এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা জালে এয়ার টিকিট সিন্ডিকেট
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা জালের আওতায় আনা হয়েছে এয়ার টিকিট সিন্ডিকেকে। বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রিতে যেসব সেলস এজেন্ট ও ট্রাভেল এজেন্ট রয়েছে, সেগুলোর আয়কর নথিসহ ব্যাংক হিসাব যাচাই শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক তথ্য যাচাইয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকিসহ বেশকিছু অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা ইউনিটের বিশ্বস্ত সূত্র আমার দেশকে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানায়, এয়ার টিকিট বিক্রিতে যেসব সেলস এবং ট্রাভেল এজেন্ট রয়েছে, তাদের মধ্যে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের আয়কর নথি যাছাই করা হচ্ছে। এজন্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে বেশকিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে।
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইনসের টিকিটের দর কয়েকগুণ বাড়িয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সেলস এজেন্ট ও ট্রাভেল এজেন্টগুলোর বিরুদ্ধে। এ কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ দরে টিকিট কিনতে হয় ক্রেতাদের। বিশেষ করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশে শ্রমিকরা কাজ করতে যান, তাদের বাড়তি দামে টিকিট কিনতে হয়। আবার হজের সময়ও টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে হজগমনেচ্ছুদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করে তারা। সিন্ডিকেট তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরেই তারা অর্থ আদায় করলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে অন্তবর্তী সরকারের উদ্যোগের কারণে সম্প্রতি বিমানের টিকিটের দর ৭৫ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রুপ বুকিং স্কিমের অধীনে টিকিটের দাম এক লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। এখন ভাড়া ৪৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায় কমেছে। এমনকি কিছু বিমান সংস্থা ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদের মতো রুটে টিকিট ভাড়া কমিয়ে ৩৫ হাজার টাকায় দিচ্ছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি টিকিট বুকিংয়ে কঠোর নিয়মকানুন জারি করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। নতুন নিয়ম অনুসারে এখন থেকে অবশ্যই যাত্রীর নাম, পাসপোর্টের বিবরণ ও পাসপোর্টের একটি ফটোকপি দিয়ে বিমানের টিকিট বুকিং করতে হবে। এ নির্দেশনার পর বিমান সংস্থাগুলো পূর্বে ব্লক করা টিকিট প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে টিকিটের প্রাপ্যতার সঠিক চিত্র সামনে উঠে আসায় এজেন্সিগুলো টিকিটের দাম কমাতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা তৎপরতা টিকিটের দর কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমান ছাড়া যেসব এয়ারলাইনস যাত্রী পরিবহন করে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ সৌদিয়া, কাতার, ওমান, সালাম, এমিরেটস, মালয়েশিয়ান, গালফ এয়ার, এয়ার আরাবিয়া, জাজিরা এয়ারওয়েজ, ফ্লাইনাস, ফ্লাই দুবাই এয়ারলাইনস। এসব এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রিতে নিয়োজিত থাকে জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ)। এয়ারলাইনসগুলো তাদের বিক্রয়যোগ্য টিকিট সেলস এজেন্টদের দেয়। সেলস এজেন্টগুলো আবার ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ক্রেতার কাছে টিকিট বিক্রি করে। ট্রাভেল এজেন্টগুলোর আবার সাব-এজেন্ট থাকে।
সেলস এবং ট্রাভেল এজেন্টগুলোই টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে। আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট বেশ কয়েকটি সেলস ও ট্রাভেল এজেন্সির তালিকা তৈরি করে সেগুলোর কার্যক্রম খতিয়ে দেখছে। সেলস এজেন্টগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ইউনাইটেড লিংক, এয়ার গ্যালাক্সি, এরো উইং, অ্যারো উইং, অ্যারোস্পিডি ইন্টারন্যাশনাল, আরএসএ অ্যাভিয়েশন, অরিক্স অ্যাভিয়েশন, জেড অ্যাভিয়েশন, স্কাই অ্যাভিয়েশন, ওয়ান ওয়ার্ল্ড অ্যাভিয়েশন। ইতোমধ্যে ইউনাইটেড লিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ ও তার স্ত্রী মেরিনা আহমেদের আয়কর নথিতে বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে আয়কর তদন্ত ইউনিট। তাদের নামে গুলশানে ৬০ কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট খুঁজে পেয়েছে, যদিও তারা আয়কর নথিতে এর মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র সাত কোটি টাকা। এজন্য এ দম্পত্তির ব্যাংকের তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে আয়কর তথ্য যাচাই করতে ৩০টি ট্রাভেল এজেন্সির একটি তালিকা তৈরি করেছে গোয়েন্দা ইউনিট। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এজেন্সিগুলো হলোÑ কাজী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, কিং এয়ার অ্যাভিয়েশন, আরবিসি ইন্টারন্যাশনাল, সাদিয়া ট্রাভেলস, হাজী এয়ার ট্রাভেলস, ব্যালেন্স এয়ার ট্রাভেলস, ডাইনেস্টি ট্রাভেলস।
আয়কর গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এয়ার টিকিট বিক্রির এসব প্রতিনিধি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। কিন্তু এদের অধিকাংশই সঠিক আয়কর না দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন। রাজস্ব ফাঁকি রোধ করার পাশাপাশি এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এয়ার টিকিটের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে বেশকিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের পক্ষ থেকে সিভিল অ্যাভিয়েশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ তিন মাস অন্তর বাংলাদেশ বিমানের টিকিটের ট্যারিফ ভ্যালু সিভিল অ্যাভিয়েশনের কাছে দাখিল করা। যেহেতু অন্যান্য এয়ার লাইনস বাংলাদেশ বিমানের টিকিটের ট্যারিফের সঙ্গে তুলনা করে নির্ধারণ করে, সেজন্য বিমানের টিকিটের ট্যারিফ যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে; সেটি নিশ্চিত করা। যেসব দেশে যাত্রী বেশি, সেসব দেশে ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, জেদ্দাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ফ্লাইট বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা।
যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স জোগান দিচ্ছেন তারা যাতে সুলভ মূল্যে টিকিট ক্রয় করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।