পর্তুগিজ দখল থেকে যেভাবে গোয়াকে মুক্ত করেছিল ভারতীয় সৈন্যরা

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ জওহরলাল নেহরুর ঘনিষ্ঠ নেতা কৃষ্ণ মেনন থাকতেন বিদেশে আর সেখান থেকেই ভারতের স্বাধীনতার লড়াইতে খুবই সক্রিয় ছিলেন দীর্ঘদিন। মি. মেনন বলতেন গোয়া যেন ভারতের মুখে একটা ব্রণের মতো। প্রায়ই মি. নেহরুকে তিনি বলতেন যে গোয়াকে ‘ফিরিয়ে আনা দরকার’।

তবে, গোয়া নিয়ে মি. নেহরুর এক ধরনের ‘মেন্টাল ব্লক’ ছিল। পশ্চিমা দেশগুলিকে আশ্বস্ত তিনি করেছিলেন যে জোর করে গোয়া দখলের চেষ্টা করবেন না তিনি।

কিন্তু কৃষ্ণ মেনন মি. নেহরুকে বোঝাতে সক্ষম হন যে পর্তুগালের এই উপনিবেশটি নিয়ে তিনি দ্বৈত মনোভাব পোষণ করতে পারেন না।

একদিকে বর্ণবাদী দেশগুলোর সমালোচনা করলেও, অন্যদিকে ভারতের মধ্যেই গোয়াকে পর্তুগিজদের দখলে রাখা নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকতেন জওহরলাল নেহরু।

পর্তুগিজদের গোয়া থেকে শান্তিপূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়া সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মি. নেহরু সেনাবাহিনী পাঠিয়ে গোয়াকে মুক্ত করার পরিকল্পনায় সবুজ সংকেত দেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘গোয়া, ১৯৬১ দ্য কমপ্লিট স্টোরি অফ ন্যাশানালিজম অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন’-বইয়ের লেখক বাল্মীকি ফেলেরো লিখেছেন, ভারতীয় সৈন্যদের জড়ো করা শুরু হয় দোসরা ডিসেম্বর, ১৯৬১। আগ্রা, হায়দ্রাবাদ আর তৎকালীন ম্যাড্রাস ৫০ নম্বর প্যারাসুট ব্রিগেডকে বেলাগাভিতে আনা হয়েছিল।

“উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতে ১০০টিরও বেশি যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রাপথ বদল করে দেওয়া হয়েছিল বেলাগাভিতে সৈন্যদের পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি, বেশ কয়েকটি পণ্যবাহী ট্রেনও বেলাগাভিতে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

এর ফলে আহমেদাবাদের বেশ কয়েকটি কাপড়ের মিল কয়লার ঘাটতির কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।”

জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রীসভায় অর্থমন্ত্রী মোরারজি দেশাই

পর্তুগাল থেকে ‘ইন্ডিয়া’ এল গোয়াতে

পর্তুগালও ভারতীয় বাহিনীর মোকাবেলার প্রস্তুতি শুরু করে।

তারা ‘ইন্ডিয়া’ নামের একটি জাহাজ পাঠিয়ে দেয় গোয়ার উদ্দেশ্যে, যাতে ‘বাঙ্কো ন্যাশনাল আল্ট্রামারিনো’-তে জমা করা সোনা এবং পর্তুগিজ নাগরিকদের স্ত্রী-সন্তানদের লিসবনে পাঠিয়ে দেওয়া যায়।

পিএন খেরা তার ‘অপারেশন বিজয়, দ্য লিবারেশন অফ গোয়া অ্যান্ড আদার পর্তুগিজ কলোনিজ ইন ইন্ডিয়া’ বইতে লিখেছেন, “নয় ডিসেম্বর, ১৯৬১, পর্তুগিজ জাহাজটি থেকে মুরমুগাও পৌঁছিয়েছিল। জাহাজটি ১২ ডিসেম্বর লিসবনের উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু করেছিল।

জাহাজে ৩৮০ জনের থাকার ব্যবস্থা ছিল, তবে জাহাজে চড়ে বসেন প্রায় ৭০০ নারী ও শিশু। সে জাহাজে এত বেশি যাত্রী ছিল যে কিছু যাত্রীকে টয়লেটেও বসতে হয়েছিল।।“

ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জন কেনেথ গলব্রেথ ডিসেম্বর মাসেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা করেন যাতে গোয়ায় সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে তাকে নিরস্ত করা যায়।

গোয়ায় সামরিক অভিযানের দিন ঠিক করা হয়েছিল ১৪ই ডিসেম্বর। তবে পরে তা আরও দুদিন পিছিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর করা হয়।

এর ঠিক একদিন আগে, ১৫ই ডিসেম্বর তারিখ মি. গলব্রেথ মি. নেহেরু এবং তার অর্থমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করেন।

এডিলা গাইতোন্ডে তার ‘ইন সার্চ অফ টুমরো’ বইতে লিখেছেন, “মোরারজি গোয়ায় সহিংসতার বিরুদ্ধে ছিলেন, কারণ তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঔপনিবেশিক সমস্যা সমাধানের জন্য অহিংসার পথ নেওয়ারই পক্ষপাতী ছিলেন।”

“পর্তুগিজরা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপরে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, ১৬ই ডিসেম্বর রাতে পর্তুগিজ গভর্নর জেনারেল এবং তার সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ তাদের এক বন্ধুর মেয়ের বিয়ের ডিনারে যোগ দিয়েছিলেন।”

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মি. নেহরুর সঙ্গে ১৭ তারিখ আবার দেখা করেন এবং প্রস্তাব দেন যে ভারত গোয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখুক।

সেই বৈঠকে উপস্থিত কৃষ্ণ মেনন মি. নেহেরু এবং মি. গলব্রেথকে বলেছিলেন যে ‘এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে’। ভারতীয় সৈন্যরা গোয়ায় প্রবেশ করেছে এবং তাদের ফিরিয়ে যাবে না।

তবে, বহু বছর পর কৃষ্ণ মেনন এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে ওই বৈঠকে তিনি সঠিক তথ্য দেন নি, তখনও পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়ার সীমা অতিক্রম করেনি।

সেই রাতেই কৃষ্ণ মেনন গোয়ার সীমান্তে পৌঁছে ভারতীয় বাহিনী পরিদর্শন করেন।

মি. মেনন জওহরলাল নেহরুকে সামরিক অভিযানের নির্ধারিত সময়টি জানানোর আগেই ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়ায় প্রবেশ করেছিল।

নামমাত্র প্রতিরোধ

ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৭ থেকে ১৮ই ডিসেম্বরের মাঝরাতে গোয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে।

টাইমস অফ ইন্ডিয়া সংবাদপত্র ১৯শে ডিসেম্বর তারিখে ‘ব্যানার হেডলাইন’ প্রকাশ করেছিল, যা বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘অবশেষে আমাদের সেনা গোয়া, দমন আর দিউতে প্রবেশ করেছে’।

গোয়ায় প্রবেশ করতে ভারতীয় সেনাবাহিনী সামান্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। গোয়া দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর জেনারেল ক্যান্ডেথের নেতৃত্বে ১৭ নম্বর পদাতিক ডিভিশনের ওপরে।

ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তার ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী’ বইতে লিখেছেন, “১৮ই ডিসেম্বর সকালে, ভারতীয় সৈন্যরা উত্তরে সাওয়ান্তওয়াড়ি, দক্ষিণে কারওয়ার এবং পূর্বে বেলগাঁও থেকে গোয়ায় প্রবেশ করে।”

“এরই মধ্যে ভারতীয় বিমানগুলি গোয়া জুড়ে লিফলেট ফেলে গোয়ানিজদের শান্ত আর সাহসী থাকতে বলে। লিফলেটে বলা হয়েছিল, আপনারা স্বাধীনতার জন্য আনন্দ করুন এবং সেটিকে জোরদার করুন।”

“ভারতীয় বাহিনী রাজধানী পানাজি ঘিরে ফেলে ১৮ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা নাগাদ। পর্তুগিজরা যেখানে ল্যান্ডমাইন বিছিয়ে রেখেছিল সেগুলি সম্পর্কে ভারতীয় বাহিনীকে সতর্ক করে দিয়েছিল স্থানীয় মানুষরাই।“

অপারেশন শুরুর ৩৬ ঘন্টার মধ্যে পর্তুগিজ গভর্নর জেনারেল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।

পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা পানাজিতে প্রবেশ করলে তারা পর্তুগিজ অফিসার এবং তাদের সৈন্যদের শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় দেখতে পায়।

তাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তাদের বলা হয়েছিল যে, ভারতীয় সৈন্যরা এতটাই নিষ্ঠুর যে তারা যদি কোনো পর্তুগিজ সৈন্যকে তার ইউনিফর্ম দেখে চিনে ফেলে, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করবে।

অনেক পর্তুগিজ সৈনিক শুধু অন্তর্বাস পরে ছিলেন

ব্রিগেডিয়ার সাগত সিংয়ের ভূমিকা

ব্রিগেডিয়ার সাগত সিং-এর নেতৃত্বে, ৫০নম্বর প্যারাসুট ব্রিগেডের ওপরে যা দায়িত্ব ছিল, তারা তার থেকে অনেক দ্রুত পানাজিতে পৌঁছে যায়। এতে সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

জেনারেল ভি কে সিং, যিনি ব্রিগেডিয়ার সাগত সিংয়ের একটি জীবনী লিখেছেন, তিনি বলেছেন, “চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তার ব্যাটালিয়ন পানাজিতে পৌঁছে যায়। তবে তখন রাত হয়ে গেছে বলে সাগত সিং তার ব্যাটালিয়নকে থামিয়ে দেন।

তার যুক্তি ছিল যে পানাজি একটি জনবহুল এলাকা, রাতে আক্রমণ করলে বেসামরিক নাগরিকরা মারা যেতে পারেন। পরদিন সকালে তারা নদী পার হয়।”

পর্তুগিজ সরকার ভারতীয় সৈন্যদের আটকানোর জন্য একটা সেতু উড়িয়ে দিয়েছিল। সাগত সিংয়ের বাহিনীকে সাঁতার কেটে নদী পার হতে হয়। গোয়া অভিযান শেষ করে ১৯৬২-র জুনের মধ্যে ভারতীয় সৈন্যরা আগ্রায় ফিরে এসেছিল।

আগ্রার বিখ্যাত ক্লার্কস শিরাজ হোটেলে এক মজার ঘটনা ঘটে।

মেজর জেনারেল ভিকে সিং বলছিলেন, “ব্রিগেডিয়ার সাগত সিং বেসামরিক পোশাকে সেখানে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা কয়েকজন পর্যটকও সেখানে ছিলেন।

তারা সাগত সিংয়ের দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তাদের একজন এসে মি. সিংকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি ব্রিগেডিয়ার সাগত সিং’?

তিনি বললেন, “আপনি কেন এটা জানতে চাইছেন? ওই পর্যটক বলেন, আমরা পর্তুগাল থেকে এখানে এসেছি। সেখানে সব জায়গায় আপনার পোস্টার দেওয়া হয়েছে, তার উপরে লেখা আছে যে আপনাকে ধরতে পারবে সে দশ হাজার ডলার পাবে।”

ব্রিগেডিয়ার সাগত সিং “যদি আপনি বলেন তাহলে আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি,’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই পর্যটক হেসে বলেন যে ‘আমরা আর পর্তুগালে ফিরে যাব না।”

গোয়া দখলের খবর চেপে যায় পর্তুগাল

ওদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সেন্সরের অধীনে থাকা সংবাদমাধ্যম গোয়ায় পর্তুগিজ সৈন্যদের কঠোর প্রতিরোধ এবং ভারতীয় সৈন্যদের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ের খবর দিচ্ছিল সেখানকার মানুষকে।

পর্তুগিজ সৈন্যরা ভারতীয় সৈন্যদের বন্দী করেছে বলে মিথ্যা খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।

পর্তুগালের জনগণকে বলাই হয়নি যে খুব কমসংখ্যক পর্তুগিজ সৈন্য গোয়ায় মোতায়েন করা ছিল। তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যেমন ছিল না, তেমনই তাদের এই ধরনের অভিযান মোকাবিলা করার জন্য প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি।

তারা যদি ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইতও, তাদের কাছে যথেষ্ট সরঞ্জাম ছিল না।

পর্তুগাল যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গোয়ার বিষয়টি উত্থাপন করে, তখনও পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম অতিরঞ্জিত করে দাবি করছিল যে দেড় হাজার ভারতীয় সৈন্য নিধন হয়েছে।

গোয়া রেডিওতে ১৮ই ডিসেম্বর সারা দিন ধরে যুদ্ধের সঙ্গীত বাজতে থাকে কিন্তু তারা ভারতীয় সৈন্যদের গোয়ায় প্রবেশের কোন খবর দেয়নি।

ভারতীয় বিমানগুলি ডাবোলিম বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল পড়ুয়াদের বাড়িতে ফিরে যেতে বলা হয়েছিল।

ডাবোলিম বিমানবন্দরে বোমা বর্ষণ

পুনের বিমানঘাঁটি থেকে ১৮ই ডিসেম্বর ঠিক সকাল সাতটায় স্কোয়াড্রন লিডার জয়বন্ত সিংয়ের নেতৃত্বে ছয়টি হান্টার বিমান আকাশে ওড়ে। ওই বিমানগুলি বাম্বোলিমের বেতার কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে সেটি ধ্বংস করে দেয়।

বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোয়া।

গোয়া রেডিওর সেই বিখ্যাত ঘোষণা, ‘এটা পর্তুগাল, আপনারা শুনছেন রেডিও গোয়া’ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।

অন্যদিকে ১২টি ক্যানবেরা আর চারটি হান্টার প্লেন পুনা থেকে গোয়ার উদ্দেশ্যে উড়ে যায়।

তারা গোয়ার ডাবোলিম বিমানবন্দরের রানওয়েতে এক হাজার পাউন্ড ওজনের ৬৩টি বোমা ফেলে।

বাল্মিকি ফেলেরো লিখেছেন, “প্রথম রাউন্ডে ৬৩টি হাজার পাউন্ড বোমা ফেলার পরে ভারতীয় বিমানবাহিনী থেমে থাকে নি। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে তারা সেখানে আবার আক্রমণ করে এবং এবার মোট ৪৮ হাজার পাউন্ড বোমা ফেলে।”

“আধ ঘণ্টা পরে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ভিভিয়ান গুডউইনকে পাঠানো হয় ডাবোলিম বিমানবন্দরে হামলার ফলে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হল, তার ছবি তোলার জন্য।

ছবিতে দেখা যায় যে বিমানবন্দরে সেরকম কোনও ক্ষতি হয়নি। এরপর তৃতীয় একটি হামলা চালানো হয়েছিল।”

নারী ও শিশুদের যেভাবে লিসবন পাঠানো হলো

ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রবল বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ডাবোলিম বিমানবন্দরে মাত্র কয়েকটি গর্ত তৈরি হয়েছিল। গোয়ায় মোতায়েন পর্তুগিজ কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন যে তারা স্ত্রী ও সন্তানদের বিমানে করে পর্তুগালে পাঠিয়ে দেবেন।

সে সময় ডাবোলিমে মাত্র দুটি বিমান ছিল।

অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাবোলিম বিমানবন্দরের রানওয়েতে সৃষ্ট গর্তগুলো দ্রুত মেরামত করা হয়।

চারদিক দিয়ে ভারতীয় বাহিনী ঘিরে থাকা সত্ত্বেও গভর্নর জেনারেল সিলভা ওই বিমান দুটি ওড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।

বাল্মিকি ফেলেরো লিখেছেন, “পর্তুগিজ অফিসারদের স্ত্রী ও সন্তানদের দুটি প্লেনে উঠিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্রও চাপানো হয় বিমানে। ওই বিমান দুটি অন্ধকারের মধ্যেই খুব ঝুঁকি নিয়ে মাত্র ৭০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে থেকে আলো না জ্বালিয়ে আকাশে ওড়ে।

সমুদ্রে অবস্থানরত ভারতীয় যুদ্ধজাহাজগুলি থেকে ওই বিমান দুটি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, কিন্তু তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

খুব নিচু দিয়ে উড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমান দুটি।

ইতিমধ্যে গোয়ার গভর্নর জেনারেল মেজর জেনারেল সিলভা ভাস্কো দা গামা পৌঁছান। মেজর বিল কারভেলোর নেতৃত্বে শিখ রেজিমেন্টের সৈন্যরা আগেই সেখানে পৌঁছায়।

ব্রিগেডিয়ার রবি মেহতা একটি সাক্ষাত্কারে বাল্মিকি ফেলেরোকে বলেছিলেন, “মেজর বিল কারভেলো, ক্যাপ্টেন আরএস বালি এবং আমি সেই ভবনের গেটে পৌঁছই, যেখানে জেনারেল সিলভা ছিলেন। জেনারেল সিলভা যেখানে বসেছিলেন সেই টেবিলে আমরা পৌঁছাই।

ততক্ষণে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে এবং তাদের প্রতিরোধ করার কোনো উপায় ছিল না। বিল গভর্নরকে স্যালুট করলেন, গভর্নর উঠে দাঁড়িয়ে সেই স্যালুটের প্রত্যুত্তর দিলেন।”

“বিল বলল যে আপনি আপনার সৈন্যদের অস্ত্র নামিয়ে রেখে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিন। তিনি গভর্নরকে বলেছিলেন যে তাকেও তার বাসভবনে যেতে হবে, সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য তার উপর নজর রাখবে।

কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নন্দা সিদ্ধান্ত নিলেন যে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান রাতে হবে।“

আত্মসমর্পণ করলেন জেনারেল সিলভা

আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানটা হয় ১৯৬১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর রাত নয়টা ১৫ মিনিটে। তখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকজনই মাত্র হাজির ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ড. সুরেশ কানেকার যিনি গোয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ছিলেন।

তিনি তার ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘গোয়া’স লিবারেশন অ্যান্ড দেয়ার আফটার’ বইতে লিখেছেন, “আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি একটি খোলা মাঠে হয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার ধিলোঁ একটি জিপে বসে ছিলেন। তিনি সেখানে উপস্থিত গাড়িগুলিকে ইংরেজি ‘সি’ অক্ষরের আকারে সাজাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

গাড়িগুলির হেডলাইট জ্বলছিল আর যেখানে জেনারেল সিলভা আত্মসমর্পণ করবেন, সেই জায়গাটাতে গাড়ির আলো ফেলা হচ্ছিল।”

“জেনারেল সিলভাকে প্রায় পৌনে নয়টায় সেখানে আনা হয়। তার সঙ্গে তার চিফ অফ স্টাফ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মার্ক ডি আন্দ্রেদ ছিলেন। তাদের প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করানো হয়। ভারতীয় সৈন্যরা তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। “

ডক্টর কানেকার আরও লিখেছেন, “যখন ব্রিগেডিয়ার ধিলোঁকে জানানো হয় যে সব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয়েছে, তখন তিনি তাঁর জিপ থেকে নেমে জেনারেল সিলভার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ ব্রিগেডিয়ার ধিলোঁকে সম্বোধন করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নন্দা বলেছিলেন যে গোয়া, দমন এবং দিউ-এর গভর্নর জেনারেল তাঁর সামনে আত্মসমর্পণ করছেন।”

“নন্দার নির্দেশে, জেনারেল সিলভা অগ্রসর হন। তিনি ধিলোঁকে স্যালুট করেন। তবে ধিলোঁ পাল্টা স্যালুট করেন নি। এটি আমাকে কিছুটা অবাক করে দিয়েছিল, কারণ সিলভা ছিলেন একজন মেজর জেনারেল আর ধিলোঁর র‍্যাঙ্ক তার থেকে পরে ছিল। তিনি ধিলোঁর হাতে আত্মসমর্পণের নথি তুলে দেন।“

এরপর ধিলোঁ তার জিপে ফিরে যান এবং সিলভাকে হেফাজতে নিয়ে আরেকটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো অনুষ্ঠানে সিলভা বা ধিলোঁ কেউই একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।

ভাস্কো-দা-গামায় হাজির না থাকায় ভারতীয় সেনা কমান্ডার জেনারেল ক্যান্ডেথ আত্মসমর্পণ করাতে পারেননি। আত্মসমর্পণের সময় ক্যান্ডেথ জানতেনই না যে ভারতীয় সেনাবাহিনী ভাস্কো-দা-গামায় পৌঁছেছে। রাত ১১টা নাগাদ টেলিফোনে তিনি গোটা বিষয়টি জানতে পারেন।

ওই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের কোনও ছবি নেই।

সুরেশ কানেকার লিখেছেন, “লেফটেন্যান্ট কর্নেল নন্দা অনুষ্ঠানের ছবি তোলার জন্য একজন ফটোগ্রাফারের ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু ফটোগ্রাফারের ক্যামেরায় ফ্ল্যাশ ছিল না।

নন্দা ফটোগ্রাফারকে বলে রেখেছিলেন যে তিনি ইশারা করলেই ছবি তুলতে হবে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নন্দা ইশারা করতে ভুলে গিয়েছিলেন, তাই ফটোগ্রাফারও আর ছবি তোলেন নি।“

পর্তুগিজ জেনারেলের সঙ্গে বৈঠক

কয়েকদিন পর, দক্ষিণ কমান্ডের প্রধান জেনারেল জে এন চৌধুরী পর্তুগিজ জেনারেল সিলভার সঙ্গে তার কারাগারে দেখা করতে যান।

জেনারেল সিলভার সহকর্মী জেনারেল কার্লোস আজেরেডো তার ‘ওয়ার্ক অ্যান্ড ডেজ অফ এ সোলজার অফ দ্য এম্পায়ার’ বইতে লিখেছেন, “জেনারেল চৌধুরী সিলভার সেলের মধ্যে একাই প্রবেশ করেছিলেন। জেনারেল সিলভা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে স্যালুট করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু চৌধুরী তার কাঁধ চাপড়ে দাঁড়াতে নিষেধ করেন। এর পর জেনারেল চৌধুরী নিজেই একটা চেয়ার টেনে জেনারেল সিলভার সামনে বসলেন।”

জেনারেল সিলভাকে জেনারেল চৌধুরী বলেছিলেন, তার যদি কিছু দরকার হয় তবে তিনি কমান্ডার বিল কারভেলোকে জানাতে পারেন। জেনারেল চৌধুরী মি. সিলভাকে আশ্বস্ত করেন যে তার স্ত্রী নিরাপদে আছেন এবং ভারত সরকার তাকে শীঘ্রই লিসবনে পাঠিয়ে দেবে।

এরপর ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল পিএন থাপারও সিলভার সঙ্গে দেখা করতে যান। এর পরে মি. সিলভাকে আরও ভালো একটা ভবনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল সিজার লোবোর তত্ত্বাবধানে রাখা হয় তাকে। মি. লোবো সাবলীলভাবে পর্তুগিজ বলতে পারতেন।

যুদ্ধবন্দী পর্তুগিজ সৈন্যরা

জেনারেল চৌধুরীর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও মি. সিলভার স্ত্রী ফার্নান্দা সিলভার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়নি।

বাল্মিকি ফেলেরো লিখেছেন, “তাকে ডোনা পাওলার সরকারি বাসভবন থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পানাজির রাস্তায় তাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। প্রাক্তন মুখ্য সচিব অ্যাবেল কোলাসো তাকে তার সরকারি বাসভবনে আশ্রয় দিয়েছিলেন।”

যখন বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হয়, তখন মি. নেহরু অ্যাবেল কোলাসোর প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তিনি একজন দুর্দশাগ্রস্ত নারীর সঙ্গে ভদ্রজনোচিত আচরণ করেছিলেন।

ফার্নান্দা সিলভাকে ২৯শে ডিসেম্বর ১৯৬১ তারিখে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিমানে গোয়া থেকে বোম্বেতে নিয়ে যাওয়া হয় আর সেখান থেকে লিসবনের বিমানে তুলে দেওয়া হয়।

তার স্বামী জেনারেল সিলভা পাঁচ মাস পর দেশে ফেরেন।

এই অভিযানে ভারতের ২২ জন সেনা নিহত এবং ৫৪ জন সেনাসদস্য আহত হন।

অর্জুন সুব্রামানিয়ামের ‘ইন্ডিয়াজ ওয়ারস্ ১৯৪৭ – ১৯৭১’ বইয়ে লিখেছেন পর্তুগিজ সেনাবাহিনীর ৩০ জন সদস্য মারা গিয়েছিলেন আর ৫৭ জন আহত হন।

‘কাপুরুষ’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা পর্তুগিজ সেনাদের

বাল্মিকি ফেলেরো লিখেছেন, “যুদ্ধবন্দী পর্তুগিজ সেনারা লিসবনে ফিরে যাওয়ার পরে তাদের সঙ্গে অপরাধীদের মতো আচরণ করে সেখানকার সামরিক পুলিশ।

হেফাজতে নেওয়া হয় তাদের। সৈন্যদের পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দরে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, কিন্তু দেখা করতে দেওয়া হয় নি। তাদের কোনও অজানা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, এবং ‘কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক’ বলে অপমান করা হয়।

গভর্নর জেনারেল সিলভা সহ প্রায় এক ডজন অফিসারকে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়।

শুধু তাই নয়, তাকে কোনও সরকারি পদে থাকার ওপরে সারাজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

তবে ১৯৭৪ সালে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে, বরখাস্ত হওয়া সৈন্যদের পুনর্বহাল করা হয় এবং মেজর জেনারেল সিলভাকে সেনাবাহিনীতে তার পুরানো পদে ফিরিয়ে আনা হয়।

গোয়ায় বসবাসকারী সমস্ত মানুষকে ভারত নাগরিকত্ব দিয়েছে। পর্তুগিজ নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার শর্তও রাখে নি ভারত।

ভারতের আইনে দ্বৈত নাগরিকত্বের কোনও বিধান নেই।

তবে ১৯৬১ সালের আগে গোয়ায় বসবাসকারী ব্যক্তিদের জন্য একটি ব্যতিক্রম করা হয়েছে যে, তারা পর্তুগাল আর ভারত, দুই দেশের নাগরিকত্বই বজায় রাখতে পারেন।


Spread the love

Leave a Reply