সাক্ষাৎকার: ‘আমি আর বেঁচে থাকতে চাইনি’, বললেন ডাচেস

Spread the love

বাংলা সংলাপ রিপোর্টঃ ডাচেস অব সাসেক্স বলেছেন যে, ব্রিটিশ রাজ পরিবারে তার জীবন এতো বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল যে এক সময় “তিনি আর বেঁচে থাকতে চাননি”।

মার্কিন টিভি ব্যক্তিত্ব অপরা উইনফ্রি-র সাথে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে মেগান বলেন, তিনি যখন সাহায্য চেয়েছেন তখন তিনি সেটি পাননি।

তিনি বলেন, সবচেয়ে খারাপ সময়টি ছিল যখন রাজপরিবারের এক সদস্য হ্যারিকে তাদের ছেলের গায়ের রং নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল যে সে “কতটা কালো” হতে পারে।

প্রিন্স হ্যারিও বলেছেন যে তিনি যখন সরে আসতে চেয়েছিলেন, তখন তার বাবা প্রিন্স চার্লসও তার ফোন ধরাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

বহুল-প্রতীক্ষিত এই সাক্ষাৎকার যুক্তরাষ্ট্র সময় রাতে সম্প্রচারিত হয়েছিল।

সিবিএস এর দুই ঘণ্টার এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি, যেটি যুক্তরাজ্যে সোমবার আইটিভিতে সম্প্রচারিত হবে সেখানে এই দম্পতি বিভিন্ন বিষয় যেমন বর্ণবাদ, মানসিক স্বাস্থ্য, গণমাধ্যমের সাথে তাদের সম্পর্ক এবং রাজপরিবারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

তারা জানান যে, আসছে গ্রীষ্মে তারা আবার বাবা-মা হতে যাচ্ছেন এবং এই সন্তানটি একটি মেয়ে।

২০২০ সালের মার্চে রাজ পরিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের পর এই দম্পতি ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। গত মাসেই তারা ঘোষণা দেন যে রাজপরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে তারা আর ফিরবেন না।

‘আমাকে সুরক্ষা দেয়া হয়নি’

মেগান বলেন, একসময় তিনি একাকী বোধ করতে থাকেন যখন তাকে বলা হয় যে, তিনি কী করতে পারবেন আর কী করতে পারবেন না। এমন এক সময় দাঁড়ায় যখন তিনি মাসের পর মাস বাড়ি থেকে বের হননি।

অপরাকে তিনি বলেন, তিনি এক সময় ভাবতে শুরু করেন “এর চেয়ে বেশি একা হওয়া সম্ভব নয়।”

অপরা তাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এক পর্যায়ে গিয়ে তিনি নিজের ক্ষতি করার বা আত্মহত্যার চিন্তা করেছিলেন কিনা? উত্তরে মেগান বলেন: “হ্যাঁ। এটা খুব বেশি স্পষ্ট ছিল। খুব স্পষ্ট এবং ভয়ংকর। সেসময় বুঝতে পারছিলাম না যে কার কাছে যাবো।”

মেগান বলেন, গর্ভবতী থাকা অবস্থায় হ্যারির সাথে রয়াল অ্যালবার্ট হলে এক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সময়কার এক ছবির কারণে “আতঙ্কবোধ” করেছিলেন তিনি।

“ওই অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে আগে সকালে হ্যারির সাথে এ নিয়ে আলাপ হয়েছিল আমার,” মেগান বলেন।

উইনফ্রি জিজ্ঞেস করেন: “যে আপনি আর বেঁচে থাকতে চান না?”

“হ্যাঁ,” মেগান নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন যে, ওই রাতে তিনি ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন কারণ তিনি অনুভব করছিলেন যে, তিনি আর “একাকী” বোধ করতে চান না। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠানের সময় হ্যারি তার হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন।
অপরা মেগানকে জিজ্ঞেস করেন যে, রাজ পরিবার কেন তার ছেলে আর্চিকে প্রিন্স ঘোষণা করেনি।

১৯১৭ সালের একটি আইনের কারণে ডিউক এবং ডাচেস অব সাসেক্সের সন্তানরা স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্স কিংবা প্রিন্সেস হবেন না, যদি না রানি কোন পদক্ষেপ নেন।

মেগান বলেন, “আমার গর্ভবতী থাকার মাসগুলোতে আলোচনা চলছিল যে তাকে সুরক্ষা দেয়া হবে না, তাকে হয়তো কোন পদবি দেয়া হবে না এবং জন্মের পর তার ত্বক কতটা কালো হবে তা নিয়েও উদ্বেগ এবং আলোচনা চলেছে।”

তিনি বলেন যে, এসব কথা হ্যারিকে বলা হয়েছিল এবং তার কাছ থেকেই তিনি এসব বিষয় জেনেছেন।

অপরা জিজ্ঞেস করেন যে তার সন্তান যদি “বেশি বাদামি বর্ণের” হয় এবং তা নিয়ে কোন সমস্যা হবে কিনা-এ নিয়ে কোন উদ্বেগ তাদের ছিল কিনা। মেগান বলেন: “এটা যদি আপনার অনুমান হয়ে থাকে, তাহলে সেটি বেশ নিরাপদ অনুমানই মনে হচ্ছে।”

এ ধরণের মন্তব্য কে করেছিলেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা জানাননি। তিনি বলেন: “আমার মনে হয় এটা তাদের জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।”

হ্যারিও সে বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরতে অসম্মতি জানিয়ে বলেন: “ওই আলোচনা আমি কখনোই কাউকে বলবো না।”

“সে সময়ে এটা বেমানান ছিল এবং আমি বিস্মিত হয়েছিলাম,” তিনি বলেন।

তিনি বলেন যে, গণমাধ্যমের কাছ থেকে মেগান যে ধরণের বর্ণবাদের শিকার হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে কোন স্বজনই মেগানের পক্ষে কথা বলতে এগিয়ে আসেননি।

“ওই তিন বছরে আমার পরিবারের কেউই কোন কথা বলেনি। এটা কষ্টকর,” হ্যারি বলেন।

হ্যারি ও মেগানের সাক্ষাৎকারটি টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।

সময়কাল
•২০১৬ সালের গ্রীষ্ম: পরস্পরের পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে আয়োজিত ব্লাইন্ড ডেট-এ গিয়ে দেখা হয় হ্যারি এবং মেগানের।

•২০১৮ সালের মে মাস: উইন্ডসর ক্যাসলে বিয়ে করেন এই দম্পতি।

•২০১৯ সালের এপ্রিল: উইন্ডসর ক্যাসলের প্রাঙ্গণেই ফ্রগমোর কটেজে বসবাস শুরু করেন তারা।

•২০১৯ সালের ৬ই মে: তাদের সন্তান আর্চি জন্ম নেন।

•২০২০ সালের ৩১শে মার্চ: কানাডায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর রাজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ওই বছরেই ক্যালিফোর্নিয়ায় যান তারা।

•২০২১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি: এই দম্পতি ঘোষণা দেয় যে তারা দ্বিতীয় সন্তানের বাবা-মা হতে যাচ্ছেন।

•২০২১ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি: বাকিংহাম প্যালেস ঘোষণা দেয় যে, তারা রাজ পরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে ফিরে আসবেন না এবং তাদের অভিভাবকত্ব বাতিল করা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারের সময় রাজপরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে, তারা ডিউক এবং ডাচেসকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। মেগান ওই পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন ২০১৮ সালের মে মাসে বিয়ের পর “সেটি আরো খারাপ হতে থাকে”।

“আমি বুঝতে পারি যে শুধু আমাকেই সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে না তা নয়, বরং পরিবারের অন্য সদস্যদের সুরক্ষা দিতে তারা মিথ্যা বলতেও প্রস্তুত ছিল।”

“কিন্তু আমি আর আমার স্বামীকে সুরক্ষা দিতে তারা সত্যিটা বলতেও ইচ্ছুক ছিল না।”

তিনি একটি গুজবের উদাহরণ টেনে বলেন যে, ফ্লাওয়ার গার্লসদের পোশাক কেমন হবে সে বিষয়টি নিয়ে মতামত দেয়ার সময় ডাচেস অব কেমব্রিজকে কাঁদিয়েছিলেন তিনি। এই গল্পটি ট্যাবলয়েড পত্রিকায় মুখরোচক গল্প হয়ে উঠেছিল বলে জানান তিনি।

মেগান বলেন যে আসলে ঘটনাটি পুরো উল্টো ছিল। তিনি বলেন যে, ওই ঘটনার জন্য পরে ক্যাথরিন ক্ষমা চেয়েছিলেন। সাথে কিছু ফুল আর ছোট চিরকুট পাঠিয়েছিলেন সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য।

সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্বে অপরা আর স্ত্রীর সাথে যোগ দেয়ার পর হ্যারি পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তার সম্পর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

তিনি বলেন যে, তার দাদী, রানির সাথে তার সম্পর্ক খুবই ভাল। তারা দুজন প্রায়ই কথা বলেন।

তবে তার বাবা প্রিন্স অব ওয়েলসের সাথে তার সম্পর্ক তেমন ভাল নেই।

হ্যারি বলেন যে, তিনি তার বাবার বিষয়ে “আসলেই হতাশ” বোধ করেন। তিনি বলেন, তিনি তার বাবাকে সবসময়ই ভালবাসবেন কিন্তু “তিনি অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছেন।”

প্রিন্স উইলিয়াম সম্পর্কে তিনি বলেন যে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি “আসলেই ভিন্ন।”

তিনি আরো বলেন যে, তার পরিবার তাকে আর্থিকভাবেও সহায়তা করা বন্ধ করে দিয়েছে।

হ্যারি তার ভাই আর বাবাকে রাজপরিবারের ব্যবস্থার “ফাঁদে আটকে পড়া” বলে উল্লেখ করেছেন।

“তারা সেখান থেকে বেরুতে পারবে না” বলেন তিনি।

প্রিন্স উইলিয়ামের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা দুজন “ভিন্ন পথে” রয়েছেন।

সাক্ষাৎকারটি এমন সময়ে প্রচার হলো যখন হ্যারি-র দাদা, ডিউক অফ এডিনবরা, হৃৎপিণ্ডে অস্ত্রোপচার শেষে এখন হাসপাতালে সেরে উঠছেন। যদিও সাক্ষাৎকারটি আগেই ধারণ করা হয়েছে।

বিবিসির রাজপরিবার বিষয়ক সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড বলছেন, এটা এখনো স্পষ্ট নয় যে, এর প্রতিক্রিয়ায় প্যালেস কী বলবে। কিছু কিছু অভিযোগ এতো বেশি ব্যক্তিগত যে ধারণা করা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে না। তবে এই দম্পতি যে এখনো স্নেহধন্য সেটি রানি বারবারই স্পষ্ট করেছেন।

মেঘান মার্কেল এবং প্রিন্স হ্যারি দাবি করেছেন যে মেগজিটের মধ্যে স্যান্ড্রিংহামে রাতারাতি অবস্থান বাতিল করে রানী তাদের স্নাত করে দিলেন।

ওপ্রা সাক্ষাত্কারের নতুন বোমসেল ক্লিপে ডিউক বলেছেন, রানী গত বছর ৬ জানুয়ারী এই জুটিকে তাঁর সাথে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন- কিন্তু ব্রিটেনে নামার পরেই এই আমন্ত্রণটি বাতিল করে দেন।

ডিউক অফ সাসেক্স বলেছিলেন যে তাঁর দাদী, মহামহিময় ব্যক্তিগতভাবে তাদের “আড্ডা, চা এবং ডিনার” এবং স্যান্ড্রিংহামে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কারণ এটি একটি “লং ড্রাইভ”।

দম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য ব্রিটেন থেকে পালানোর পর প্রথমবারের মতো কানাডা থেকে ফিরে এসেছিলেন – এবং দ্য সান মেগসিতকে প্রকাশ করেছেন মাত্র দু’দিন আগে I

হ্যারি এবং মেঘান ভ্যানকুভারে অবস্থান করছিলেন – যেখানে তারা একসাথে ক্রিসমাস কাটিয়েছিলেন – মেগসিতের উত্তেজনাপূর্ণ বিবরণটি প্রাসাদের সাথে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

৬ ই জানুয়ারী, রানী এই জুটিকে বলেছিলেন “যে মুহুর্তে তারা অবতরণ করবেন” তাদের উচিত তারা নরফোকে গিয়ে দেখা করা উচিত।

তবে যুবরাজ হ্যারি দাবি করেছেন যে তারা আমন্ত্রণটি ইউকে আসার সময় নাটকীয়ভাবে বাতিল করেছিলেন।

প্রিন্স হ্যারি নতুন ক্লিপটিতে ওপরাহ উইনফ্রেকে বলেছিলেন: “আমরা যে মুহুর্তে যুক্তরাজ্যে এসেছি, আমি আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি ফিয়োনার কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছিলাম, রানির ব্যক্তিগত সচিবের বার্তাটি কেটে পেস্ট করেছি।

“মূলত বলছি, দয়া করে সাসেক্সের ডিউক এবং ডাচেসের পাশ দিয়ে যান যে তিনি নরফোক আসতে পারবেন না।

“রানী ব্যস্ত। সে পুরো সপ্তাহে ব্যস্ত থাকে। ”

তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়ে গেলেন যে যখন তিনি রানিকে ফ্রগমোর কটেজ থেকে ডাকলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে তাঁর ডায়েরিতে কিছু আছে “যা সে জানত না যে কী আছে” ”

যুবরাজ হ্যারি ওপ্রেহকে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন: “আমি চাপ দিতে চাইনি কারণ আমি কী জানি যা হচ্ছে তা আমি জানি না।”

পরিবারের প্রধান হিসাবে রানী যখন চাইছিলেন ঠিক তেমন করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে ডিউক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল: “আপনি যখন ফার্মের প্রধান হন, তখন আপনার চারপাশে এমন লোক থাকে যে আপনাকে পরামর্শ দেয়।

“এবং যা আমাকে সত্যই দু: খিত করেছে সেগুলির মধ্যে কিছু পরামর্শ সত্যিই খারাপ ছিল ”

এর দু’দিন পরে, হ্যারি এবং মেঘান ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি ইনস্টাগ্রামে একটি বিবৃতি দিয়ে রয়্যাল জীবন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ঘোষণা দিয়েছিল।


Spread the love

Leave a Reply