এরিকসেনের ফিরে আসার পার্শ্বনায়কেরা

Spread the love

বাংলা সংলাপ ডেস্কঃ “ডেনমার্ক হেরেছে, কিন্তু জয় হয়েছে জীবনের”-ডেনমার্কের একটি সংবাদপত্রের শিরোনামেই ফুটে উঠেছে জয়-পরাজয় ছাপিয়ে কিভাবে প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে ভিন্ন কোনো উপলক্ষ। যেখানে মানবিকতার জয়ই মুখ্য। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে ফলাফলকে পাশ কাটিয়ে সবাইকে স্বস্তি দিয়েছে ক্রিস্তিয়ান এরিকসেনের সুস্থতার খবর। খেলোয়াড়-কর্তৃপক্ষসহ ক্রীড়া বিশ্বের সবার প্রার্থনা ছিল একটাই, ফিরে আসুক এরিকসেন।

কোপেনহেগেনের পারকেন স্টেডিয়ামে শনিবার ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচের ৪৩তম মিনিটে একটি থ্রো ইন থেকে বল রিসিভ করার আগমুহূর্তে হঠাৎ পড়ে যান ডেনিশ মিডফিল্ডার এরিকসেন।

ছুটে যান দুই দলের খেলোয়াড়রা। মাঠেই শুরু হয় চিকিৎসা। সেখান থেকে সরাসরি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। খেলা বন্ধ রেখে খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিসিয়াল সবাই মাঠ ছেড়ে যান। প্রথমে পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও উভয় দলের সম্মতিতে ম্যাচটি আবার শুরু হয়।

সেখানেও ভূমিকা রেখেছেন এরিকসেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসটাইমের মাধ্যমে ভিডিও কলে তিনিই খেলাটি শেষ করার আহ্বান জানান সতীর্থদের। কাজটা কঠিন হলেও তারা মাঠে নেমেছেন এবং খেলাটি শেষও করেছেন।

ম্যাচে জোয়েলের একমাত্র গোলে জেতে প্রথমবারের মতো ইউরোতে খেলতে আসা ফিনল্যান্ড।
ফিরে দেখা যাক এমন আবেগি একটি ম্যাচের কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে, যারা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করে গড়ে দিয়েছেন ব্যবধান।

ডেনমার্ক অধিনায়ক সিমোন কেয়া ও তার সতীর্থরা

এরিকসেন লুটিয়ে পড়ার পর প্রথমেই সেখানে ছুটে গিয়ে সিমোন কেয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের রাস্তা পরিষ্কার করতে থাকেন। দ্রুতই বাকি খেলোয়াড়রাও যোগ দেন। ঘটনার তীব্রতা বুঝতে পেরে চিকিৎসা কর্মীদের তাড়াতাড়ি ডাক দেন।

ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে যান ডেনিশ খেলোয়াড়রা। তাদের চোখে তখন জল। প্রার্থনা করছিলেন কয়েকজন। এর মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ভোলেননি তারা; মানববর্ম তৈরি করে উপস্থিত ১৫ হাজারের বেশি দর্শক এবং টেলিভিশনের সামনে থাকা কোটি দর্শকের নজর থেকে এরিকসেনকে তারা আড়াল করেন।

সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ফিনল্যান্ডের দর্শকরাও। তাদের জাতীয় পতাকা দিয়েই পর্দা বানিয়ে এরিকসেনকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয় মাঠের বাইরে।

মাঠে উপস্থিত এরিকসেনের স্ত্রী।

চিকিৎসা কর্মী

খেলোয়াড়দের ডাকে তারা যখন মাঠে ছুটে যান, জানা ছিল না ঠিক কতটা অসুস্থ এরিকসেন। তবে সময় ক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াটাই ছিল তখন সময়ের চাহিদা। নিজেদের দায়িত্ব তারা সামলেছেন পেশাদারিত্বের সঙ্গে।

ডেনমার্ক দলের চিকিৎসক মোর্টেন বোয়েসেন ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে পুরো ঘটনাটি তুলে ধরেন।

“এটা পরিষ্কার সে ছিল অজ্ঞ্যান। আমি যখন তার কাছে যাই, তখন সে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। আমি তার নাড়ির স্পন্দন অনুভব করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায় এবং আমরা তাকে সিপিআর দিতে শুরু করি।”
“চিকিৎসক দল এবং তাদের কাজে সহযোগিতা করা সবার কাছ থেকে খুব দ্রুত সাহায্য এসেছিল। আর আমরা সেটাই করেছি যা ক্রিস্তিয়ানকে ফেরাতে আমাদের করণীয় ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার আগে সে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল।”

ডেনমার্ক দল

চোখের সামনে এরিকসেনকে অচেতন হতে দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন তার সতীর্থদের অনেকেই। মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়া খেলোয়াড়দের জন্য এরপর খেলা চালিয়ে যাওয়াটা ছিল ভীষণ কঠিন কাজ। প্রায় ঘন্টা দুয়েক বিরতির পর খেলায় ফিরলেও অধিকাংশের ছিল না মনের জোর।

ডেনমার্ক কোচ কাসপের হিউমান্দ খেলোয়াড়দের দৃঢ় মানসিকতার প্রশংসা করার পাশাপাশি বলেন, কাজটা মোটেই সহজ ছিল না তার শিষ্যদের জন্য।

“এটা খুব কঠিন একটি রাত ছিল। এটা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে জীবনে মূল্যবান কিছু সম্পর্ক, কাছাকাছি থাকা মানুষ, পরিবার এবং বন্ধুরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
“খেলোয়াড়রা যেভাবে একে অপরের যত্ন নিয়েছে, তাতে আমি আবেগাপ্লুত। সে (এরিকসেন) আমার কাছের বন্ধুদের একজন। ড্রেসিংরুমে তার সতীর্থরা বলছিল, এরিকসেন ঠিক আছে কি না, তা না জানা পর্যন্ত তারা কিছুই করবে না।”

সতীর্থ ও বন্ধু হাসপাতালে লড়ছেন জীবন বাজি রেখে, এই অবস্থায় খেলা চালিয়ে যাওয়াটা অসম্ভবই ছিল ডেনমার্কের খেলোয়াড়দের জন্য। ৪৯ বছর বয়সী কোচও জানালেন, বেশ কয়েকজন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং খেলা চালিয়ে যাওয়ার অবস্থায় ছিলেন না।

“সত্যি বলতে কিছু খেলোয়াড় ছিল যারা একেবারেই খেলার মতো অবস্থায় ছিল না। মানসিকভাবে তারা ভেঙে পড়েছিল।”

“তাদের কেউ কেউ খেলার অবস্থায় ছিল না, আবার কেউ ছিল প্রস্তুত। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এভাবে এই পর্যায়ে ফুটবল খেলা যায় না। এটা স্বাভাবিক নয়, বন্ধু হার্টের সমস্যায় ভুগছে, এই সময় ম্যাচ খেলা যায় না। আমি এভাবে খেলার কথা ভাবতে পারি না। আমরা খেলোয়াড়দের থেরাপি সেশনের প্রস্তাব দেব এবং অন্যদের সাহায্য নেব।”

দর্শক
ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ডের পাশাপাশি মাঠে এসেছিলেন কিছু নিরপেক্ষ দর্শকও। ম্যাচ আবার শুরুর সম্ভাবনা তখন আর নেই জেনেও তারা মাঠেই থেকে গেছেন। একটা পর্যায়ে ফিনল্যান্ডের সমর্থকরা চিৎকার করতে থাকেন ‘ক্রিস্তিয়ান, ক্রিস্তিয়ান’ বলে। ডেনমার্কের সমর্থকদের অংশ থেকে উত্তরে “এরিকসেন, এরিকসেন’ চিৎকার ভেসে আসে।

দুই দলের খেলোয়াড়রা পুনরায় মাঠে ফিরে আসার পর দর্শকরা তাদের দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানায়।

ম্যাচ অফিশিয়াল

গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ইংল্যান্ডের রেফারি অ্যান্থনি টেইলরও। এরিকসেন মাঠে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই তিনি খেলা থামিয়ে দেন এবং চিকিৎসা কর্মীদের মাঠে প্রবেশের সংকেত দেন।

ম্যাচ অনির্দিষ্টকালীন সময়ের জন্য বন্ধ থাকবে বুঝতে পেরে এরপর তিনি খেলোয়াড়দের টানেলে নিয়ে যান।

কোপেনহেগেনেই আগামী ১৭ জুন নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে ১৯৯২ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ডেনমার্ক।


Spread the love

Leave a Reply