জুলাই বিপ্লব ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান।”
যদিও এই অনুষ্ঠানটিকে একপক্ষীয় দাবি করে আগেই অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সাথে কথা বলে আলোচনায় তাদেরও অংশ নেওয়ার সুযোগ দাবি করেছিলেন বলে জানিয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির একজন সদস্য সুশান্ত দাশ গুপ্ত।
“আমরা তাদের বৈঠকও করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম তোমরা রিভিউ করো কিংবা আমাদের অন্তর্ভুক্ত করো যাতে সবাই কথা বলার সুযোগ পায়। তারপরেও তারা একপক্ষীয় অনুষ্ঠান করায় আমরা যুক্তরাজ্যের চ্যারিটি কমিশনে আপত্তি জানিয়ে আবেদন করেছি। ২৮ দিনের মধ্যে তাদের এটি নিষ্পত্তি করার কথা রয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. গুপ্ত।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন অবশ্য বিবিসি বাংলাকে ই-মেইলে জানিয়েছে, “মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের বিপ্লবকে বিশ্লেষণধর্মী ও ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা। এ লক্ষ্যে, রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি বর্তমান শাসক দলের নীতি প্রণয়ন এবং পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডে অবদান রাখা খ্যাতিমান শিক্ষাবিদদের একত্রিত করা হয়। এর মাধ্যমে আলোচনায় যেমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তেমনি কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণও স্থান পেয়েছে”।
এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স:
সংগঠনটি এই ঘটনাকে আওয়ামী লীগের “কাপুরুষোচিত ও পূর্বপরিকল্পিত উসকানি” বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বিবৃতিতে উল্লেখ করে যে, আওয়ামী লীগ এখনও তাদের ভয়ভীতি ও পরমতসহিষ্ণুতার রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি, যা তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ:
দলটির আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি ছিল না দাবি করে সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জানান যে, এই বিক্ষোভ দলীয়ভাবে ডাকা হয়নি। তিনি এটিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙার প্রতিবাদে সাধারণ প্রবাসী যুবসমাজ ও ছাত্রদের “স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ” হিসেবে বর্ণনা করেন।