বাংলাদেশের উপর ভারতের আগ্রাসনের শেষ কোথায়

Spread the love

আমাদেরকে সব সময় শুনানো হয়েছে বা বুঝানো হয়েছে যে বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানিদের অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, শাসন ও শোষণের কথা। পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করেছিল ১৯৪৮ সালে আর বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে, অর্থাৎ বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানের শাসন ও কর্তৃত্ব ছিল মাত্র ২৩ বছরের। অত্যান্ত সুকৌশলে ব্রিটিশদের শাসন, শোষণ, লুটপাট, নির্যতন, শিক্ষা, অর্থনীতি, সঙ্গস্কৃতির ধ্বংস ও আগ্রাসনের কথা আমাদেরকে বেমালুম ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশরা এই বাংলাদেশের তাদের শাসন ও শোষণ শুরু করেছিল ১৭৩০ সালের দিকে তা অব্যাহত ছিল প্রায় ২০০ বছর। ঠিক তেমনিভাবে ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, প্রায় ৫৩ বছর ধরে ভারত অব্যাহত ও ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের উপর তাদের আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা তা নিয়ে কোনো কথা বলার সাহস যেন হারিয়ে ফেলেছি অথবা তাদের আগ্রাসনের কথা যেন আমাদের গাসহা হয়ে পড়েছে। আমাদের শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকরাও এই বিষয়ে কোনো কথা বলেন না বা বলতে দেয়া হয় না বা বলতে চাননা এই ভেবে যে ভাসুরের নাম মুখে নিতে হয় না। আমরা আছি শুধু পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসন ও শোষণ নিয়ে। ভারতের শোষন ও আগ্রাসনের মাত্রা যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের আমলেই বেশি হয়েছে। ভারতের আগ্রাসন আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হুমকি স্বরূপ। এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি, প্রতিটি সচেতন ও দেশ প্রেমিক নাগরিককে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা, লিখা, সচতনা তৈরী করা ঈমানী দায়িত্ব, আর আমরা যদি তা না করি বা করতে পারি, তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদেরকেই আসামির কাঠ গড়ায় দাঁড় করাবে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ভারত প্রেম ও ভারত তুষ্টির যে অন্যায় ও দেশ বিরোধী নীতি হাতে নিয়েছে তা লেন্দুপ দর্জির মতোই ইতিহাসের কালো অধ্যায় রচনার জন্য দায়ী থাকবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারকে ঘৃণার চোখেই দেখবেই না, ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে।

অখন্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন জওহরলাল নেহেরু, তিনি ছোট দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে ছোট ছোট দেশে গুলো বড় দেশের মধ্যে অর্থাৎ ভারতের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। সারাজীবন তিনি সেই অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন। তার কন্যা ইন্দ্রিয়া গান্ধীও সেই একই স্বপ্নে বিভোর ছিলেন।আপনাদের মনে থাকার কথা যে ইটালিয় সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির ইন্টারভিউ উইথ হিষ্টরী গ্রন্থের কথা।ওরিয়ানা এক সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধীকে প্রশ্ন করেছিলো- আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ আপনার কাঙ্খিত মিত্র হবে। ইন্দিরা গান্ধী উত্তর দিয়েছিলেন-বাংলাদেশ ও আমাদের বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। অবশ্য একতরফা বন্ধুত্ব হবে না। প্রত্যেকেরই কিছু নেওয়া-দেয়ার থাকে, তবে আমরা আমরা পাওয়ার ব্যাপারে সব সময়ই সচেষ্ট থাকি।

জওহরলাল নেহেরুর প্রচলিত ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিন’, যা নেহেরু ডকট্রিনের কথা আমার কম বেশি সত্যি জানি। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইতে তার এই ডক্ট্রিনের কথা বলা হয়, যার মূল কথা ছিল ‘অখন্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি তার মেয়ে ইন্দ্রিয়া গান্ধীকে যে চিঠি গুলো লিখেছিলেন তারই সংকলন হয়েছে গ্লিপমস অফ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি নামক বই যেখানে তিনি তার মেয়েকে রাজনীতি ও বিশ্ব ইতিহাস শেখাতে গিয়ে অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্রও শিখিয়েছিলেন। অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠার স্বরূপ উম্মোচিত হয় কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, সিকিম, নেপাল, শ্রীলংকার তামিল টাইগার বিদ্রোহ, মালদ্বীপ, ভুটান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে বাংলাদেশের ঘাড় মটকানোর মধ্য দিয়ে ইন্ডিয়া ডকট্রিনের আসল চিত্র ফুটে উঠে।

গত ৫৩ বছর ধরে বাংলাদেশের উপর ভারতের চলমান আগ্রাসনের কিছু নমুনা নিচে তুলে ধরলাম;
১. ব্রিটিশ গার্ডিয়ান পত্রিকার রিপোর্ট অনুসারে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের থেকে ১৯৭২ সালে ভারত যে পরিমান লুটপাট করেছিল তার ওই সময়কার মূল্য ছিল প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার। ভারতের লুটপাটের বিশাল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বিভিন্ন পত্রিকা ও বই পুস্তকে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তারা যে সমস্ত জিনিস লুটপাট করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো মেশিনারিজ, অস্র, ট্যাংক, পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া অস্র, কামান, গলা বারুদ, পাট, সুতা, সমুদ্রগামী জাহাজ, খাদ্য শস্য থেকে শুরু করে টিভি, ভিসিপি, টুইন ওয়ান, ফ্রিজ এমনকি টয়লেটের আয়না ও ফিটিংস পর্যন্ত লুটপাট করেছিল। তৎকালীন সরকার ভারতের এই লুপাটের কোনো বিরোধিতা করেনি। মেজর জলিল এই লুটপাটের বিরোধিতা করলে তার বিরুদ্ধে তৎকালীন ব্যাবস্থা নিয়েছিলো।
২. ভারত ১৯৭১ সালে যত সামান্য সহযোগিতা করেছিলো এ উদ্দেশ্যে যাতে তারা বাংলাদেশের উপর কর্তৃত্ব বহাল রাখতে পারে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে নামকাওয়াস্তে যে সহযোগিতা করেছিলো তার চেয়ে বেশি লুটপাট করেই খ্যান্ত হয়নি বরং বাংলাদেশকে বেঁধে ফেলে ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি দিয়ে। নিশ্চয়ই আপনাদের সেই গোলামী চুক্তির কথা মনে আছে। বর্তমান আওয়ামী সরকার এই গোলামী চুক্তির কথা বলে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিলো।

৩. ভারত গত ৫৩ বছরেও বাংলাদেশকে তিস্তার পানি বন্টনের ন্যায্য হিস্যা দেয়নি। বরং বর্ষার মৌসুমে তিস্তার পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বন্যার পানিতে চুবায়া মারে আর গৃষ্মের সময়ে মরুভুমি বানিয়ে সমস্ত ফসলকে ধ্বংস করে ভারত নির্ভরশীল করে তুলছে।টিপাইমুখসহ উজানের নদীগুলোর পানি নিয়ে প্রভুত্ব কায়েম করছে ভারত অন্যায় ভাবে, এবং এটি চলমান। পানি বন্টনের ক্ষেত্রে ক্রমাগত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেই চলছে ভারত।
৪. ভারত বাংলাদেশকে তাদের বাজারে পরিণত করেছে। ভারতের তাদের প্রায় ৩৬০টি পণ্য বাংলাদেশে বাজারজাত করেছে এবং এর মধ্যে প্রায় ১৩৫টির মতো প্রায় শুল্ক মুক্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৩৬টি পণ্য ভারতে বাজারজাত করার সুযোগ রয়েছে। যদিও বর্তমান সরকার ২০১৫ সাল থেকে ভারতের নিকট করজোড়ে আবদার, অনুনয়, বিনিয়, করছে যে আরো ২০টি পণ্য ভারতের বাজারজাত করার জন্য। বাংলাদেশের নতজানু বিদেশনীতি ও ভারতের উপর নির্ভরশীলতার জন্য ভারত বাংলাদেশকে আরো বেশি পণ্য রপ্তানি করার সুযোগ দিচ্ছে না। বরং তারা বাংলাদেশকে বাজারে পরিণত করেছে।
৫. ভারতের তৃতীয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশ হলো বাংলাদেশ। অর্থাৎ ভারত বিদেশ থেকে যে পরিমান রেমিট্যান্স আমদানি করে তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ভারতের প্রায় ১৫ লক্ষ লোক বাংলাদেশে কর্মরত। তারা অধিক মূল্যে বেতন নিয়ে আংলাদেশকে ফতুর করছে। আপনি, আমি যে ট্যাক্স, ভ্যাট ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশে প্রেরণ করি, তারই সিংহভাগ চলে যাচ্ছে ভারতের পকেটে।
৬. বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করছে। বাংলাদেশে কর্মরত ভারতের নাগরিকের সিংহভাগ লোকই কাজ করছে গার্মেন্টস শিল্পে। তারা গার্মেন্টস শিল্পের তথ্য পাচার করে এই শিল্পকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এর ফলাফল পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে।
৭. শিক্ষিত ও ডাইনামিক ছেলেদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। আমার দেশের ছেলেরা দেশে কাজ পায়না অথচ ভারতীয়রা বিনা বিঘ্নে বাংলাদেশে কাজ করে আমার দেশের টাকা নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত ও ডাইনামিক ছেলেরা কাজ না পেয়ে হতাস হয়ে দলে দলে দেশ ছাড়ছে, আর অবারিত সুযোগ তৈরী হচ্ছে ভারতের জন্য।
৮. সীমান্ত হত্যা চলছেতো চলছেই। কত পতাকা বৈঠক, শান্তি বৈঠক, দ্বিপাক্ষীয় বৈঠক, মিষ্টি বিতরণ হলেও ভারতের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যান্তরে প্রবেশ করে গরু ছাগলের মতোই বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করছে।কতটা নরপশুর হলে ফেলানিকে হত্যা করে তার লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখতে পারে।ফেলানির লাশকে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখে বাংলাদেশকে এই মেসেজটি দিয়েছে যে তোমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আমরা ঝুলিয়ে রাখছি। কখনো তোমার প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বাদ পাবে না। মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে ২০০১-২০১০ সালে বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা ১০০০ এর উপর, তাহলে চিন্তা করুন গত ৫৩ বছরে ভারত কি পরিমান বাংলাদেশিদেরকে সীমান্তে হত্যা করেছে। যার কোনো সুষ্ঠু বিচার ও তদন্ত কোনোটিই হয়নি।

৯. বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট, রাস্তা ব্যাবহার করছে বিনা মূল্যে। পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। বর্তমান পৃথিবীতে এমন একটি দেশও নেই যারা অন্যদেশ অথবা পার্শবর্তী দেশকে তাদের জল, স্থল, আকাশ পথ বিনা মূল্যে ব্যাবহার করতে দেয়। আর এজন্যই হয়তো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে আমরা ভারতকে যা দিয়েছিই, ভারত তা সারা জীবন মনে রাখবে। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে ভারতের স্বার্থ হাসিল করে শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তার জন্য দেশকে বিলিয়ে দেয়া হচ্ছে ভারতের নিকট।
১০. এখন নতুন করে ভারতকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ১৪টি পয়েন্টে বা লাইনে ৮৬১ কিঃমিঃ রেল লাইন ব্যাবহারের অনুমতি দিচ্ছে ভারতকে। ইতিমধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরও হয়েছে। আগামী মাস থেকেই এই রেল চলাচল শুরু হচ্ছে। এই রেল লাইনটি বাংলাদেশের সেফটি, সেকুইরিটি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি স্বরূপ। এই স্মারকে কি কি শর্ত রয়েছে তা বিস্তারিত কেউ জানে না বা জানানো হচ্ছে না। যতসামান্য আমরা জানতে পেরেছি তাও আবার ভারতের পত্রিকার মাধ্যমে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার জন্য একের পর এক দেশ বিরোধী চুক্তি, স্মারক, ও সমঝোতা বর্তমান সরকার করেই চলছে যার কন্টেন্টস থেকে যাচ্ছে লোক চক্ষুর অন্তরালে । আর ভারতও আওয়ামী সরকারের ঘাড় মটকায়া তাদের স্বার্থ হাসিল করে চলছে। তাদের আগ্রাসনের মাত্রা বেড়েই চলছে। ভারত যেভাবে বর্তমান সরকারের ঘাড়ে চেপে বসেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে যদি ভারত তার মুদ্রা/ইন্ডিয়ান কাররেন্সি বাংলাদেশে চালাতে চায় অথবা ভিসাহীন যাতায়তের সুবিধা চায়, নৌ ও বিমান বন্দরগুলো ব্যাবহার করতে চায়, আপাদ দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তাতেও সরকারের কিছু করার থাকবে না।
১১. কয়লা খনি ও বিদ্যুতের উপর ভারতের আগ্রাসন মাত্রার বাহিরে। বাংলাদেশের উৎপাদিত কয়লা ভারতের নিকট বিক্রি করে আবার তাদের কাছ থেকেই আমাদেরকে সেই কয়লা কিনতে হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। এক আজব ব্যাবসা দুই দেশের মধ্যে।
১২. গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য মার্কিনিরা ও তাদের ছোট ভাই ভারত গলায় গলায় জোট বেঁধে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও তালপট্টি দ্বীপে উপস্থিতি বাড়াতে চায়। এ নিয়ে কাজও করছে।

১৩. আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে গেছে। ভারতীয় সিনেমা, নাটক, সিরিয়াল বাংলাদেশে অবাধে চললেও বাংলাদেশের কোনো সিনেমা ও নাটককে ভারতে অবাধে চলতে দেয়া হয় না। ভারতের প্রায় অর্ধশত টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে চললেও বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেল ভারতে চলতে দেয়া হয় না। আমাদের বিনোদন জগতের পুরো নিয়ন্ত্রণ আজ ভারতের হাতে। কথায় কথায় ভারতীয় শিল্পীরা বাংলাদেশে এসে পারফর্ম করে ট্যাক্স ফ্রি টাকা নিয়ে চলে যায় অথচ বাংলাদেশের শিল্পীদের তেমন উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ভারতের বিনোদন জগতে নেই বললেই চলে। কোনো দেশকে ধ্বংস করতে হলে বিচার, ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের সাথে সাথে সেই দেশের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হয়। ভারত যেন পরিকল্পিত ভাবে তাই করছে। আর পাঠ্যপুস্তক ছাপানো বা ছাপাখানা শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
১৪. ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের নমুনা দেখেছি। ব্রিটিশরা আমাদের দেশে আধিপত্য করার জন্য প্রথমেই শিক্ষিত, লেখক, বিদ্ধুজীবী, কবি, সাহিত্যিক, ব্যাবসায়ী, মিডিয়াকর্মী, বিনোদনকর্মী, ও কূটনৈতিক কিসিমের লোকের মাথা কিনে নিয়েছিল ঠিক একই ভাবে ভারতীয়রা বাংলাদেশের এই সমস্ত কিছু লোকের মাথা কিনে নিয়ে তাদের দ্বারা ভারতের স্বার্থ হাসিল করছে এবং সর্বদা তাদের দ্বারা ভারতের গুণকীর্তনে মশগুল রাখছে। ইতমধ্যে ভারত বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী, পুলিশ, আমলা, সাংবাদিক, সুশীল শ্রেণীর মধ্যে ভারতের অনুগত একটি বলয় গড়ে তুলেছে।
১৫. ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নির্বাচন ব্যাবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ভারতের একছত্র সমর্থনের কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়টা গৌণ হয়ে উঠেছে এবং এতে বাংলাদেশে একটি একদলীয় সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। ২০১৪ সুজাতা সিংহের অযাযিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে এক রাজনৈতিক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভারতীয় কূটনৈতিকরা ঠিক করে দিচ্ছে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ করুক বা না করুক, আওয়ামীলীগ একতরফা ভাবে নির্বাচন করলেও ভারত এতে সমর্থন দিবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চালিয়ে যাবে।ভারত গত ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৪০ জন তাদের মনোনীত এবং একান্ত অনুগত প্রাথীর সংখ্যা বলছে যারা বাংলাদেশের সংসদে মূলত ভারতের স্বার্থের পক্ষেই কথা বলবে।
১৬. মায়ানমার, ভারত ও মার্কিনিদের যৌথ প্রযোজনায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে একটি স্বাধীন খ্রীষ্টিয়ান অধ্যুষিত ছোট দেশ গড়ে তোলার প্ল্যান করা হচ্ছে সেখানে ভারত ও আমেরিকার পাশাপাশি ইসরাইলিদের অর্থ ঢালা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জন্য সাংঘাতিক হুমকি স্বরূপ। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদের কারণে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে আদৌ রোহিঙ্গাদেরকে মায়ানমারে ফেরত পাঠানো যাবে কিনা, এটি সন্দেহ বরং রোহিঙ্গাদের মাধ্যেমে আলাদা ভুখন্ড তৈরির দাবি উঠাও অসম্ভব নয়।

পরিশেষে, একটি কথাই বলতে চাই যে ভারত কখন বাংলাদেশের বন্ধু ছিলোনা এবং ভবিষ্যতেও হবে না। বরং তারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো পাপেট সরকারকে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে সর্বোচ্চ ফায়দা তারা লুটে নিবে। এক্ষত্রে প্রতিটি সচেতন বিশেষ করে শিক্ষিত যুবক, তরুণ ও আগামী প্রজন্মকে তাদের বিবেক খাঠিয়ে ঠিক করতে ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক ও আচরণ কেমন হওয়া উচিত। আমরা যদি আমাদের করণীয় ঠিক করতে ব্যর্থ হই তাহলে বাংলাদেশের এক নতুন ইতিহাস রচিত হবে, তা অবশ্যই সুখকর ইতিহাস নয় বরং সে ইতিহাস হবে সিকিমেরমতো গোলামীর ইতিহাস।

লেখকঃ ব্যারিষ্টার ওয়াহিদ মুহাম্মদ মাহবুব
২৫/০৬/২০২৪, লন্ডন।


Spread the love

Leave a Reply