চেরনোবিল পারমানবিক বিপর্যয়ের ৩০তম বর্ষ পূর্তি পালন

Spread the love

বাংলা সংলাপ ডেস্ক:

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত ইউক্রেনের চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটা স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ৩০ বছর পূর্তি স্মরণ করেছে দেশটির সর্বস্তরের জনগণ। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সময় রাত ১টা ২৩ মিনিটে চেরনোবিল পাওয়ার প্ল্যান্টের ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ বিপর্যয়ে প্রাণ হারান ৩১ জন । ক্ষতিগ্রস্ত হন পরমাণু কেন্দ্রটির কর্মী, উদ্ধারকর্মীসহ প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।

ভয়াবহ ওই দিনটিকে স্মরণ করতে চেরনোবিল অঞ্চলের প্রাক্তন বাসিন্দাদের অনেকে সোমবার রাতে সেখানে ছুটে গেছেন। চেরনোবিলের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা এদিন জড়ো হন স্লভুটিচ শহরের কয়েকটি গীর্জায়। নিহতদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন তারা। এ শহরটি নির্মাণ করা হয় চেরনোবিলে কর্মরত শ্রমিকদের পূনর্বাসনের জন্য।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো মঙ্গলবার কিয়েভ শহরে নির্মিত একটি শোকবেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তার আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় নিহতদের স্মরণে। চেরনোবিলে কাজ করা এক শ্রমিক জানান, আমাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াবে, এটি কখনোই ভোলার নয়।

এখনো পর্যন্ত পারমাণবিক বিপর্য়য়ের ইতিহাসে এটিকেই সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনাধীন ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ওই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। ওই রাতে নিরাপদ শীতলীকরণের উপর একটি সাধারণ পরীক্ষা চালানোর সময় এই বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। রাতের শিফটে দায়িত্বরত কর্মীরা ভুল করে রিয়্যাক্টরটির টার্বাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শীতল পানি প্রবাহিত করে। ফলে সেখানে বাষ্প কম উৎপাদিত হয়। এতে করে রিয়্যাক্টরটি উত্তপ্ত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রচ- বিস্ফোরণ ঘটে। ওই দিনের ঘটনায় কেন্দ্রটির ছাদ উড়ে যায়। বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী বেলারুশ, রাশিয়া ও উত্তর ইউরোপের কয়েকটি এলাকায়। বিস্ফোরণের আগে ওই অঞ্চলে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। কিন্তু বিস্ফোরণের পর অনেকে তেজস্ক্রিয়তার শিকার হলে সকল অধিবাসীকে ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক ইভেন্ট স্কেলে বিষ্ফোরণের এ ঘটনাকে ‘লেভেল-৭’ এর দুর্যোগ বলে চিহ্নিত করা হয়। এ বিকিরণ এতটাই তীব্র ছিল যে, ৩০ বছর পরেও এ এলাকার মাটি-পানি-বাতাস এমনকি গবাদি পশুর দুধেও অস্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। মাটির নমুনাতে মিলছে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী তেজস্ক্রিয় পদার্থ। নিরাপদ নয় আশপাশের এলাকাগুলোও।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, এখনো পারমাণবিক কেন্দ্র এলাকায় তেজস্ক্রিয়তা রয়েছে। ব্রিজেস টু বেলারুশ নামে একটি দাতব্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তে কাছে যেসব শিশু এখনো বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।

বেলারুশ সরকার পরিচালিত মিনস্ক সেন্টার ফর হাইজিন অ্যান্ড এপিডেমিওলজি’র তথ্যমতে, খাদ্য ও পানীয়তে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭ বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা অনুমোদনযোগ্য। তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষাটি বলছে, দুধের নমুনায় ৩৭ দশমিক ৫ বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেছে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চেরনোবিলের কারণে সৃষ্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে নানা সময়ে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা ফুসফুস এবং থাইরয়েড ক্যান্সার নিয়ে ওই দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছেন।

জাতিসংঘ সমর্থিত চেরনোবিল ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ জনের কিছু কম মানুষ ওই বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কয়েকজন ২০০৪ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সংস্থাটি জানায়, ৯ হাজারের মতো মানুষ এ তেজস্ক্রিয়তার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। অবশ্য গ্রীনপিসের হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ৯৩ হাজারেরও বেশি।

চেরনোবিলের আশপাশের এলাকার এখনো সুস্থ-সবল শিশুর সংখ্যা অনেক কম। বহু শিশু বিকলাঙ্গতা, স্নায়ুবিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। ৩০ বছর পূর্তির এ দিনে ‘ভুতের শহর’ হিসেবে ওই দুর্ঘটনার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে চেরনোবিল।


Spread the love

Leave a Reply