কোটা পদ্ধতি: অসাংবিধানিক ও বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ

Spread the love

গত ২০১৮ সালে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য দেশের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, বেকার, সচেতন ও কল্যানকামী মানুষ রাস্তায় নেমেছিল ১৯৭২ সাল থেকে বংশপরম্পরায় চলমান কোটা পদ্ধতির সংস্কারের জন্য।তাদের আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হলেন এবং তিনি আন্দোলনকারীদেরকে আস্বস্ত করেছিলেন যে বাংলাদেশে আর কোটা পদ্ধতি থাকবে না। কিন্তু কাদের মদদে এবং কাদের দুঃসাহসে আবার কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল বা চালু করার পায়তারা চলছে তা খতিয়ে দেখার বিষয়।

কোটা পদ্ধতির সংস্কারের জন্য গত কয়েকদিন ধরে আবারোও হাজার হাজার শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং যারা চাকরি খুঁজছেন তারা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এই কোটা পদ্ধতির সংস্কারের ফের দাবি তোলেন। পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড বহন করে বিক্ষোভকারীরা মানববন্ধন করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ বাধা দেয়। অন্যদিকে কোটা পদ্ধতির সুবিধাভোগীরা বিশেষকরে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সুবিধাভোগীরা তাদের তৎপরতা দেখাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে কোটা পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষে সংঘর্ষ হলেও তা দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে কোটা সংস্কারের আন্দোলন। অন্যদিকে, ইতিমধ্যে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবি রত আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে গ্রেপ্তার ও মামলা প্রক্রিয়া চলমান করা হচ্ছে।

পিছিয়ে পড়া বা সুবিধা বঞ্চিত লোকদের সরকারি চাকরিতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বা সুবিধার্থে ১৯৭২ সালে একটি এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত মাত্র ২০ শতাংশ বেসামরিক কর্মকর্তা বা সাধারণ নাগরিককে মেধার ভিত্তিতে আর ৮০ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হতো কোটার ভিত্তিতে। পর্ববর্তীতে ১৯৭৬ সালে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশতে উন্নতি করা হয় যা ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত চলমান ছিলো। এরপরে ১৯৮৫ সাল থেকে কিছুটা বাড়িয়ে মেধারভিত্তিতে নিয়োগ ৪৪ শতাংশতে উন্নীত করা হয় যা আজ অব্দি চলমান। অর্থাৎ বাংলাদেশে নিয়োগ পরীক্ষায় বাকি ৫৬ শতাংশ হয়ে থাকে বিভিন্ন কোটার ভিত্তিতে। এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের ৩০%, মহিলাদের জন্য ১০%, জেলাগুলোর জন্য ১০%, অধিবাসীদের জন্য ৫% এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১% বরাদ্দ দেয়া হয়।এই পদ্ধতির আবারো সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটাকে আরো বর্ধিতকরে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিদের পর্যন্ত দেওয়া হয় ১৯৯৭ সালে এবং ২০১০ সালে যা আজ পর্যন্ত চলমান। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অন্যতম আপত্তি হলো এই মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি পর্যন্ত কোটা বর্ধিতকরণ এবং তা চলমান রাখা যা বর্তমান সময়ের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান ও ত্রুটিপূর্ণ।

কোটা পদ্ধতির নিয়ে সমালোচনা কিন্তু কম হয়নি, তবে কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে তাদেরকে নিজ দলে আঁকড়ে রাখতে এই পদ্ধতিকে আজও পর্যন্ত বন্ধ করেনি।একটু মাথা খাটালে দেখবেন যে এই মুহূর্তে কোনো মুক্তিযোদ্ধাই চাকরি করার বয়সে নেই, আর তাদের সন্তানরাও নতুন চাকরি পাওয়ার বয়সও পার করে ফেলেছে আছে শুধু তাদের নাতি-পুতিরা।দাদা যুদ্ধ করেছিলো বলে কি তারা সারাজীবন কোটা সুবিধা পাবে? পৃথিবীর অনেক দেশে অনেক সাধারণ নাগরিক রাষ্ট্রের কল্যানে বা রক্ষায় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্র তাদেরকে সম্মানিত করে বা বিভিন্ন দিবসে স্মরণ করে কিন্তু তাদের নাতিপুতিদেরকে কোনো এক্সট্রা সুবিধা দেয় না। যেমন-২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটেনে যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলো রাষ্ট্র তাদেরকে নভেম্বর মাসের প্রথম রবিবারে স্মরণ করে, পুষ্পস্তবক দেয়, এক মিনিট নীরবতা পালন করে।এখানেই শেষ। কোনো বাড়াবাড়ি নেই, অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নেই বা তাদের বংশধর/নাতি-পুতিরাও কোনো সুবিধা পায়না।

বিশিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধারাও কোটা পদ্ধতি নিয়ে তুমুল সমালোচনা করেছেন এর মধ্যে ডক্টর আকবর আলী খান, ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ডা. রিজওয়ান খায়ের, ডা. মহব্বত খান, অধ্যাপক মাহফুজুল হক, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো বিশিষ্ঠজনেরা কোটা পদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করলেও সরকার কর্ণপাত করেনি।তাদের মতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-পুতিদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অব্যাহত রাখার বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত, নৈতিকতা বিবর্জিত এবং সংবিধান পরিপন্থী।কোটা ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ ও ২৯ অনুচ্ছেদের, Universal Declaration of Human Rights, এবং European Convention on Human Rights (ECHR) মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান কি বলে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ ও ২৯ অনুচ্ছেদে প্রতি নাগরিকের সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
ধারা-১৯: সুযোগের সমতা
১৯(১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন৷
(২) মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
(৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবেন।

ধারা-২৯: সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা
২৯(১) প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে চাকরি নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে।
(২) শুধুমাত্র ধর্ম, বর্ণ, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে কোন চাকরি বা পদের জন্য অযোগ্য বা বৈষম্যের শিকার হবেন না।কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।

Universal Declaration of Human Rights বা সার্বজনীন মানবাধিকার সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের একটি স্বাক্ষরকারী দেশ।এই ঘোষণাপত্রের
অনুচ্ছেদ-১: সমস্ত মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং মর্যাদা ও অধিকারের দিক দিয়ে প্রত্যেকেই সমান।

অনুচ্ছেদ-২: জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক বা অন্যান্য মতামত, জাতীয় বা সামাজিক উৎপত্তি, সম্পত্তি, জন্ম বা অন্যান্য অবস্থার মধ্যে কোনো প্রকার ভেদাভেদ ছাড়াই এই ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত সমস্ত অধিকার ও স্বাধীনতার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।

আমরা এবার একটু দেখে নেই ECHR মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রে কি বলে।

ECHR এর অনুচ্ছেদ-১: মানবাধিকার নিশ্চিত করা প্রতিটি রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা

ধারা-১: ECHR এ স্বাক্ষরকারী প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের এখতিয়ারের মধ্যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ECHR এর ১ অনুচ্ছেদে সংজ্ঞায়িত অধিকার এবং স্বাধীনতা সুরক্ষিত করবে৷

“অধিকার” একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত শব্দ যা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে যে প্রত্যেকেরই কর্মসংস্থানের অধিকার রয়েছে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অংশের কারণে কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না। সকল কর্মে সকলের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আবার যদি চিন্তা করি তাহলে ইসলামিক দৃষ্টকোণ থেকেও কোটা পদ্ধতি ত্রুটি পূর্ণ।নবী কারীম (সা) তার বিদায়ী হ্বজের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে-কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের; কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের, এমনিভাবে শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এই বক্তব্যের সারমর্ম হলো কোনো শ্রেণীবিভাজন নেই, কেউ কারো উপর অগ্রাধিকার পাবে না শুধুমাত্র তাকওয়া অবলম্বন ব্যাতিত।

এবার আপনি বলুনতো বর্তমান কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে সরকরি চাকরি, বিসিএস, বা অন্যান্য ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিদের যে প্রাধান্য দেওয়া হয় বা অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তা বাংলাদেশের সংবিধানসহ আন্তর্জাতিক, মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সমর্থন করে না।বরং এটি অসাংবিধানিক, বাংলাদেশ সংবিধানের পরিপন্থী।

কোটা পদ্ধতির নেতিবাচক দিক তুলে ধরে মুক্তিযোদ্ধা ডক্টর আকবর আলী চমৎকারভাবে বলেছেন-চাকরীপ্রার্থীরা দুই-তিন বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরও যখন চাকরি পায় না তখন এটা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই না।যতক্ষণ না এই ব্যবস্থাটির বা কোটা পদ্ধতির সহনীয় রূপে পরিবর্তিত হবে ততক্ষণ জাতি হিসেবে আমরা ভুল পথেই এগোতে থাকব।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন যে দেশের চাকরিতে মেধাবী প্রার্থীদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে সরকারি চাকরির স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া মেনে চলা উচিত।কিন্তু তা না হলে দীর্ঘ সময়ে দেশকে ভুগতে হবে।

আমরা যদি বর্তমান কোটা পদ্ধতিকে একটু বিশ্লেষণ করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে-পিছিয়ে পড়া মানুষের অবস্থান সমুন্নত ও সুদৃঢ় করার জন্য যে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রয়োজন, তা বর্তমান কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রকৃত চিত্রকে তুলে ধরা যায় না বা তাদের সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং এটি দিবালোকেরমতো স্পষ্ট যে কোটা পদ্ধতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের সিভিল সার্ভিস/পাবলিক চাকুরীতে যোগদানের জন্য একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবেগের বশবর্তী না হয়ে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক পদে/চাকরিতে বসানো দরকার, কিন্তু, বর্তমান কোটা পদ্ধতির কারণে, সঠিক, মেধাবী, চৌকষ, ডাইনামিক প্রার্থী অনেক ক্ষেত্রে চাকরি বঞ্চিত হয়। ফলে, যা হবার তাই হচ্ছে। কোটা পদ্ধতির কারণে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ক্রমশ বেড়েই চলছে। অন্যদিকে, যোগ্য ও মেধাবীরা যদি চাকরি বঞ্চিত হয় তাহলে প্রশাসনিক অদক্ষতা তৈরি হবে, পেশাগত উন্নতি কমে যাবে, পেশাগত শ্রেষ্ঠত্ব ধীর হয়ে পরবে। কোটা পদ্ধতি একটি মানুষের কর্মক্ষমতা, সম্ভাবনা, সামর্থ্যকে অবমূল্যায়ন ও বৈষম্য তৈরী করে একটি গোষ্ঠীর সাথে বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্র ও পারস্পরিক অবমূল্যায়নের ক্ষেত্র তৈরী করবে। কোটা পদ্ধতি প্রকৃত মেধাবীকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে, ব্রেন ড্রেন হয়ে থাকে যা আজকে শিক্ষিত তরুণ কর্মক্ষমদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তারা আজ দলে দলে দেশ ছাড়ছে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হবে এবং দেশ মেধাবীদের কাছ থেকে সেবা বঞ্চিত হবে, ক্ষতিগ্রস্থ হবে, দেশ মেধাবী কর্মকর্তার অভাবের সম্মুখীন হবে, এবং এটি পেশাগত অক্ষমতার সমস্যা তৈরি হবে। রাজনৈতিক দল, বিশেষকরে ক্ষমতাসীন দল, তাদের অঙ্গসংগঠন এবং স্বার্থান্বেষী মহল কোটা পদ্ধতির অপব্যবহার করে এবং অযোগ্যদেরকে রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারী চাকরিতে সুযোগ দিয়ে সমাজে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করবে। ফলশ্রুতিতে সময়মত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দেশ সঠিক ব্যক্তি পাবে না এবং তাই দেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি বাড়বে; সরকার ভুল পথে পরিচালিত হলেও তাদেরকে সঠিক পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। কোটা সুবিধাভোগীরা কখনো সরকারের সমালোচনা করতে পারবে না বরং সরকারকে তোষামোদি করে ভুল পথে পরিচালিত করবে।কোটা পদ্ধতি মেধাবীদের প্রতি বড় অন্যায়, ও অবিচার, এটি দেশের জন্য অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোটা পদ্ধতি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা নিতে আগ্রহী করে বা লোভী বানিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান করছে। আজকে দেখেন দেশে ভাতা গ্রহীতা মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কত, এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।

বর্তমান কোটা পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, ECHR এবং বাংলাদেশ সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। সকল নাগরিকের সমানাধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা এখন সময়ের ও জাতীয় দাবীতে পরিণত হয়েছে।একবিংশ শতকে এসে এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটার সুবিধা পেতে পারেনা বরং বর্তমান বিশ্বের নীতি হচ্ছে যোগ্যরাই টিকে থাকবে, মেধার মূল্যায়ন করতে হবে, মেধাবীকে তার প্রাপ্য দিতে হবে তাহলেই একটি দেশ উন্নত হতে পারে।তবে দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্য এবং পৃথিবীর যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ শতাংশ, পিছিয়ে পড়া নারীদেরকে উদ্যেগী করার জন্য ৩ শতাংশ এবং উপজাতিদের জন্য ২ শতাংশ কোটা বিবেচনা করা যেতে পারে।এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব শুধু কোটা সুবিধা দিয়েই শেষ হয়ে যায় না; বরং, সামগ্রিক একাডেমিক মান উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার, কম্পিটিটিভ নাগরিক গড়ে তোলার জন্য, বিদেশে যোগ্য নাগরিক রপ্তানির জন্য, অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার যাতে শিক্ষার্থীরা উজ্জ্বল গুণাবলীতে সজ্জিত হয় এবং কোটার সুবিধার উপর নির্ভর না করে বরং নিজেদেরকে পৃথিবীর যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে উদ্যমী হয়ে উঠে।

নারীরা আজ পিছিয়ে নেই, তারাও পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে চায়, অযাচিত সুবিধা তাদের আত্মসম্মানে লাগে, তাই, নারী সামজও এই কোটা বিরোধী আওয়াজ তুলেছে, তারাও কোটার সুবিধা নিতে চায়না, বরং তারা তাদের যোগ্যতা দিয়েই তাদের প্রাপ্যতা বুঝে নিতে চায়। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি আছে তারাও এই কোটা পদ্ধতির বিরোধিতা করছে যে একটি গোষ্ঠীতে যুগের পর যুগ এইভাবে সুবিধা দেওয়া যেমন অন্যায় ঠিক তেমনি অন্য একটি পক্ষকে সুবিধা বঞ্চিত করা কোনো স্বাধীন দেশের নীতি হতে পারেনা।

গবেষণায় দেখা যায় কোটা ব্যবস্থা অতীতে কয়েকটি দেশে একটি নির্দিষ্ট কারণে ও একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জন্য বিদ্যমান ছিলো। যখন সেই নির্দিষ্ট সময় ও কারণের অবসান ঘটেছে, তখন কোটা সুবিধা তুলে নেওয়া হয়েছে, যেমন নেপাল। একইভাবে, বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে কোটা পদ্ধতি চালু হয়েছে কিন্তু তা চলমান যা কোনোভাবেই কাম্য নয়, বরং এটি সংবিধান পরিপন্থী। যোগ্য ও মানবীয় গুনে গুনান্নিত, সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, নাতি-পুতিরা এই কোটা পদ্ধতির সুবিধা নিতে চায় না, এটি তাদের সম্মানে লাগে, এটিকে তারা অনেকেই ভিক্ষার সাথে তুলনা করেছে। বরং তারা তাদের যোগ্যতা দিয়েই নিজ নিজ অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে।

পরিশেষে, আগামীর যোগ্য নাগরিক এবং দেশের সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে এই কোটা পদ্ধতির বিলুপ্তি এখন জাতীয় ও সময়ের দাবি।কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই বিষয়টি দেখবেন।

লেখকঃ ব্যারিষ্টার ওয়াহিদ মুহাম্মদ মাহবুব
০৭ জুলাই ২০২৪, লন্ডন।


Spread the love

Leave a Reply