ইন্তিফাদা, পশ্চিম তীর, হেজবুল্লাহ, পিএলও -ফিলিস্তিন ইসরায়েল সংকটের আটটি দিক

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ সাম্প্রতি ইসরায়েলে হামাসের বড় হামলার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনই জটিল ধরণের। এর মাঝে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা এ সংঘাতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। এবারের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেমন আটটি বিষয় তুলে ধরা হলো।

হামাস-এর পূর্ণাঙ্গ নাম ‘হরকাত আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়া’ যার অর্থ করলে দাঁড়ায় ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন।

হামাস হচ্ছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণ করে। এ গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল যখন প্রথম ইন্তিফাদা বা সংগ্রামের অংশ হিসেবে ১৯৮০’র দশকের শেষের দিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা হিসেবে।

তখন হামাসের মূলমন্ত্র ছিল তিনটি – ধর্ম, দাতব্য কর্মকাণ্ড এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই। ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের কাছে হামাসের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।

গাজা উপত্যকায় ২০০৬ সালের নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ফাতাহকে পরাজিত করে হামাসের প্রার্থীরা। ২০০৭ সালে ইসরায়েলকে হঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে হামাস গোষ্ঠী।

ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে তখনও পর্যন্ত প্রাধান্য ছিল প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাত ও তার ফাতাহ পার্টির।

হামাস ২০০৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়ায় সেই প্রথম ফাতাহ পার্টির প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দল নির্বাচনের মাঠে নামে।

এরপর থেকে গাজার ক্ষমতায় তারাই আছে এবং ইসরায়েলের সাথে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ করেছে। ২০০৭ সাল থেকে ইসরায়েল এবং মিশর একজোট হয়ে গাজা উপত্যকা অবরোধ করে রেখেছে। ইসরায়েল বলে সেটা নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে। তবে তাতে করে হামাসের বারবার হামলা বা রকেট নিক্ষেপ বন্ধ হয়নি।

ইসরায়েলে এবারের হামলার পেছনে ইরানের কথা বারবার উঠে আসছে কারণ হামাসের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা আসে মূলত ইরান থেকে। হামাসকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণও দেয় ইরান।

ইসরায়েল, আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো হামাসকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। বিশেষত এর সামরিক শাখাকে। আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়াতে এবছরই হামাসের একটি প্রতিনিধি দল রাশিয়া এবং সৌদি আরব সফর করেছে।

হেজবুল্লাহ কারা?

হামাস হামলা চালানোর পর থেকেই ইসরায়েলে হামলা চালানো শুরু করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ। সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে।

হেজবুল্লাহর অর্থ সৃষ্টিকর্তার দল। আশির দশকের শুরুর দিকে হেজবুল্লাহ গঠন করেছিল ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডস। উদ্দেশ্য ছিল লেবাননে ইসলামিক আন্দোলনের প্রসার ও সেখানে হামলা করা ইসরায়েলিদের সাথে লড়াই। মূলত শিয়া মুসলিমদের নিয়ে গঠন হয় হেজবুল্লাহ।

হেজবুল্লাহ ইসরায়েলের সাথে সবচেয়ে বড় আকারের যুদ্ধ করেছে ২০০৬ সালে। ইসরায়েলের সাথে ৩৪ দিনের সেই যুদ্ধে লেবাননের ১১২৫ এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয় যাদের বেশির ভাগ ছিল সাধারণ নাগরিক। বিপরীতে ইসরায়েলে মৃত্যু হয়েছিল ১৬৪ জনের যাদের বেশির ভাগই ছিল সেনা। এর পর থেকে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে গেছে গোষ্ঠীটি।

২০১২ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সুন্নি বিদ্রোহীদের মোকাবেলায় হেজবুল্লাহকে নিয়োগের পর থেকে তাদের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে বলে জানাচ্ছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

পশ্চিম তীর
যেভাবে বদলে গেল পশ্চিম তীর

পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতির চিত্র (নীল)
পশ্চিম তীরে ১৯৬৭ সাল থেকে ইহুদি বসতির চিত্র (নীল)

গাজা উপত্যকা

ইসরায়েল, মিশর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে অবস্থিত গাজা উপত্যকা। এটি ৪১ কিমি দীর্ঘ এবং মাত্র ১০ কিমি-প্রশস্ত একটি অঞ্চল। অথচ সেই ছোট্ট অংশে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখের মতো লোক বসবাস করে। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এটাই।

১৯৪৮ সালে মিশর এই অঞ্চলের পরিচালনা শুরু করে। ১৯৬৭ সালের ছয়-দিনের যুদ্ধে এর দখল নেয় ইসরায়েল। ২০০৫ সালে সেখান থেকে নিজেদের সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের প্রত্যাহার করে নেয় ইসরায়েল।

তবে এখনো ইসরায়েল গাজা এবং এর উপকূলীয় এলাকার আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে কারা যাতায়াত করবে ও কী ধরনের পণ্য প্রবেশ করতে পারবে সেসব তদারকি করে। একইভাবে মিশরও গাজা সীমান্ত দিয়ে কারা প্রবেশ করবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।

পশ্চিম তীর

পশ্চিম তীর নামটি এসেছে মূলত জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরের অংশ হওয়ার কারণে। এর উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ইসরায়েল, আর পূর্বে জর্ডান। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে এই অংশটিরও দখল নেয় ইসরায়েল।

১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির আওতায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠন হলেও এই অংশকে পুরোপুরি ছাড়েনি ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীরকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ মনে করে। তবে গত ৫০ বছরে ক্রমাগত এই অংশে বসতি বাড়িয়ে গেছে ইসরায়েল। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় পশ্চিম তীরে যেখানে এক লাখ ১০ হাজারের মতো ইহুদি ছিল, যে সংখ্যা এখন প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ। বিপরীতে ফিলিস্তিনি থাকে প্রায় ২৮ লাখ।

পহেলা অক্টোবর (২০২৩) ইহুদি উৎসব সুক্কুতে ইসরায়লি বসতি স্থাপনকারীদের কিছু অংশ আল আকসা মসজিদে ঢুকে পড়ে
পহেলা অক্টোবর (২০২৩) ইহুদি উৎসব সুক্কুতে ইসরায়লি বসতি স্থাপনকারীদের কিছু অংশ আল আকসা মসজিদে ঢুকে পড়ে

২রা অক্টোবর (২০২৩) ইহুদিদের আল আকসা মসজিদে প্রবেশের পর ফিলিস্তিনিদের মসজিদে প্রবেশ করতে বাধা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী
২রা অক্টোবর (২০২৩) ইহুদিদের আল আকসা মসজিদে প্রবেশের পর ফিলিস্তিনিদের মসজিদে প্রবেশ করতে বাধা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী

জেরুসালেম এবং আল-আকসা

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের একটা গুরুত্বপূর্ণ নাম জেরুসালেম। আরবদের সাথে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় ১৯৬৭ সালে এবং পুরো জেরুজালেম শহরটিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে ঘোষণা করে।

ফিলিস্তিনিরা জেরুসালেমকে নিজেদের রাজধানী মনে করে যদিও সেটার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বেশ কমই আছে। তারা সবসময় বলে আসছে পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী।

ইসরায়েলও জেরুসালেমকে রাজধানী হিসেবে দাবি করে এবং ২০১৭ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর স্বীকৃতি দেন। এর পরের বছর মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়া হয় যেটা নিয়ে বেশ প্রতিক্রিয়া হয় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে।

প্রাচীন এই শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর কারণ ইসলাম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনার অনেকগুলোই এই শহরে।

বিশেষত আল-আকসা মসজিদ ছিল সবসময়ের বিরোধের কেন্দ্রে যেটা ইহুদিদের কাছে টেম্পল মাউন্ট হিসেবে পরিচিত।

পূর্ব জেরুসালেম ইসরায়েল অধিকৃত হলেও আল-আকসা বা টেম্পল মাউন্ট এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করে একটি জর্ডনী-ফিলিস্তিনী ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান। ইসরায়েলিরা সেখানে যেতে পারলেও তাদের প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ। অবশ্য ইসরায়েলি নানাবিধ কর্মকাণ্ড প্রায়শই এজায়গায় বিক্ষোভ-সহিংসতার জন্ম দেয়।

ইন্তিফাদা কী

আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধের ২০ বছর পর ১৯৮৭ সালের শেষদিকে শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের এক সংগ্রাম। সে সময় থেকে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে সে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম ফিলিস্তিনি সংগ্রামের সময়কাল। এটিই ‘প্রথম ইন্তেফাদা’ বা প্রথম গণজাগরণের আন্দোলন হিসেবে পরিচিত।

ইসরায়েলিদের দখল আর নানাভাবে ফিলিস্তিনিদের নিপীড়ন এমনিতেই বড় ক্ষোভ তৈরি করছিল ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। এর মাঝে একটি ইসরায়েলি ট্রাকের একটি গাড়ির সাথে দুর্ঘটনা ঘটে যেখানে চারজন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়। ইসরায়েল সেটিকে দুর্ঘটনা বললেও ফিলিস্তিনের মানুষ সেটাকে ইচ্ছাকৃত হিসেবে দেখে। (রয়টার্স)

ফিলিস্তিনিদের কাছে সেসময় কোনো অস্ত্র ছিল না। সেসময় ইসরায়েলি সেনাদের দিকে তরুণদের পাথর ছোঁড়ার ছবি বেশ আলোড়ন ফেলে। সেসময়েই মিশর-ভিত্তিক মুসলিম ব্রাদারহুড ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে গঠন করে হামাস। ওই আন্দোলনে ১৪০০জন ফিলিস্তিনি আর ২৭১জন ইসরায়েলি নিহত হয়।

১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে সে দফায় ইন্তিফাদার অবসান ঘটে। হামাস অবশ্য তখন থেকেই সেই চুক্তির বিরোধিতা করেছে।

২০০০ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার ইন্তিফাদা। প্রেক্ষাপট ছিল ইসরায়েলের বিরোধী দল লিকুদ পার্টির তৎকালীন নেতা অ্যারিয়েল শ্যারনের আক-আকসা মসজিদে সফর। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সেখানে যাওয়ার। কড়া নিরাপত্তায় তার আল-আকসা কম্পাউন্ডে সফরকে উস্কানি হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং হাজারে হাজারে পথে নেমে আসে।

পুরো ফিলিস্তিনেই সেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় সে ইন্তিফাদায় মারা যায় ৩৩৯২জন ফিলিস্তিনি আর ৯৯৬জন ইসরায়েলি।

এর পর থেকে বেশ কয়েকবার এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যেটা থেকে তৃতীয় ইন্তিফাদার আশঙ্কা করা হয়েছে। পশ্চিম তীরের তরুণদের এবারের হামাসের হামলার প্রেক্ষাপটে গাজার হামলা থেকেও তেমন হতে পারার আশঙ্কা রয়েছে অনেকের।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র

১৯১৭ সালে অটোমানদের কাছ থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখল নেয় ব্রিটেন। তখন ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করার।

১৯৩০ এর দশকে ইহুদিরা ইউরোপ থেকে এসে কৃষি খামার গড়ে তুলতে থাকে। প্রাথমিকভাবে ইহুদিদের সাথে ফিলিস্তিনি আরবদের মোটামুটি ভাল সম্পর্ক থাকলেও ধীরে ধীরে মুসলিমরা বুঝতে থাকে যে ইহুদিরা দলে দলে এসে জমি ক্রয় করছে আর তারা তাদের জমি হারাচ্ছে। বিশেষত ১৯৩৩ সালের পর যখন জার্মানির শাসক হিটলারের কঠোরতার প্রেক্ষিতে হাজার হাজার ইহুদি সেখানে আসতে শুরু করে।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনকে ইহুদি ও আরবের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ভোট দেয় যেখানে জেরুসালেম আন্তর্জাতিক শাসনে থাকবে।

১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ব্রিটেন যখন ফিলিস্তিন ছেড়ে যায়, সেদিনই ইহুদিরা নিজস্ব রাষ্ট্র ইসরায়েলের ঘোষণা দেয়। দিনটিকে ফিলিস্তিনিরা ‘আল-নাকবা’ বা বিপর্যয়ের দিন হিসেবে দেখে।

ফাতাহ, পিএলও, পিএনএ

পঞ্চাশের দশকে গঠন হওয়া ফিলিস্তিনের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক দল ফাতাহ। দলটি গঠনে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

এখানে আরেকটি নাম আসে আরব রাষ্ট্রদের গঠিত পিএলও বা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন। এটি গঠন হয়েছিল ১৯৬৪ সালে যার উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ে কাজ করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফিনিস্তিনিদের তুলে ধরা। ইয়াসির আরাফাত এর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৯ সালে।

ফিলিস্তিনের মুক্তির উদ্দেশ্যে সশস্ত্র প্রতিরোধ দিয়ে ফাতাহ দলটির শুরু হলেও পরবর্তীতে তাদের দ্বিরাস্ট্র তত্ত্বে সমর্থন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা আপস করতে দেখা যায় যা মানতে পারেনি হামাস। এমনকি আশির দশকেই পিএলও থেকে কিছু অংশ বের হয়ে যায় কারণ তাদের দৃষ্টিতে ফাতাহ অনেকটাই অকার্যকর, দুর্নীতিগ্রস্ত বা অতি মধ্যপন্থী হিসেবে ধরা দিচ্ছিল।

যেমন প্রথম ইন্তিফাদার অবসান হয়েছিল ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে। নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে আপোষের এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল অত্যন্ত গোপনে। এজন্য তৎকালীন পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন নোবেল শান্তি পুরষ্কারও পেয়েছিলেন। পিএলওর শান্তি চুক্তিতেই প্রথম ইসরায়েলের সাথে সমস্যার সমাধান এবং ইসরায়েলকে স্বীকৃতির প্রবণতা দেখা যায়।

১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি চুক্তি সই হয় ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে
১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি চুক্তি সই হয় ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে

ফাতাহ, পিএলও এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অনেকটাই একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। পিএলওর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ফাতাহ। আর ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির আওতায় পিএলওর সাথে ইসরায়েলের সমঝোতার ভিত্তিতে গঠন হয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যাদের বলা হচ্ছে তারা প্যালেস্টাইন অথরিটি বা প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটি (পিএনএ) নামেও পরিচিত। যদিও এই কোনো পক্ষই ফিলিস্তিনের জন্য খুব কার্যকর বা জনপ্রিয় কিছু করতে পারেনি।

কথা ছিলো পরবর্তী পাঁচ বছর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে সংঘাত নিরসনে আলোচনা চালিয়ে যাবে ও অন্য বিভিন্ন সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। যদিও সে চুক্তিতে ফিলিস্তিনি শরণার্থী, পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি, এমনকি জেরুসালেম প্রসঙ্গেও পরিষ্কার কোনো সমাধান হয়নি।

অসলো পাঁচ বছর পর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের জায়গায় একটি নির্বাচিত সরকার সেখানকার ক্ষমতায় আসার কথা। তবে পাঁচ বছর না, তিন দশক পার হয়ে গেছে, কোনো কিন্তু ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ক্ষমতায় রয়ে গেছে যার নেতৃত্বে আছেন মাহমুদ আব্বাস যিনি পশ্চিম তীরের নেতা।

২০০৪ সালে ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর হয়। ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট ফাতাহ থেকে নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর মিঃ আরাফাতের উত্তরসূরি মাহমুদ আব্বাসকেই পিএলওর চেয়ারম্যান নিশ্চিত করা হয়। অবশ্য মিঃ আব্বাসের জন্য ২০০৬ সালের সংসদীয় নির্বাচন একটা ধাক্কার জায়গা ছিল কারণ সেসময় ব্যাপক জনসমর্থন পেয়ে গাজার ক্ষমতায় আসে হামাস যারা বরাবরই তাঁর দলের নানাবিধ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিল। পশ্চিম তীরের ক্ষমতায় থাকলেও মিঃ আব্বাসের খুব একটা কার্যকর কোনো প্রভাব আছে তেমনটাও বলা যায় না।

সাম্প্রতিক কালের সমস্ত জনমত জরীপে দেখা গেছে সিংহভাগ ফিলিস্তিনি মনে করে প্রায় ৮৮ বছর বয়স্ক মি. আব্বাস স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি জোর করে ক্ষমতা ধরে আছেন এবং তার প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত।


Spread the love

Leave a Reply