রাশিয়ার কারাগারে পুতিন বিরোধী নাভালনি’র মৃত্যু

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্টঃ গত এক দশকে রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনি মারা গেছেন। কারা কর্তৃপক্ষ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

দেশটির রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে কট্টর সমালোচক হিসেবে দেখা হতো নাভালনিকে।

রাশিয়ার একটি আদালত তাকে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

গত বছরের শেষের দিকে মি. নাভালনিকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর কারাগার হিসেবে পরিচিত আর্কটিক পেনাল কলোনিগুলোর একটিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

ইয়ামালো-নেনেটস্ জেলার কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবার একটু হাঁটাহাঁটি করার পর একটু অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

আরো উল্লেখ করা হয়, জরুরি চিকিৎসক দলকে ডাকা হলে তারা নাভালনির জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু, কোনো চেষ্টাই আর কাজে আসেনি।

“ইমার্জেন্সি ডাক্তাররা উক্ত কয়েদিকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর কারণ জানার চেষ্টা করছেন তারা।”

নাভালনির আইনজীবী লিওনিড সলোভিয়ভ রুশ গণমাধ্যমকে জানান, তিনি এখনই কোনো মন্তব্য করবেন না।

তবে, এই মৃত্যুর পেছনে রুশ কর্তৃপক্ষই মূলত দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন, ইউরোপিয়ান কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন দের লিয়েন।

আর, ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, পুতিনই হত্যা করেছেন নাভালনিকে।

সাহস প্রদর্শনের মূল্য জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে তাকে, এমন মন্তব্য করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ্।

পুতিনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত আলেক্সেই নাভালনি।
পুতিনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত আলেক্সেই নাভালনি।

রাশিয়ার বক্তব্য

রাশিয়ার সরকার অবশ্য পশ্চিমের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, নাভালনির মৃত্যু নিয়ে পশ্চিমাদের অভিযোগের মধ্য দিয়ে তাদের নিজেদের চরিত্রই উন্মোচিত হয়েছে।

টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশ করা এক বিবৃতি তিনি আরো বলেন, “ময়না তদন্তের ফলাফল এখনো জানা যায়নি।”

কিন্তু পশ্চিম ঠিকই নিজেদের মতো করে উপসংহারে পৌঁছে গেছে।

এদিকে নাভালনির মৃত্যু সম্পর্কে পেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা

হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আগেও

২০২০ সালে বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল নাভালনিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান তিনি।

চিকিৎসা নিতে যান জার্মানিতে। পাঁচ মাস জার্মানিতে কাটিয়ে ২০২১ সালে জানুয়ারিতে মস্কো ফেরার সাথে সাথেই তাকে আটক করা হয়।

তাকে অভ্যর্থনা জানাতে মস্কো বিমানবন্দরে হাজার হাজার সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন।

কিন্তু বিমানবন্দরে নামার আগেই তাকে বহনকারী বিমানটির পথ পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয় শেরেমেতেইয়েভো বিমানবন্দরে।

সেখানে ইমিগ্রেশনে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় এই আন্দোলনকারীকে।

মি. নাভালনি তাকে হত্যাচেষ্টার জন্য রুশ কর্তৃপক্ষকে সবসময় দায়ী করে এলেও ক্রেমলিন বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের তদন্তে অবশ্য নাভালনির দাবিই সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

কে এই অ্যালেক্সেই নাভালনি?

প্রেসিডেন্ট পুতিনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত আলেক্সেই নাভালনি।

সরকারের দুর্নীতি প্রকাশ করে দেবার মধ্যে দিয়ে রাজনীতিতে তার নাম উঠে আসে। তিনি মি. পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া দলকে উল্লেখ করেছিলেন “অসৎ ও চোরেদের দল” বলে। এজন্য বেশ কয়েকবার তাকে জেলে যেতে হয়েছে।

মি. পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া সংসদীয় নির্বাচনে ভোট কারচুপি করেছে বলে প্রতিবাদ করার পর তাকে ২০১১ সালে ১৫ দিনের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়।

মি. নাভালনিকে ২০১৩র জুলাইয়ে তছরূপের অভিযোগে অল্পদিনের জন্য জেলে পাঠানো হয়, তবে তিনি বলেন, এই দণ্ডাদেশ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

তিনি ২০১৮র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতারণার দায়ে তিনি আগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এই কারণ দেখিয়ে তাকে প্রার্থিতা দেয়া হয়নি।

মি. নাভালনির মতে, এটাও ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

এরপর ২০১৯ জুলাইতে মি. নাভালনিকে আবার কারাগারে পাঠানো হয় অনুমোদন না থাকার পরও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠনের জন্য। সেসময় তিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

চিকিৎসকরা বলেন তার “কোন কিছুর স্পর্শ থেকে চামড়ার প্রদাহ” হয়েছে। কিন্তু মি. নাভালনি বলেন, তার কোনদিন কোন কিছু থেকে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া আগে হয়নি।

তার নিজের চিকিৎসক বলেন তিনি “কোন বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে” এসেছিলেন। মি. নাভালনিও বলেছিলেন তার ধারণা তাকে বিষ দেয়া হয়েছে।

মি. নাভালনির ওপর ২০১৭ সালে অ্যান্টিসেপটিক রং দিয়ে হামলা চালানো হলে তার ডান চোখ রাসায়নিকে গুরুতরভাবে পুড়ে যায়।

গত বছর মানে ২০২২ সালে তার দুর্নীতি বিরোধী ফাউন্ডেশনকে সরকারিভাবে “বিদেশি গুপ্তচর সংস্থা” বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে এই সংস্থার কর্মকাণ্ডের ওপর সরকার কঠোর নজরদারি শুরু করে।

পুতিনের দলকে বলতেন চুরি-জালিয়াতির আখড়া

মিস্টার পুতিনের দলকে “জালিয়াতি ও চুরির” আখড়া বলে আখ্যা দিয়েছিলেন নাভালনি।

এই প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থাকে “রাশিয়ার রক্তকে চুষে খাওয়ার” সঙ্গে তুলনা দেন তিনি।

এছাড়া তার ভাষ্যমতে যে “সামন্তবাদী রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়েছে তা ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছিলেন নাভালনি।

তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভের নেতৃত্বও দিয়েছেন।

কিন্তু তিনি সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। আর সেটা হল, ব্যালট বক্সে পুতিনকে চ্যালেঞ্জ করা।

২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থিতা কর্তৃপক্ষ বাতিল করে দিয়েছিল।


Spread the love

Leave a Reply